ইতিহাস

রাসবিহারী ঘোষ

রাসবিহারী ঘোষ

ভারতীয় রাজনীতিতে একজন উল্লেখযোগ্য কৃতী রাজনীতিবিদ, আইনজীবি এবং সমাজসেবক হিসেবেই পরিচিত রাসবিহারী ঘোষ (Rash Behari Ghosh)। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। তাঁর কৃতিত্বকে স্মরণে রেখেই দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ‘রাসবিহারী অ্যাভিনিউ’। প্রভূত অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি দরিদ্র সেবায় অকাতরে দান করে গেছেন তিনি। সেকালের কারিগরি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট’ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার উন্নতিকল্পে বহু অর্থ দান করেছিলেন রাসবিহারী ঘোষ।

১৮৪৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষ এলাকার তারকোনা গ্রামে রাসবিহারী ঘোষের জন্ম হয়।

প্রথমে জগদ্বন্ধু বাঁকুড়া হাইস্কুল থেকে ১৮৬০ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন রাসবিহারী ঘোষ। এরপরে বর্ধমান রাজ কলেজিয়েট স্কুল এবং কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন হয়। ১৮৬৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি এবং ১৮৬৬ সালে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম ভারতীয় হিসেবে স্নাতকোত্তর স্তরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রাসবিহারী ঘোষ প্রথম বিভাগে প্রথম স্থানে উত্তীর্ণ হন। ১৮৬৭ সালে আইন বিষয়ে স্বর্ণপদকসহ উত্তীর্ণ হন তিনি এবং ১৮৭১ সালে ‘অনার্স ইন ল’ পরীক্ষায় পাশ করেন রাসবিহারী ঘোষ। ১৮৮৪ সালে ‘ডক্টর অফ ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন।

পড়াশোনা শেষ করে ১৮৭২ সালে কলকাতা হাইকোর্টের একজন আইনজীবি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রাসবিহারী ঘোষ। কিছুদিনের মধ্যেই খ্যাতনামা ব্যবহারজীবি হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এর আগে কিছুদিন বহরমপুর কলেজে অধ্যাপনা করেছিলেন তিনি। ১৮৭৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠাকুর আইন অধ্যাপক হিসেবে ভারতের বন্ধকী আইন বিষয়ে বেশ কিছু বক্তৃতা দিয়েছিলেন রাসবিহারী ঘোষ যা পরবর্তীকালে দুই মলাটের মধ্যে সংকলিত হয়ে প্রকাশ পায়। এই বইটি ভারতে বন্ধকী আইন বিষয়ে অন্যতম একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন রাসবিহারী ঘোষ। মূলত নরমপন্থী কংগ্রেসকর্মী হিসেবেই তিনি নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। সর্বপ্রকারে প্রগতির ধারণায় বিশ্বাস রাখলেও, চরমপন্থী বৈপ্লবিক পথে পা বাড়াতে চাননি তিনি। কংগ্রেসের অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গোপালকৃষ্ণ গোখলের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। স্বদেশি আন্দোলনের সময় তিনি জাতীয় শিক্ষার বিস্তারে বিশেষ অবদান রাখেন। জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে পরপর দুবার নির্বাচিত হয়েছিলেন রাসবিহারী ঘোষ। প্রথমবার ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে এবং পরে ১৯০৮ সালের মাদ্রাজ অধিবেশনে। মনে রাখতে হবে, সুরাট অধিবেশনের সময়েই জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে চরমপন্থী ও নরমপন্থীদের মধ্যে বিভাজন ঘটে যায়। ১৮৯১ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত এবং পরে পুনরায় ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত ‘বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’-এর সদস্য ছিলেন রাসবিহারী ঘোষ। তাছাড়া ‘কাউন্সিল অফ ইণ্ডিয়া’রও সদস্যপদ ছিল তাঁর। ১৮৯৬ সালে ‘অর্ডার অফ দ্য ইণ্ডিয়ান এম্পায়ার’-এর সহকারী হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ১৯০৮ সালে দেওয়ানি কার্যবিধি সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে তিনি বিশেষ সহায়তা করেছিলেন। ১৯০৯ সালে তাঁকে ‘অর্ডার অফ দ্য স্টার অফ ইণ্ডিয়া’র সহকারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ১৯১৫ সালের ১৪ জুলাই ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে নাইটহুড উপাধি লাভ করেন রাসবিহারী ঘোষ।

১৮৭৫ থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টেগোর ল’ প্রফেসর’ হিসেবে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। ১৮৮৪ সালে সম্মানীয় ‘ডক্টর অফ ল’ ডিগ্রিটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পেয়েছিলেন তিনি। কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসাবে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও উপার্জিত অর্থের বেশিরভাগই তিনি দরিদ্র সেবায় বা বৃত্তিদানে ব্যয় করেন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ কলকাতা হাইকোর্টে তাঁর সহকারী ছিলেন। ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানচর্চার উন্নতিকল্পে তিনি দশ লক্ষ টাকা দান করেন এবং পরে অধুনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট গড়ে তোলার জন্য মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সঞ্চিত ১৬ লক্ষ টাকার সম্পত্তি দান করে যান। ১৯২২ সালে তাঁর অর্থেই যাদবপুরে ৩৩ একর জায়গা কিনে সেখানে নতুন করে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করা হয় বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটকে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় মূলত গড়ে উঠেছিল জাতীয় শিক্ষা পরিষদের কর্মসূচির অধীনে। স্বদেশি আন্দোলনের সময় তিনিই জাতীয় শিক্ষার প্রসারে বিশেষভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাছাড়া বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতার আর.জি.কর মেডিকেল কলেজের উন্নতিকল্পেও বহু অর্থ দান করেছিলেন তিনি। দেশীয় শিল্পের উন্নতির লক্ষ্যে তিনি কলকাতার কাছে একটি দেশলাই কারখানা গড়ে তুলেছিলেন।

১৮৯৬ সালে সিআইই এবং ১৯০৯ সালে সিএসআই উপাধিতে ভূষিত হন রাসবিহারী ঘোষ।

তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে ২০১০ সালে খণ্ডঘোষের উখরিদে স্যার রাসবিহারী ঘোষ মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয়। তাছাড়া দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে তাঁর স্মৃতিতে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ রাখা হয়েছে।

১৯২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাসবিহারী ঘোষের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু (সম্পা.), সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান, সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০, কলকাতা, পৃ ৪৮৫
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. http://archives.anandabazar.com/
  4. https://eisamay.com/
  5. https://www.britannica.com/
  6. https://www.allexamgurublog.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়