প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ (Prafulla Chandra Ghosh) ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী-প্রধান যাকে সেই সময় প্রিমিয়ার (Premier) বলা হত। পরবর্তী কালে এই পদটিকেই ‘মুখ্যমন্ত্রী’ পদ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। তাই অনেকে বিধানচন্দ্র রায়ের পরিবর্তে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষকেই পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী বলেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী শব্দের ব্যবহার ধরলে বিধান রায় সেই মর্যাদা পান। প্রফুল্ল চন্দ্র যেমন প্রিমিয়ার হিসাবে দায়িত্ব সামলেছেন তেমনই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও স্বকীয়তা দেখানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন বারবার। সবসময় যে সফল হয়েছেন একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে সততা ও কর্মদক্ষতার মিশেলে তাঁর কর্মনৈপুণ্যতা এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল একথা জোর দিয়েই বলা যায়। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি M.A ও M. Sc দুটি বিভাগেই প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিবেকানন্দের ভাবধারায় দীক্ষিত প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের জীবনের ধ্রুবতারা ছিল মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন।
১৮৯১ সালের ২৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের (বর্তমানে বাংলাদেশ) ঢাকা জেলার মালিকান্দা নামে একটি গণ্ডগ্রামে এক কৃষ্টিসম্পন্ন পরিবারে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের জন্ম হয়। তাঁর ঠাকুরদা একজন সম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন। ঠাকুরদার তিন সন্তান ছিল, কিন্তু তিন নাবালক সন্তানকে রেখে তিনি হঠাৎ মারা যান। বুদ্ধিমতী ঠাকুমা সংসারের হাল ধরেন ও নাবালক সন্তানদের মানুষ করতে থাকেন। প্রফুল্ল চন্দ্রের বাবা পূর্ণ চন্দ্র ঘোষ ছিলেন সকলের ছোট। তিনি খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি ও ছাত্রবৃত্তি অবধি পড়েছিলেন।পরবর্তী পর্যায়ে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। মা বিনোদিনী দেবী এবং বাবা পূর্ণচন্দ্র দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, সরল ও ধর্মপ্রাণ মানুষ।
অকৃতদার প্রফুল্ল চন্দ্র ১৯৫২ সালে সাধনা বিশ্বাস নামে একটি মেয়েকে দত্তক কন্যা হিসাবে স্বীকৃতি দেন। সাধনা ছিলেন সুলেখিকা,সুগায়িকা ও সুবক্তা। তাঁর যথেষ্ট সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাও ছিল। তিনি ইংরাজী, বাংলা, জার্মান ও হিন্দি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। উত্তরকালে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের প্রপৌত্রী প্রিয়াংকা অশিকয়া ‘মিস জাপান’ খেতাব লাভ করেন। প্রিয়াংকার মা ছিলেন জাপানী , বাবা প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কে যুক্ত ছিলেন।
এক নজরে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ-এর জীবনী:
- জন্ম: ২৪ ডিসেম্বর, ১৮৯১
- মৃত্যু: ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৮৩
- কেন বিখ্যাত: প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রথম প্রিমিয়ার বা মন্ত্রী-প্রধান। ছয়ের দশকের উত্তাল সময়েও তিনি একবার স্বল্প সময়ের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন। মহাত্মা গান্ধীর অনুগামী প্রফুল্ল চন্দ্র অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য নিশ্চিত চাকরি জীবন ছেড়ে দেন। রসায়নে ডক্টরেট বিদ্যা থাকলেও দেশকে স্বাধীন করার জন্য বিজ্ঞান গবেষণার কাজ ছেড়ে দেন।
প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ মায়ের কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। বাবা মার ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল প্রফুল্ল যেন বড় হয়ে প্রকৃত সুশিক্ষিত হন। প্রফুল্ল বাবা মার মুখ রেখেছিলেন। হায়ার প্রাইমারি, বৃত্তি, মাইনর ইত্যাদি সব পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে পাস করেন। গ্রামীণ বাতাবরণে পড়াশোনার সাথে সাথে প্রফুল্ল চন্দ্র চালিয়ে গেছেন খেলাধুলা। ক্রিকেট, ফুটবল, হা ডু ডু, কুস্তি, লাঠি খেলা, নৌকা বাওয়া, সাঁতার কাটা ইত্যাদি প্রায় সবই খেলতেন আগ্রহের সঙ্গে। বাগান করা ও সবজি চাষে কৈশোর থেকেই তাঁর ছিল তীব্র আগ্রহ।
প্রফুল্ল চন্দ্র ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষায় পাস করেন ও বৃত্তি পান।পরবর্তী পর্যায়ে জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা কলেজে রসায়নের ছাত্র হিসাবে কৃতিত্ব দেখান। প্রফুল্ল প্রথমে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন এবং তারপর ঢাকায় চলে আসেন যেখানে তিনি ১৯১৩ সালে B. A. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৬ সালে, তিনি রসায়ন (Chemistry) বিষয়ে এম. এ.পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন এবং এম. এ. ও এম. এসসি. উভয় বিভাগের মধ্যেই প্রথম হন। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ।
স্বদেশীযুগে রাজনীতিতে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের আর্দশ ছিলেন বাল গঙ্গাধর তিলক। পরে বিপিন চন্দ্র পাল, লালা লাজপত রাই, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ ঘোষ গভীর ভাবে রেখাপাত করেন তাঁর রাজনৈতিক চেতনায়। ১৯০৯ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ যুক্ত হন ঢাকা অনুশীলন সংঘের সঙ্গে।বেছে নেন সশস্ত্র বিপ্লবের পথ। কিন্তু মোহবঙ্গ হয় ১৯১৩ সালে। এরপর তিনি জোর দেন শিক্ষা ও ধর্মজীবনের উপর।
পরবর্তী কালে প্রফুল্ল চন্দ্র ঢাকা কলেজে রসায়নে গবেষণায় যোগ দেন ও মাসিক ১০০ টাকা বৃত্তি পান। ১৯১৯ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ডেমোনস্ট্রেটর হিসেবে যোগ দেন। তাঁর মাসিক বেতন ছিল ২০০ টাকা। ১৯২০ সালে কলকাতার ট্যাঁকসালে ডেপুটি য়্যাসে-মাস্টার পদে যোগ দেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি এই পদ অলংকৃত করেন।
মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় যোগেন্দ্রনাথ সাহার মাধ্যমে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির সাথে পরিচিত হলেও প্রথম দিকে গান্ধীবাদী নীতি তাঁকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় গান্ধীর বক্তৃতা শুনে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং কলকাতায় গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। প্রফুল্ল চন্দ্র এরপর সিদ্ধান্ত নেন মাতৃভূমির সেবা করা ছাড়া অন্য কোনদিকে দৃষ্টিপাত করবেন না। এত দিন রাজনীতি করার পাশাপাশি তিনি কলকাতার ট্যাঁকসালে চাকরি বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু দু নৌকায় পা দিয়ে চলা তাঁর পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়ল। বাধ্য হয়ে প্রফুল্ল চন্দ্র চাকরিতে ইস্তফা দিলেন।পুরোপুরিভাবে জড়িয়ে পড়লেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে।
ভারতের স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে নেমে এলো দুঃসময়। বাংলা বিভক্ত হল। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু অধ্যুষিত অংশের প্রিমিয়ার (Premier) নিযুক্ত করল প্রফুল্ল চন্দ্রকে (১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ -১৪ জনুয়ারী ১৯৪৮)।এই সময় ব্যাপক সংখ্যায় উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গ থেকে পচিমবঙ্গে চলে আসতে থাকে।দেখা দেয় সাম্প্রদায়িক হানাহানি। ভারতবর্ষের অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত করলে, ভারতের কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনকে হতে হয় লাঞ্ছনার শিকার। প্রফুল্ল চন্দ্রকে এর জন্য দায়ী হয়।আসলে প্রফুল্লর মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক উন্নয়ন ও দুর্নীতি দমন। দুর্নীতি রোধ করতে অর্ডিন্যান্স জারি করতেও প্রফুল্ল দ্বিধা করেন নি। প্রিমিয়ার থাকাকালীন প্রফুল্ল চন্দ্র প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন ও বাংলা ভাষা যাতে সরকারী ভাষা রূপে পশ্চিমবঙ্গে স্বীকৃতি পায় তার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেন। সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু প্রভৃতি বিদগ্ধ মানুষকে নিয়ে প্রফুল্ল চন্দ্র গড়ে তোলেন বাংলা পরিভাষা কমিটি। সুরেশ চন্দ্র সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রফুল্ল চন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাঁকোর বাড়িটি রবীন্দ্রভারতী সোসাইটির হাতে তুলে দিতে সমর্থ হন।এত কিছু করেও প্রফুল্ল চন্দ্র কংগ্রেসের উপর মহলের মন পেতে ব্যর্থ হন ।তাঁকে মন্ত্রিপদ ত্যাগ করতে হয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ জানুয়ারি ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন ও প্রফুল্ল চন্দ্রের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়।
প্রফুল্ল চন্দ্র কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫০ সালে কৃষক মজদুর প্রজা পার্টি তৈরি করেন এবং তার সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে এই দল PSP বা প্রজাসমাজতন্ত্রী পার্টি হিসাবে পরিচিত হয়।
১৯৫৭ সালে বিধান সভা নির্বাচনে মহিষাদল থেকে প্রফুল্ল চন্দ্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ও নির্বাচিত হন। এরপর অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয় তাতে স্থান হয় প্রফুল্ল চন্দ্রের। কিন্তু এই মন্ত্রিসভার মেয়াদ বেশিদিন ছিল না। প্রফুল্ল চন্দ্র এরপর একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরি করেন। যার নাম হয় প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রটিক ফ্রন্ট (Progressive Democratic Front)। ১৯৬৭ সালের ২১ নভেম্বর পিডিএফ সরকার গঠন করে। উক্ত সরকারে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন প্রফুল্ল চন্দ্র। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই মন্ত্রীসভা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন মাস ছিল এই সরকারের মেয়াদ। পরবর্তীকালে জারি হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শাসন।
প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস, The Theory of Profits, West Today, জীবন স্মৃতির ভূমিকা, Mahatma Gandhi as I Saw Him, মহাত্মা গান্ধী, India as Known to Ancient and Mediaeval Europe ইত্যাদি।
১৯৮৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান