বর্তমান বিশ্বে আঞ্চলিক সহযোগিতা কেবল রাজনৈতিক বন্ধুত্ব নয়, বরং একটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। ইউরোপে যেমন ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন (EU) বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেমন অ্যাসোসিয়েসন অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস্ (ASEAN), তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে সার্ক (SAARC) —দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। সার্কের সম্পূর্ণ নামটি হল সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েসন ফর রিজিওনাল কোঅপারশন (South Asian Association for Regional Cooperation)। ১৯৮৫ সালে ভারতীয়-উপমহাদেশ অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়, যেখানে শান্তি, সহযোগিতা ও সমন্বিত উন্নয়ন ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও এই সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়ে গেছে।
১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ঢাকায় সার্ক স্থাপিত হয়। সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলি হল: বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে আফগানিস্তান সার্কে যোগ দেয়। সার্কের প্রধান প্রশাসনিক দপ্তর নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত যা ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সার্ক গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর প্রস্তাবিত আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করে।
সার্ক গঠনের পিছনে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলি হল –
- আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি করে অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এটি ছিল এই অঞ্চলের ভঙ্গুর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
- অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন: দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প এবং সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান: আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধাগুলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভাগ করে নেওয়া, যাতে সবাই দ্রুত উন্নয়ন করতে পারে।
- দারিদ্র্য ও অশিক্ষার বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ: দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা। সার্ক এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগের উপর জোর দেয়।
- পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প মোকাবিলায় যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ।
- নারী-শিশু সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্য: নারী ও শিশুদের অধিকার সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা।
- কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে যৌথ পদক্ষেপ: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য সহযোগিতা।
নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত সার্ক সচিবালয় সার্কের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য অপরিহার্য। সার্কের সাংগঠনিক কাঠামোতে রয়েছে বিভিন্ন স্তর, যা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেগুলির বাস্তবায়নকে সহজ করে তোলে। এই স্তরগুলি হল –
- বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন: এটি সার্কের সর্বোচ্চ ফোরাম, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রপ্রধানরা বা সরকার প্রধানরা একত্রিত হন। এই সম্মেলনে প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
- পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক: এই বৈঠকগুলো নীতিগত পরিকল্পনা তৈরি, তার বাস্তবায়ন পর্যালোচনা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চলমান বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
- স্থায়ী কমিটি ও বিভিন্ন কারিগরি কমিটি: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে (যেমন কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি) সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন স্থায়ী ও কারিগরি কমিটি কাজ করে।
- সচিবালয় ও মহাসচিব: সার্কের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য একজন মহাসচিবের নেতৃত্বে সচিবালয় কাজ করে। মহাসচিব প্রতি তিন বছর পর পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বর্ণানুক্রমিক তালিকা অনুসারে নির্বাচিত হন।
এছাড়াও, সার্কের বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য বেশ কিছু কেন্দ্র ও সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেমন:
- দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (SAARC University): ভারতের নতুন দিল্লিতে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আঞ্চলিক জ্ঞান বিনিময়ের একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
- সার্ক কৃষি কেন্দ্র (SAARC Agriculture Centre): এটি বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত, যা কৃষি গবেষণা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ উন্নয়নে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করে।
- সার্ক শক্তি কেন্দ্র (SAARC Energy Centre): এটি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত, যা শক্তি নিরাপত্তা, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে কাজ করে।
- সার্ক উন্নয়ন তহবিল (SAARC Development Fund): ভুটানের থিম্পুতে অবস্থিত এই তহবিলটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে। এটি সদস্য দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সার্কের অর্থনৈতিক লক্ষ্যপূরণের জন্য সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পদক্ষেপ ছিল SAFTA (South Asian Free Trade Area) গঠন। এই চুক্তিটি ২০০৪ সালের ৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ১২তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।
SAFTA-র মূল উদ্দেশ্য:
- বাণিজ্য উদারীকরণ: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা (যেমন কোটা বা লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া) কমিয়ে পণ্য ও সেবার অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা। এর লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহকে ত্বরান্বিত করা।
- আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো, যা তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
- অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিনিয়োগ: বাণিজ্য পদ্ধতি সরলীকরণের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
তবে, বাস্তবে SAFTA তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি। দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক সংঘাত, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস, বাণিজ্য সহযোগিতা ব্যাহত করেছে। এর ফলে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫-৭ শতাংশ আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আসিয়ানের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক জোটের তুলনায় অনেক কম।
যে সমস্ত প্রত্যাশা জাগিয়ে সার্কের সূচনা হয়েছিল তার সমস্ত পূরণ না হলেও সার্কের পথচলায় কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে, যেমন:
- SAARC Scholarship ও SAARC Literary Festival শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
- ম্যালেরিয়া, এইডস, এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির সময় সদস্য দেশগুলো চিকিৎসা ও ওষুধ বিনিময়ে সহযোগিতা করেছে।
- ভারত বিশেষভাবে একাধিক সদস্য রাষ্ট্রকে ভ্যাকসিন এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়েছে।
- SAARC Disaster Management Centre এবং SAARC Environment Action Plan পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
- SAARC Development Fund সামাজিক প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
সার্কের প্রত্যাশাপূরণের ব্যর্থতার মূল কারণগুলি হল:
- ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা সার্কের কার্যক্রমকে প্রায়শই বাধার মুখে ফেলেছে। এই দ্বিপাক্ষিক বিরোধ বহু উদ্যোগের বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- ২০১৬ সালের সার্ক সম্মেলন পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, উরির হামলার পরে ভারত তা বর্জন করে এবং অন্যরাও সরে আসে।
- ভারতের তুলনায় অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। এতে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয় এবং আস্থা সংকট দেখা দেয়।
- বহু চুক্তি ও প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগেই রাজনৈতিক টানাপড়েনে থেমে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্মিলিত মতের প্রয়োজন থাকায় অনেক সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না।
সার্কের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় ভারতসহ অনেক দেশ BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation)-এর দিকে ঝুঁকছে। বিমস্টেক-এর সদস্য দেশগুলি হল: ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড।
বিমস্টেক-এ পাকিস্তান নেই, ফলে রাজনৈতিক সংঘাত কম এবং এটি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর উপর বেশি ফোকাস করে। বর্তমানে ভারত বিমস্টেক-কে “অ্যাকশন ওরিয়েন্টেড” এবং বাস্তবমুখী আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরছে।
সার্ক ছিল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি স্বপ্ন—শান্তি, উন্নয়ন ও সহযোগিতার এক প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে, রাজনৈতিক বিরোধ ও আস্থার সংকটে সার্ক তার সম্ভাবনার অনেকটাই হারিয়েছে। এতদসত্ত্বেও, এ অঞ্চলের দারিদ্র্য, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, ও জনস্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সংস্থা এখনও জরুরি। সার্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক নমনীয়তার ওপর। যদি এগুলো অর্জন করা যায়, তাহলে সার্ক আবার দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান