ইতিহাস

নূর ইনায়েত খান

নূর ইনায়েত খান (Noor Inayat Khan) ওরফে নোরা বেকার একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ গুপ্তচর যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ (এসওই) হিসেবে ফ্রান্সে বেতার অপারেটর হিসেবে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীকালে বিশ্বাসঘাতকতার ফলে তিনি ধরা পড়ে যান এবং গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে দাচাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। টিপু সুলতানের বংশধর নূরকে ব্রিটেন মরণোত্তর জর্জ ক্রসে ভূষিত করেছে ‘নির্ভীকতার প্রতীক’ হিসাবে।

১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি রাশিয়ার মস্কো শহরে নূর ইনায়েত খানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা হজরত ইনায়েত খান ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক সঙ্গীতজ্ঞ রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন এবং পেশায় সুফিবাদের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন আমেরিকান বংশোদ্ভূত যার পূর্বনাম ওরা রে বেকার (Ora Ray Baker) এবং বিবাহের পর তিনি পিরানি আমিনা বেগম নামে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন যোগী পিয়ার বার্নার্ডের সৎ বোন। নূর তাঁর বাবা-মায়ের জ্যেষ্ঠ সন্তান। বিলায়েত, হিদায়েত এবং খৈরুন্নেসা নামে তাঁর আরো তিন ভাইবোন ছিল। বিলায়েত পরবর্তীকালে ‘সুফি অর্ডার অফ দ্য ওয়েস্ট’-এর প্রধান হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার আগে ১৯১৪ সালে নূরের পরিবার রাশিয়া থেকে ব্রিটেনে লন্ডনের ব্লুমসবেরিতে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। সুফিবাদের এক পৃষ্ঠপোষক ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কাছে সুরেনাতে (Suresnes) তাঁর বাবাকে একটি বসতবাড়ি দান করেন। ১৯২০ সালে তাঁরা সেখানে গিয়ে বসবাস শুরু করেন।

নূর ইনায়েত খানের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় ব্লুমসবেরির ‘নটিং হিল’ (Notting hill) থেকে। ফ্রান্সেই সম্পূর্ণ হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। তিনি সোরবর্নে শিশু মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন। প্যারিস কনজারভেটরিতে নাদিয়া বুলোঞ্জেরের (Nadia Boulanger) তত্ত্বাবধানে সঙ্গীত শেখেন নূর। পরবর্তীকালে সুফিবাদ নিয়ে গবেষণাও করেছেন তিনি।

১৯২৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর শোকগ্রস্ত পরিবারের দায়ভার কাঁধে নিয়ে নূর তাঁর বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনে প্রবেশ করেন৷ নূর প্রথমদিকে কবিতা এবং শিশুদের জন্য গল্প লিখতে শুরু করেন। এইসব লেখা শিশুসাহিত্যধর্মী নানা পত্রিকাতে প্রকাশিত হয় এবং ফরাসি রেডিওতে সম্প্রচারিত হতে থাকে। ১৯৩৯ সালে লণ্ডনে বৌদ্ধ আদর্শ নির্ভর জাতকের গল্পের অনুপ্রেরণায় লিখিত তাঁর ‘টোয়েন্টি জাতকা টেলস’(Twenty Jataka tales) নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। এরপর ঐ বছরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময়ে তিনি ফ্রান্সের রেডক্রসে সেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৪০ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সপরিবারে ফ্রান্স ছেড়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নেন। ফ্রান্স ছিল মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত। দেশ থেকে নাৎসিদের বিতাড়িত করায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারলে ব্রিটি়শ এবং ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি হবে এই বিশ্বাস থেকে নূর এবং তাঁর ভাই বেলায়েত মিত্রশক্তিকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন। নূর যোগ দেন ‘উইমেন’স অক্সিলিয়ারি এয়ার ফোর্স’-এ (Women Auxiliary Air Force)। সেখানে ‘এয়ারক্রাফ্ট উওম্যান-সেকেন্ড ক্লাস’(Aircraft Woman- Second Class) হিসেবে ওয়্যারলেস অপারেটরের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নূরকে। এরপর তাঁকে ১৯৪১ সালের জুন মাসে একটি বোমারু প্রশিক্ষণ কর্মশালাতে পাঠানো হলে তিনি সেখান থেকে অব্যাহতি চেয়ে নেন।

অপরদিকে বেতার অপারেটরের কাজে অতি দ্রুত দক্ষতা দেখিয়ে তিনি ১৯৪২ সালে স্পেশাল অপারেশন এক্সিকিউটিভের (এসওই) ফ্রান্স শাখায় গুপ্তচর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে ফার্স্ট এইড নার্সিং ইয়োম্যানরির অনুমোদনে ‘এয়ার ইন্টেলিজেন্স’-এর ডিরেক্টর (Directorate of Air Intelligence) পদে বহাল করা হয়। এরপর তাঁকে শত্রুকবলিত অঞ্চলে ওয়্যারলেস অপারেশনের বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্যে বাকিংহামশায়ারের এইলসবারিতে (Aylesbury Buckinghamshire) পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণ শেষে নূর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেকশন অফিসার (Assistant Section Officer) পদে উন্নীত হন। প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ গুপ্তচরের অভাবে বেতার টেলিগ্রাফ ব্যবহারে নূরের কর্মদক্ষতা ও ফরাসি ভাষায় দখলের জন্য তাঁকে ফ্রান্সে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নির্বাচন করা হয়। ১৯৪৩-এর জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনিই ছিলেন প্রথম মহিলা যিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে দেশের জন্য চরবৃত্তির উদ্দেশ্যে ম্যাডেলেন (Madeleine) সাংকেতিক নাম নিয়ে ফ্রান্সে বাচ্চাদের নার্স জিনি মারি রেনিয়ের (Jeanne Marie Reneier) ছদ্ম-পরিচয়ের আড়ালে নাৎসি কবলিত ফ্রান্সে যাত্রা করেন। ১৯৪৩-এর অক্টোবর মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পর্যন্ত প্যারিস ও লন্ডনের মধ্যে সেইসময় শেষ রেডিও অপারেটরও ছিলেন নূর। মুসলিম সুফি ধর্মাবলম্বী পরিবারের মেয়ে নূর আজীবন অহিংসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।

গিলবার্ট নামক একজন ফরাসি ডাবল এজেন্টকে (প্রকৃত পরিচয় হেনরি ডেরিকোর্ট – Henri Déricourt অথবা রিনি গ্যারী – Renée Garry) ব্যবহার করে ১৩ অক্টোবর ১৯৪৩ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে হিটলারের গেস্টাপো। প্যারিসের ৮৪, এভিনিউ ফচে্‌ এস. ডি সদরদপ্তরে জার্মান পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে৷ কিন্তু কোনো কথা না বলে সেখান থেকেও দু’বার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন নূর। ২৫ নভেম্বর ১৯৪৩ সালে নূর দ্বিতীয়বার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ধরা পড়ে যান৷ পুনরায় পালানোর চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তিপত্রে সই করতে অস্বীকার করলে ২৭ নভেম্বর তাঁকে সঙ্গোপনে জার্মানিতে নিয়ে যাওয়া হয়৷ প্রচুর অত্যাচারের পরেও নূরের মুখ থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে না পেরে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ রূপে চিহ্নিত করে (highly dangerous) ফর্টস্‌হাইম-এ (Pforzheim) দীর্ঘ দশমাস তাঁকে সম্পূর্ণ একা ‘নাক্ট আণ্ড নেবল্’ (Nacht und Nebel) হিসেবে গুপ্তকক্ষে শিকলে হাত পা বেঁধে বন্দী রাখা হয় এবং শেষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

১৯৪৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গেস্টাপোর (পুলিশ বাহিনীর) গুলিতে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে নূর ইনায়েত খানের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তাঁর বলা শেষ কথা ছিল ‘লিবের্তে’ যার অর্থ ‘স্বাধীনতা’।

৫ এপ্রিল ১৯৪৯ সালে অসাধারণ সাহসিকতার জন্য নূর ইনায়েত খানকে সর্বোচ্চ বেসামরিক ব্রিটিশ সম্মান মরণোত্তর ‘জর্জ ক্রস’ প্রদান করার কথা ‘লণ্ডন গেজেট’-এ (London Gazette) ঘোষণা করা হয়। ফরাসি ‘ক্রয় দ্য গিয়ার উইথ সিলভার স্টার’-এ (Croix de guerre with silver star) ভূষিত হন তিনি। ‘স্পাই প্রিন্সেস : দ্য লাইফ অফ নুর ইনায়েত খান’ শীর্ষক জীবনীর লেখিকা শ্রাবণী বসুর নিরন্তর প্রচারের ফলে ২০১২ সালে লন্ডন শহরে নূরের মূর্তি বসায় ব্রিটিশ প্রশাসন। ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ রয়্যাল মেলের ‘রিমার্কবল লাইভস’ সিরিজের অংশ হিসেবে (‘Remarkable lives’) নূরের সম্মাননায় একটি ডাকটিকিট প্রকাশ পায়। ব্রিটিশ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারীদের সম্মানে ১৫০ বছর ব্যাপী মরণোত্তর নীল ফলক প্রকল্প চালু করেছে ব্রিটেন সরকার। প্রথম ফলকটি মধ্য লন্ডনের ব্লুমসবেরির ৪, ট্যাভিটন স্ট্রিটে নূর ইনায়েত খানের বসতবাড়ির সামনে বসানো হয়েছে। তিনিই প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহিলা যাঁর স্মৃতিতে সম্মান জানানোর জন্য ইংলিশ হেরিটেজ চ্যারিটি পরিচালিত ‘দ্য ব্লু প্লাক স্কিম’-এর আওতায় এই বিরল স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ব্রিটেনে ২০২১ সাল থেকে যে পলিমার দ্বারা তৈরি ৫০ পাউন্ডের যে নোট চালু হওয়ার কথা সেখানে নূরের ছবির দাবিতে লন্ডন-সহ ব্রিটেন জুড়ে শুরু হয়েছে প্রচারও হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বইতে, নাটকে, চলচ্চিত্রে, তথ্যচিত্রে (২০০৪ : রবার্ট অ্যাণ্ড দ্য শ্যাডোস-ফ্রান্স), রেডিও, দূরদর্শন সহ (১৯৮৭ সালে ‘উইশ মি লাক’) নানা গণমাধ্যমে অনুষ্ঠানে নূরসহ অন্যান্য এস.ও.ই.এজেন্টদের জীবন নানাভাবে চিত্রিত এবং চর্চিত হয়েছে।

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন