পাহাড়ের প্রসঙ্গ উঠলেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মনে প্রথমেই উঠে আসে দার্জিলিং-এর কথা। এখানে পাহাড়, অরণ্য, চা-বাগানের সৌন্দর্য একত্রে উপভোগ করবার দারুণ অবকাশ রয়েছে। এই দার্জিলিং-এ এমন কয়েকটি অফবিট জায়গা রয়েছে, সৌন্দর্যের বিচারে যাদের জুড়ি মেলা ভার। তেমনই একটি জায়গা হল চটকপুর। এক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অভয়ারণ্যের এলাকার মধ্যে অবস্থিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই পাহাড়ি গ্রামটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় এক গন্তব্যস্থল। এটিকে একটি ইকো ভিলেজ হিসেবে গড়ে তুলেছে সরকার। কাঞ্চনজঙ্ঘার অভূতপূর্ব দৃশ্য দর্শনের অভিজ্ঞতা যেমন পাওয়া যাবে এখানে তেমনি ঘন পাইনবনে ঘেরা আরণ্যক প্রকৃতির নির্জনতায় দুদন্ড নিশ্চিন্ত অবসর যাপনের অবকাশও পাওয়া যাবে। পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে বিচিত্র পাখির দেখা মিলবে, এমনকি পাহাড়ের কোলে অসাধারণ সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখবার সুযোগও পাওয়া যাবে। সব মিলিয়ে শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির বুকে ছুটি কাটানোর জন্য চটকপুর এক আদর্শ ভ্রমণস্থল হতে পারে।
চটকপুর কোথায়
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে দার্জিলিং জেলার অন্তর্গত চটকপুর গ্রামটি সেঞ্চাল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্যে অবস্থিত। দার্জিলিং থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে ৭৮০০ ফুট উচ্চতায় এই গ্রামটি অবস্থিত। এছাড়া গ্রামটি জোরবাংলো থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে, শিলিগুড়ি থেকে ৫৩ কিলোমিটার দূরত্বে এবং নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। আবার কলকাতা থেকে চটকপুরের দূরত্ব প্রায় ৬৩০ কিলোমিটার, বর্ধমান থেকে প্রায় ৫২৭ কিলোমিটার।
চটকপুরের ইতিহাস
সেঞ্চাল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি ১৯১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও চটকপুর গ্রামটি প্রায় ১৮০ বছরের পুরোনো। এই চটকপুরেই একসময় প্রচুর পরিমাণ কাঠ পাওয়া যেত, সেই কারণে এখান থেকে ব্যাপক হারে কাঠ পাচার হত একসময়। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনবিভাগ এই জায়গাটিকে ইকো ট্যুরিজম গ্রাম হিসেবে পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেই কাজে গ্রামবাসীরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। চটকপুর গ্রামে মোটামুটি ১৯টি বা তার কয়েকটি বেশি বাড়ি লক্ষ করা যায়, এটি এতই ছোট একটি গ্রাম। ২০১৭ সালে এই চটকপুরে প্রথম মাউন্টেন বাইক পার্ক খোলা হয়েছিল।
চটকপুরে কীভাবে যাবেন
ট্রেনে করে চটকপুরে যেতে হলে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন ধরে প্রথমে এসে নামতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। সেখান থেকে প্রাইভেট গাড়ি বুক করে চলে যাওয়া যাবে চটকপুর। যদি বাসে করে আসতে হয় তবে শিলিগুড়ি পর্যন্ত বাসে এসে সেখান থেকে গাড়ি বুক করে সরাসরি চলে যাওয়া যায় চটকপুরে। নতুবা গাড়িতে দার্জিলিং পর্যন্ত এসে সেখান থেকে গাড়ি বদলে জোরবাংলো হয়ে সেঞ্চাল অভয়ারণ্যের ঘন বনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া ওল্ড মিলিটারি রোড ধরে এগোলে রাস্তাটি চটকপুর রোডের সাথে মিলিত হয়েছে দেখা যাবে। তবে শিলিগুড়ি থেকে নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে উপরোক্ত রুটগুলিতেও যাওয়া যাবে। এমনকি শিলিগুড়ি থেকে ঘুম বা সোনাদা পর্যন্তও চলে আসা যেতে পারে। বিমানে এলে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামতে হবে।
শেয়ার করে গাড়িতে যেতে হলে সোনাদা পর্যন্ত যাওয়া যাবে। সেখান থেকে চটকপুর মাত্র ছয় কিলোমিটার। সোনাদার পর থেকে ঘন বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা গেছে, এই রুটটিই চটকপুরে পৌঁছনোর তুলনামূলকভাবে ছোট রুট। স্থানীয় চালকরা সাধারণত এই রাস্তাতেই যান। যদিও রাস্তাটির অবস্থা বেশ বেহাল। সোনাদা থেকে কিছুদূর এগোলে পুলিশ চেকপোস্ট পাওয়া যাবে। শেয়ার বা প্রাইভেট গাড়ি হোক, পারমিট না থাকলে সেখান থেকে করিয়ে নেওয়া যাবে কারণ পারমিট ছাড়া অভয়ারণ্যে প্রবেশ নিষেধ।
চটকপুরে কোথায় থাকবেন
চটকপুর একটি ছোট্ট গ্রাম এবং ১৯-২০টি মাত্র স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি চটকপুরে ছড়িয়ে রয়েছে। সেই বাড়িগুলিরই একাংশ তারা হোমস্টে হিসেবে পর্যটকদের ভাড়া দিয়ে থাকেন। তবে চটকপুরে আসার আগে হোমস্টে বুক করে আসা ভালো এবং উল্লেখ্য যে, হোমস্টের মালিককে আগে থাকতে বললে তারা বনদপ্তরে গিয়ে পারমিট করিয়ে রাখতেও পারে, কারণ অভয়ারণ্যে প্রবেশের জন্য সেই অনুমতিপত্রের প্রয়োজন পড়বে। হোমস্টেগুলিতে ভালো জলের ব্যবস্থা, বাথরুমে গিজারের ব্যবস্থা এমনকি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায় বাথরুম হোমস্টের সঙ্গে সংযুক্ত না হলেও তা একেবারেই কাছে থাকে, খুব বেশি দূরে হয় না। এখানে উল্লেখ্য যে, এইসব হোমস্টে ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনবিভাগ এখানে লোয়ার চটকপুরে দুটি ইকো হাট কটেজ স্থাপন করেছে। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য ভালোভাবে দেখা যায় না তবে আপার চটকপুরের হোমস্টেগুলি থেকে তা দারুণভাবে উপভোগ করা যায়।
চটকপুরে কী দেখবেন
সেঞ্চাল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্যে অবস্থিত এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটির সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা সহজ ব্যাপার নয়৷ এমন পাহাড়ঘেরা সবুজ আরণ্যক প্রকৃতির মাঝে নিজেকে মেলে ধরার, হারিয়ে যাওয়ার অবকাশ তো সচরাচর মেলে না। এছাড়াও প্রধান আকর্ষণ কাঞ্চনজঙ্ঘা তো রয়েছেই। অনেকে বলে থাকেন যে, টাইগার হিলের চেয়েও এই চটকপুর থেকে নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য আরও অপূর্ব দেখতে পাওয়া যায় এবং কথাটি কোনো অংশেই মিথ্যে নয়৷ বিশেষত যদি উপরের বা আপার চটকপুরে থাকা যায় তবে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দারুণ উপভোগ করা যাবে।কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সম্মোহনী মায়ার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। পাইনবনের কুয়াশাবৃত ঘন সবুজ আলোছায়ার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে শিহরণ জাগে সারা শরীরে। তারই সঙ্গে রয়েছে ব্লু ম্যাগপাই, বুলবুল, লং টেইল শ্রাইক ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির বিচিত্র রঙবেরঙের পাখিদের সমাহার। পাখি প্রেমিকদের এ-এক স্বর্গরাজ্য যেন। এই চটকপুরে এলে কী কী দেখা যেতে পারে নীচে তা বিশদে আলোচনা করা হল।
চটকপুর ভিউপয়েন্ট বা ওয়াচ-টাওয়ার – লোয়ার চটকপুরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনবিভাগের তৈরি যে ইকো হাট আছে সেখান থেকে আনুমানিক ১২ মিনিট হাঁটা পথেই রয়েছে একটি ওয়াচ-টাওয়ার, যেটি অবশ্য সানরাইজ পয়েন্ট এবং চটকপুর ভিউপয়েন্ট নামেও পরিচিত। চটকপুর থেকে বোল্ডার ফেলা এবং দুপাশে বাঁশের রেলিং দিয়ে ঘেরা দীর্ঘ পথের প্রান্তে এই ওয়াচ-টাওয়ার। শেষে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে এই ওয়াচ-টাওয়ারে উঠতে হয়। এখান থেকে সান্দাকফুর অসাধারণ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষার শৃঙ্গগুলিতে সোনালি আলোর প্রতিফলন যে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা উপহার দেয় তা আজীবনের সম্পদ হয়ে থেকে যাওয়ার মত।
পাইন বন ও ট্রেকিং রুট – বনবিভাগের ইকো হাট থেকে ডানদিকে ১০০ মিটারের একটু বেশি এগোলেই ঘন পাইনবনের মধ্যে প্রবেশ করা যাবে। কুয়াশাববৃত আবছা আলোছায়ার মায়াবী পরিবেশ সেখানে বিরাজমান। এই পাইনবনের মধ্যেকার পথ ট্রেকিংয়ের জন্যও একেবারে আদর্শ। তবে ট্রেক করতে হলে সঙ্গে স্থানীয় ও প্রশিক্ষিত একজন গাইড রাখা ভালো, কারণ, এই ঘন জঙ্গলে চিতাবাঘ, বার্কিং ডিয়ার, ভাল্লুকের মতো বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে। যদি কপালে থাকে তবে হয়তো লাল পান্ডাও দেখা হয়ে যেতে পারে।
কালিপোখরি – ইকো হাট থেকে হাঁটা পথে কালিপোখরি নামে একটি স্থানীয় জলাশয়ের দিকে ঘুরে আসা যায়। কালি অর্থাৎ কালো এবং পোখরি শব্দের অর্থ পুকুর। পাইন বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটা পথে এবং তারপর আরও ঘন বনভূমি পেরিয়ে এখানে পৌঁছনো যায়। স্থানীয়রা এই পুকুরটিকে পবিত্র পুকুর বলে মনে করে। জলাশয়ের মধ্যে একটি বড় পাথরের চাঁই লক্ষ করা যায়। বনভূমির মাঝে অবস্থান হলেও এই পুকুরের জল কিন্তু পরিষ্কার।
জৈব চাষের খামার – এই চটকপুর গ্রামের বাসিন্দারা পর্যটন ছাড়াও মূলত কৃষিকাজ করেই তাদের জীবন নির্বাহ করে থাকে। জৈব পদ্ধতিতে তারা বিভিন্নরকম সবজি চাষ করে। সেইসব জৈব চাষের খামারগুলিও পরিদর্শন করা যেতে পারে, এমনকি পর্যটকেরা সেখান থেকে কম দামে জৈব শাকসবজি এবং ডাল কিনে নিয়েও যেতে পারেন।
চটকপুর থেকে আশেপাশে মংপু, রাম্বী, তাকদা, তিনচুলে ইত্যাদি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর কয়েকটি জায়গা থেকেও ঘুরে আসা যায়।
চটকপুর কখন যাবেন
অনেকটা উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় শীতকালে এখানকার আবহাওয়া বেশ শীতল এবং এ-অঞ্চলটি কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে এক অপূর্ব রূপ ধারণ করে। সেই কারণেই অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে অর্থাৎ মূলত শীতকাল চটকপুর বেড়াতে যাওয়ার পক্ষে উপযুক্ত হতে পারে। এছাড়া অবশ্য গ্রীষ্মকালেও শহরের দাবদাহের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যও চটকপুর ঘোরার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ মূলত বর্ষাকালে সময়টি বিভিন্ন প্রাণীদের প্রজনন ঋতু হওয়ার কারণেই অভয়ারণ্য বন্ধ থাকায় এইসময় চটকপুরে ঢোকা যাবে না। এই ।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর—বর্ষাকালের এই সময়টুকু চটকপুর গ্রামে যাওয়া যায় না, কারণ বিভিন্ন প্রাণীর প্রজনন ঋতু হওয়ায় এসময় অভয়ারণ্য বন্ধ রাখা হয়।
- চটকপুরে যাওয়ার আগে বনবিভাগের দপ্তর থেকে পারমিট করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে নিতে হবে, কারণ অনুমতিপত্র ছাড়া অভয়ারণ্যে প্রবেশ করা অপরাধ। অভয়ারণ্যে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য ধার্য করা আছে।
- সোনাদার পর থেকে কিংবা বাগোরা গ্রাম হয়ে চটকপুরের দিকে যাওয়ার রাস্তা পাথুরে এবং খুবই বেহাল অবস্থায় রয়েছে, ফলে এরকম রাস্তায় চলার জন্য উপযুক্ত গাড়ি নিয়ে আসতে হবে। গাড়ি বুকিং এর সময় সেগুলো ভাল ভাবে কথা বলে নিন।
- চটকপুরের ঘন পাইনবনে ট্রেকিংয়ের সময় স্থানীয় প্রশিক্ষিত গাইড সঙ্গে রাখা ভালো, কারণ জঙ্গলে চিতাবাঘ, বার্কিং ডিয়ারের মতো বন্যপশুরা রয়েছে।
- চটকপুরে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ভালো। সমস্তরকম ওষুধ চাইলেই সেখানে হাতের কাছে নাও পাওয়া যেতে পারে।
- সম্ভব হলে আপার চটকপুরের কোনো হোমস্টেতে বুকিং নেওয়া ভালো কারণ সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান