ধর্ম

রাখি বন্ধন

রাখি পূর্ণিমা বা রাখি বন্ধন বা রক্ষা বন্ধন এই উৎসবটির মাধ্যমে ভাইবোনের মধ্যের পবিত্র সম্পর্ক পালন করা হয়। রাখী পূর্ণিমার আরেক নাম শ্রাবনী পূর্ণিমা বা সৌভাগ্য পূর্ণিমা। রাখী পূর্ণিমার ঠিক পাঁচ দিন আগে শ্রী কৃষ্ণের ঝুলন পূর্ণিমা শুরু হয়। এবং সাত দিন পর শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালন করা হয়।এই দুই লীলার মাঝে শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই রাখী পূর্ণিমা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় তাই এর আরেক নাম শ্রাবণী পূর্ণিমা।

 

রাখি পূর্ণিমার বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী আছে।

মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী সুভদ্রা কৃষ্ণের ছোট বোন হওয়া সত্ত্বেও দ্রৌপদীকেও কৃষ্ণ অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সুভদ্রা একবার  অভিমান ভরে কৃষ্ণকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন এর কারণ। উত্তরে কৃষ্ণ বলেছিলেন সময় এলেই সুভদ্রা কারণ বুঝতে পারবেন।
একদিন যখন কোনভাবে কৃষ্ণের হাত কেটে যায়, তখন সুভদ্রা রক্ত বন্ধ করার জন্য কাপড় খুঁজছিলেন, তখন দ্রৌপদীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সে একবিন্দু দেরি না করে নিজের মুল্যবান রেশম শাড়ি ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাত বেধে দিলেন যাতে কিছুক্ষণেই রক্তপাত বন্ধ হল। কৃষ্ণ তাকে প্রতিশ্রুতি দেন, ‘বোন’কে প্রতিটি সুতোর প্রতিদান দেবেন তিনি। এবং পরে কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে রাজসভায় চরম কলঙ্ক থেকে রক্ষা করেছিলেন। সুভদ্রা বুঝতে পেরেছিলেন কেন দাদা  দ্রৌপদীকে এত স্নেহ করেন!

ভাগবতপুরাণ এবং বিষ্ণুপুরাণে অনুযায়ী, বিষ্ণু দৈত্যরাজ বলিকে হারালেও বলি তাঁকে নিজের প্রাসাদে থাকতে বাধ্য করলেন। কিন্তু এই নতুন গৃহ লক্ষ্মীর পছন্দ হল না। তিনি একটি রাখি নিয়ে বলিরাজের কাছে গেলেন এবং তাঁকে ‘ভাই’ পাতিয়ে সেটি তাঁর হাতে পরিয়ে দিলেন। দৈত্যরাজ খুশি হয়ে বোনের ইচ্ছে জানতে চাইলে লক্ষ্মী জানালেন বলি বিষ্ণুকে যেন তার নিজের বাড়ি বৈকুণ্ঠে ফিরতে দেন। বলি তাই করেছিলেন।

রাখির সবচেয়ে পুরনো উল্লেখ বোধহয় পাওয়া যায় ভবিষ্যপুরাণ-এ। দৈত্যরাজ বলির উপদ্রবে দেবরাজ ইন্দ্র তখন নাজেহাল।  দেবগুরু বৃহস্পতির উপদেশ নিয়ে অবশেষে শ্রাবণ পূর্ণিমার দিনে দেবরাজ ইন্দ্র বলির সঙ্গে লড়াই করতে গেলেন। তার পত্নী শচী ভগবান বিষ্ণুর সাথে কথা বলে এবং তারপর ইন্দ্রের হাতে বেঁধে দেন বিশেষ মন্ত্রঃপূত রক্ষাবন্ধনী। সেই যুদ্ধে ইন্দ্র জয়লাভ করেন। অনেকে এই ঘটনাকেই রাখির আদি উৎস হিসাবে ধরে থাকে। কিন্তু এখানে কোন ভাইবোনের ব্যাপার নেই।

 

এবার আসা যাক রাখির ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোয়।

বলা হয় আলেকজান্ডারের সঙ্গে পুরুর লড়াই শুরু হওয়ার আগে তাঁর স্ত্রী গ্রিক বীরের কাছে গিয়ে তাঁর হাতে রাখি পরিয়ে অনুরোধ জানান, তিনি যেন পুরুর কোনও ক্ষতি না করেন। এ গল্পটি  খুবই প্রচলিত কিন্তু ঐতিহাসিক কোন প্রমাণ নেই। হয়তো রাখিকে একটা ঐতিহাসিক ভিত দেওয়ার জন্যেই এই কাহিনির প্রচলন করা হয়।

আরও একটি গল্প অনুযায়ী গুজরাতের সুলতান যখন চিতোর আক্রমণ করতে আসেন, তখন সেখানকার বিধবা রানি কর্ণাবতী মুঘল বাদশা হুমায়ুনকে রাখি পাঠিয়ে তাঁর কাছে সাহায্যের অনুরোধ জানান।  হুমায়ুন অবশ্য সময়মত সৈন্য পাঠাতে পারেননি, রানি যুদ্ধে পরাজিত হন। এই কাহিনিরও ঐতিহাসিক প্রমাণ বিশেষ নেই, তবে সপ্তদশ শতকের রাজপুতানার গল্পগাথায় এটি খুব পরিচিত।

রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধন উৎসব তো প্রায় সকলেরই জানা। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে রাখি বন্ধন কর্মসূচি এখানে তুলে ধরা হল।

১৭ সেপ্টেম্বর কোলকাতার সাবিত্রী লাইব্রেরী স্বধর্ম সমিতির বিশেষ অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ সভাপতির ভাষণে প্রস্তাব রাখেন –১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর তারিখ থেকে ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ওই আইন কার্যকর হলে সেদিন কোন বাড়িতে রান্নাবান্না হবে না। বাঙালি জনসাধারণ অরন্ধন পালন করে উপোষ থাকবে। বাঙালির ঐক্য বজায় রাখার জন্য দেশজুড়ে হবে রাখিবন্ধন উৎসব। দিনটিকে মিলন দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাজনীতিকরা ওই তারিখে রাজধানী কলকাতায় হরতাল আহ্বান করে।

রাখিবন্ধন উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ রাখি-সঙ্গীত ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ূ, বাংলার ফল—পূণ্য হউক, পূণ্য হউক’ রচনা করেন। ৭ আগস্ট বাগবাজারে রায় পশুপতিনাথ বসুর সুরম্য প্রাসাদপ্রাঙ্গণে বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রিত হন। বিজয়া সম্মিলনী মূলত হিন্দুদের অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথ লক্ষ করেছেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সব প্রতীকই হিন্দুদের প্রতীক থেকে গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রতীকের সাম্প্রদায়িক চরিত্র আছে। বঙ্গদেশ কেবল হিন্দুদের নয়—হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান—সকল মানুষেরই দেশ। এতকাল সকল মানুষ এক সঙ্গেই আছে। বঙ্গদেশটি ভাঙলে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান—সকল মানুষের বঙ্গদেশই ভাঙবে। কেবল হিন্দুর বঙ্গদেশ ভাঙবে না। বঙ্গভঙ্গ রদ করতে হলে সকল মানুষের অংশগ্রহণ চাই। এমন আন্দোলন চাই যেখানে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষই অন্তর থেকে অংশ নিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তাই স্পষ্টত ভেবেছেন– বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের এই হিন্দু প্রতীকগুলো মুসলমানদের কাছে টানার বদলে আরও দূরে সরাবে। সুতরাং তিনি এই বিজয় সম্মিলনীতে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্ভাষণ করার আহ্বান করেন।তিনি লিখেছেন–হে বন্ধুগণ, আজ আমাদের বিজয়া-সম্মিলনের দিনে হৃদয়কে একবার আমাদের এই বাংলাদেশের সর্বত্র প্রেরণ করো। উত্তরে হিমাচলের পাদমূল হইতে দক্ষিণে তরঙ্গমুখর সমুদ্রকূল পর্যন্ত, নদীজালজড়িত পূর্বসীমান্ত হইতে শৈলমালাবন্ধুর পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত চিত্তকে প্রসারিত করো। যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণে ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণ ফিরাইয়া আনিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নমাজ
পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!