ভূগোল

যাদবপুর

পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত কলকাতা জেলার অন্তর্গত একটি প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিজড়িত জনপদ হল যাদবপুর। কলকাতার উল্লেখযোগ্য শহরের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে যাদবপুর (Jadavpur) ৷ সময়ের হাতে হাত রেখে, আকর্ষণ, জনপ্রিয়তা এবং জনঘনত্বের অনুভূতি বুকে নিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে এই জনপদ। এই জনপদ শুধু মাত্র বড় শহরই নয়, বাঙালি বুদ্ধিজীবি মহল, বাংলার রাজনৈতিক পালা বদল, বাংলার জনজীবনে – যে আর্থ -সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে এবং হয়ে চলেছে, সেসবকিছুরই পীঠস্থান,কর্মভূমি, গন্তব্য৷ যাদবপুর স্বয়ংসম্পূর্ণ আর্থ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছে৷ দেশের এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, হরেক ভাষা, সংস্কৃতির মানুষেরা এখানে আসেন; এরপিছনে যেমন আর্থিক কারণ রয়েছে, তেমনই শিক্ষাগ্রহণ, গবেষণা এবং নানা রকমের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্যই অনেকে আসেন৷ যাদবপুর দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর, যেখানে যাদবপুর স্টেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং পৃথিবীর নামকরা বেশ কয়েকটি গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে৷

যাদবপুরের ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে দেখা যায় সোনারপুরের জমিদার যাদব নারায়ণ সরকারের মৃত্যুর পর, তাঁর নামানুসারেই সোনারপুরের পার্শ্ববর্তী এই অঞ্চলটির নাম ‘যাদবপুর’ রাখা হয় বলে জনশ্রুতি৷ কলকাতা এবং দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ে ১৮৬২ সালে নিজেদের পরিবহনের সুবিধার জন্য একটি রেলপথ নির্মাণ করে যেটি বেলিয়াঘাটা স্টেশন থেকে পোর্ট ক্যানিং পর্যন্ত দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ তৈরি করবার জন্য তৈরি করা হয়৷ বর্তমানে দক্ষিণবঙ্গের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রেলপথটি শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে৷ যাদবপুর রেলস্টেশন এই শাখারই অন্তর্গত৷

রেলপথ তৈরির পর থেকেই, যাদবপুরের চালচিত্র ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকে৷ এলাকার আর্থিক উন্নয়নের সাথে পরিবহণ মাধ্যমের প্রভাব রয়েছে। বর্তমান সময়ের যাদবপুর তৈরি হয়েছে – দীর্ঘ সময় ধরে, একটু একটু করে, বহু মানুষের প্রচেষ্টায়।

কলকাতা শহরের উচ্চশিক্ষার পীঠস্থান বলা হয় যাদবপুরকে। মহেন্দ্রলাল সরকার ১৮৭৬ সালে সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় ‘ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’ প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানের মৌলিক চর্চার উদ্দেশ্যে এই যাদবপুরে৷ সি ভি রামন এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তাঁর যুগান্তকারী সব গবেষণাগুলি করেছিলেন। রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক ও ব্রজেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরি, রাসবিহারী ঘোষ, তারকনাথ পালিত সহ আরও অনেকের অর্থ সাহায্যে স্বদেশী শিক্ষা বিস্তারের জন্য ১৯০৬ সালে যাদবপুরে জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিলের অধীনে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও এখানে ১৯৩৫ সালে কাউন্সিলিং অব সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাসস্ট্রিয়াল রিসার্চের অন্তর্গত ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজি’ তৈরি হয়৷ ১৯৫০ সালে এখানে স্থাপিত হয় সেন্ট্রাল গ্লাস এবং সেরামিক ইনস্টিটিউট। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও একাধিক বড় বড় স্কুল যেমন- যাদবপুর হাই স্কুল, যাদবপুর বিদ্যাপীঠ, যাদবপুর গার্লস হাইস্কুল, যাদবপুর বাঘাযতীন হাই স্কুল সহ বেশ কিছু বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় পলিটেকনিক কলেজটিও এখানে অবস্থিত।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু মানুষ বাস্তুহারা হয়ে ভারতে চলে আসে। দেশভাগের ক্ষত নিয়ে এখানে এসে বহু কলোনি গড়ে তুলেছিলেন এই বাস্তুহারা শরণার্থীরা। এই কলোনিগুলির মধ্যে বিদ্যাসাগর কলোনি, বিজয়গড় কলোনি, চিত্তরঞ্জন কলোনি, আজাদগড় কলোনি, পোদ্দারনগর কলোনি, কাটজুনগর কলোনি অন্যতম। যাদবপুরের এই কলোনিগুলি ছিন্নমূল মানুষগুলির লড়াইয়ের কথা বলে যায় আজও। এই শরণার্থীদের জন্যই যাদবপুরের ‘রিফিউজি ক্যাম্পএ্যাসোসিয়েশন’ তৈরি করা হয়েছিল কলোনিগুলি যাতে ধীরে ধীরে ছোট ছোট স্বনির্ভর জনবসতিতে রূপান্তরিত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী যাদবপুরের এই রিফিউজি ক্যাম্প এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।

এই জনপদ কসবা – রাসবিহারী বিধানসভার আওতাধীন। কলকাতা দক্ষিণের আওতায় পড়ছে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রটি। যাদবপুরের উত্তরদিক ঘেঁষে যোধপুর পার্ক, ঢাকুরিয়া; পশ্চিম দিকে টালিগঞ্জ আর গল্ফগ্রিন; পূর্ব দিকে সন্তোষপুর ও গরফা; দক্ষিণে বাঘাযতীন এবং গড়িয়া রয়েছে। যাদবপুর সংলগ্ন এই অঞ্চলগুলি একসময় অধিকাংশই ছিন্নমূল মানুষের বসতি ছিল। স্থানীয় বাজারের কাছেই ৮- বি বাস স্টপ রয়েছে।

যাদবপুরের আজ যেখানে সাউথ সিটি মল রয়েছে সেখানে এক সময় ঊষা কোম্পানির কারখানা ছিল। যাদবপুরে বর্তমানে তেমনভাবে শিল্পাঞ্চল গড়ে না উঠলেও, এক সময় কৃষ্ণা গ্লাস, বেঙ্গল ল্যাম্প-এর মতন বড় বড় কারখানা ছিল। বর্তমানে এখানে অসংখ্য দোকান, অফিস, ব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর সাথে সাথে নব্বইয়ের দশক থেকেই যে প্রোমোটারি ব্যবসার রমরমা শুরু হয়েছিল, যা এখনো দেখা যায়।

যাদবপুরের নিজস্ব মৌলিক সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। এখানে বারো ভূতের মেলা, বাউল মেলা, বইমেলা, খাদ্যমেলা হওয়ার পাশাপাশি যাদবপুর বাজার সমিতির আয়োজনে প্রতিবছর নিয়ম করে অনেক সমাজ সেবামূলকঅনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শুধু ভারতের জন্যই নয়, দেশ এবং বিদেশের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ মানবিক স্বার্থ লঙ্ঘিত হলেই, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, ওলাকাবাসীর কণ্ঠে প্রতিবাদ ঝলসে ওঠে। মূলত বামপন্থী রাজনৈতিক গড় বলে পরিচত যাদবপুরে, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে।

এই অঞ্চলের পাড়া সংস্কৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কলকাতার বেশ কয়েকটি নামকরা দুর্গাপুজো এখানে দেখা যায়। তবে কালীপুজো যাদবপুরের পাড়া সংস্কৃতির সবথেকে উল্লেখযোগ্য পরিচয়। পুজো এখানে উৎসব হয়ে ওঠে, কখনো আতসবাজীর প্রতিযোগিতায়, আবার কখনো সাংস্কৃতিক সঙ্গীত অনুষ্ঠান বা জলসার আয়োজনে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন