সববাংলায়

কেরালার কোচিতে কী দেখবেন | কোচির দর্শনীয় স্থান

বিভাগঃ ,

কেরালার বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত কোচি শুধুমাত্র একটি আধুনিক মহানগরী নয়, বরং আরব সাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভারতের অন্যতম প্রাচীন বন্দরনগরী। এই বন্দরনগরী কয়েকশো ধরে আরব, চীনা, ইহুদি, পর্তুগিজ, ডাচ এবং ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল। আজকের কোচি মূলত পুরনো ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক চমৎকার মিশ্রণ। কোচির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের গির্জা, প্রাসাদ ও ঐতিহাসিক পাড়া, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক শহুরে জীবন, সমুদ্রতীরবর্তী বিনোদন কেন্দ্র এবং শিল্প-সংস্কৃতির নানা আয়োজন। কোচি ঘুরতে গেলে কোচিতে কী দেখবেন তার একটা তালিকা এখানে দেওয়া হল।

ফোর্ট কোচি

কোচির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ঐতিহাসিক অঞ্চল হল ফোর্ট কোচি। যদিও বর্তমানে এখানে কোনও দুর্গের অস্তিত্ব নেই, তবুও পর্তুগিজদের নির্মিত দুর্গকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের নাম হয় “ফোর্ট কোচি”। ১৫০৩ সালে পর্তুগিজরা এখানে ভারতের প্রথম ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন করে। পরবর্তীকালে ডাচ এবং ব্রিটিশদের শাসনেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব বজায় ছিল। বর্তমানে ফোর্ট কোচি হল কোচির ঐতিহাসিক হৃদয়। এই অঞ্চলের সরু রাস্তা, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, পুরনো বাড়ি, রঙিন ক্যাফে এবং শিল্পগ্যালারিগুলি পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় যেন সময় কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গেছে।

ফোর্ট কোচির সবচেয়ে পরিচিত আকর্ষণ হল চাইনিজ ফিশিং নেট। এবং এটি কোচির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম। বিশাল আকৃতির এই মাছ ধরার জালগুলি কয়েক শতাব্দী ধরে কোচির পরিচয়ের অংশ হয়ে রয়েছে। জনশ্রুতি অনুসারে, চীনা ব্যবসায়ীরা এই পদ্ধতি কোচিতে নিয়ে এসেছিলেন। আজও স্থানীয় জেলেরা ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতিতে মাছ ধরেন।

এই অঞ্চলে অবস্থিত সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ ভারতের অন্যতম প্রাচীন ইউরোপীয় চার্চ। বিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামাকে প্রথমে এখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল। পরে তাঁর দেহাবশেষ পর্তুগালে নিয়ে যাওয়া হলেও চার্চটি আজও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। ফোর্ট কোচির আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হল সান্তা ক্রুজ ব্যাসিলিকা। উনিশ শতকে নির্মিত এই গির্জা তার মনোরম স্থাপত্য, রঙিন কাচের জানালা এবং চিত্রকলার জন্য বিশেষ পরিচিত।

এছাড়াও ফোর্ট কোচি বিচ, প্রিন্সেস স্ট্রিট, বিভিন্ন আর্ট ক্যাফে এবং ঔপনিবেশিক আমলের পুরনো ভবনগুলি এই অঞ্চলের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যার সময় সমুদ্রের ধারে সূর্যাস্ত উপভোগ করা কিংবা কোনও ক্যাফেতে বসে কফি পান করা ফোর্ট কোচি ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ।

মাট্টানচেরি

ফোর্ট কোচির পাশেই অবস্থিত মাট্টানচেরি অঞ্চল কোচির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম এবং বিশেষ করে ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। একসময় এটি ছিল কোচির মশলা বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা এখানে এসে গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি এবং অন্যান্য মশলার ব্যবসা করতেন। মাট্টানচেরির সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা হল মাট্টানচেরি প্যালেস বা ডাচ প্যালেস। ১৫৫৫ সালে পর্তুগিজরা কোচির রাজাকে উপহার হিসেবে এই প্রাসাদ নির্মাণ করে। পরে ডাচরা এর সংস্কার করায় এটি ডাচ প্যালেস নামে পরিচিত হয়।

প্রাসাদের ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে কেরালার রাজপরিবারের ইতিহাস, বিভিন্ন নিদর্শন এবং রামায়ণ-মহাভারতের অসাধারণ ম্যুরাল চিত্র। কেরালার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলী বোঝার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মাট্টানচেরির আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হল জিউ টাউন। বহু শতাব্দী আগে ইহুদি ব্যবসায়ীরা এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের বিকাশ ঘটে। বর্তমানে জিউ টাউন তার অ্যান্টিকের দোকান, মশলার বাজার এবং ঐতিহাসিক পরিবেশের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

জিউ টাউনের মধ্যেই অবস্থিত প্যারাডেসি সিনাগগ। ১৫৬৮ সালে নির্মিত এই উপাসনালয় ভারতের প্রাচীনতম সিনাগগগুলির অন্যতম। এর ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে হাতে আঁকা চীনা টাইলস, প্রাচীন ঝাড়বাতি এবং বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন।

মেরিন ড্রাইভ

কোচির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে মেরিন ড্রাইভ হল কোচির আধুনিক মুখ। এটি স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় অবসরযাপনের স্থান। যদিও নামের সঙ্গে “ড্রাইভ” শব্দটি যুক্ত রয়েছে, বাস্তবে এটি মূলত পথচারীদের জন্য তৈরি একটি সুন্দর ওয়াটারফ্রন্ট এলাকা। এখান থেকে কোচি বন্দরের বিভিন্ন জাহাজ, ফেরি এবং সমুদ্রপথের কার্যক্রম দেখা যায়।

সন্ধ্যার সময় মেরিন ড্রাইভ বিশেষভাবে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সমুদ্রের হাওয়া, শহরের আলো এবং ব্যস্ত বন্দর এলাকার দৃশ্য এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে। কোচির আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে এই স্থানটি অবশ্যই ঘুরে দেখা উচিত।

চেরাই সৈকত

কোচি শহর থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে ভাইপিন দ্বীপে অবস্থিত চেরাই সৈকত কোচির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম এবং কেরালার অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত। আরব সাগরের তীরে বিস্তৃত এই সৈকত তার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশেষ পরিচিত। একসময় এই অঞ্চল ছিল মৎস্যজীবীদের বসতি। পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে চেরাই সৈকত আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘ বালুকাবেলা, নারকেল গাছের সারি এবং শান্ত পরিবেশ এটিকে কেরালার অন্যতম আকর্ষণীয় সৈকতে পরিণত করেছে।

চেরাই সৈকতের বিশেষত্ব হল সমুদ্র এবং ব্যাকওয়াটারের নিকটবর্তী অবস্থান। ফলে এখানে একইসঙ্গে উপকূলীয় এবং ব্যাকওয়াটার অঞ্চলের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সৈকতের দৃশ্য বিশেষভাবে মনোমুগ্ধকর। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সমুদ্রতীরে হাঁটা কিংবা সামুদ্রিক খাবারের স্বাদ নেওয়ার জন্য চেরাই সৈকত আদর্শ স্থান।

উইলিংডন আইল্যান্ড

উইলিংডন আইল্যান্ড কোচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম দ্বীপ এবং কোচির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম। ব্রিটিশ আমলে কোচি বন্দরের উন্নয়নের সময় সমুদ্র খননের ফলে যে মাটি উঠে আসে, তা দিয়েই এই দ্বীপ তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড উইলিংডনের নামানুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়।

বর্তমানে এটি কোচির বন্দর, নৌবাহিনী এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দ্বীপটির বিভিন্ন অংশ থেকে বন্দর এলাকার অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। শান্ত পরিবেশ এবং সমুদ্রঘেঁষা অবস্থানের কারণে এটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়।


সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading