পাহাড়ের প্রসঙ্গ উঠলেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মনে প্রথমেই উঠে আসে দার্জিলিং-এর কথা। এখানে পাহাড়, অরণ্য, চা-বাগানের সৌন্দর্য একত্রে উপভোগ করবার দারুণ অবকাশ রয়েছে। এই দার্জিলিং-এ এমন কয়েকটি অফবিট জায়গা রয়েছে, সৌন্দর্যের বিচারে যাদের জুড়ি মেলা ভার। তেমনই একটি স্থান হল দাওয়াইপানি। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত কয়েকঘর মাত্র বসতির এই গ্রাম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। দাওয়াইপানির চারপাশে সবুজ অরণ্যের সমাহার, বিখ্যাত কয়েকটি চা-বাগান ঘিরে রয়েছে একে। এছাড়াও দূরে পাহাড়ের সারি, মেঘের দল—সব মিলিয়ে যেন একটুকরো স্বর্গ। দাওয়াইপানির চারপাশের জঙ্গলে বিচিত্র সব পাখিদের দেখা মেলে। নিকটেই রয়েছে ছোট্ট একটি পাহাড়ি নদী। এমন শান্ত, নির্জন একটি স্থান দুদন্ড অবসর যাপনের জন্য মন্দ নয়। দৈনন্দিন একঘেয়ে জীবন থেকে কিঞ্চিৎ ছুটি নিয়ে পাহাড় ও আরণ্যক প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনের মাঝে হারিয়ে যেতে দাওয়াইপানি হতে পারে উপযুক্ত ভ্রমণস্থল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
দাওয়াইপানি কোথায়
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে দার্জিলিং জেলার অন্তর্গত একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম হল দাওয়াইপানি। এই গ্রামটি প্রায় ৬৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। দার্জিলিং শহর থেকে দাওয়াইপানির দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং ঘুম স্টেশন থেকে দাওয়াইপানির অবস্থান প্রায় বিশ মিনিটের দূরত্বে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দাওয়াইপানির দূরত্ব প্রায় ৭৬ কিলোমিটার এবং শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব ৭০ কিলোমিটারের একটু বেশি। অন্যদিকে কলকাতা থেকে দাওয়াইপানির দূরত্ব প্রায় ৬৪৭ কিলোমিটার এবং বর্ধমান থেকে প্রায় ৫৪৩ কিলোমিটার।
দাওয়াইপানির ইতিহাস

দাওয়াইপানি শব্দটির অর্থ ঔষধযুক্ত জল। যদিও তেমন কোন জলাধার দাওয়াইপানির আশেপাশে আছে বলে জানা যায় না। আসলে দাওয়াইপানির নিকটেই একটি নদী রয়েছে, স্থানীয় ভাষায় যেটি ‘খোলা’ নামে পরিচিত, সেই নদী থেকেই নাকি জায়গাটির এমন নাম হয়েছিল বলে মনে করে থাকেন ঐতিহাসিকেরা। তবে এই দাওয়াইপানি নামকরণের পিছনে একটি প্রচলিত জনশ্রুতি রয়েছে, যদিও সেই জনশ্রুতির সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তা হল, ব্রিটিশ শাসনামলে এই গ্রামের চা-বাগানে কর্মরত ছিলেন একজন কর্নেল। সেই কর্নেলের পায়ে একটি ক্ষত ছিল, যা হাজার চেষ্টাতেও কিছুতেই সারছিল না। একদিন কর্নেল পায়ে হেঁটেই গ্রামের একটি নদী পার হয়ে যান। তারপর থেকেই আশ্চর্যজনকভাবে নাকি সাহেবের পায়ের ক্ষত সেরে যেতে থাকে। সেই থেকেই নাকি গ্রামের নাম হয়েছে, দাওয়াইপানি। এই গ্রামে মাত্র ১৩৫ থেকে ১৫০টি পরিবারের বসবাস।
দাওয়াইপানি কীভাবে যাবেন
ট্রেনে করে দাওয়াইপানি যেতে হলে শিয়ালদহ বা হাওড়া বা বর্ধমান থেকে উত্তরবঙ্গের ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে গাড়ি বুক করে চলে যাওয়া যাবে দাওয়াইপানিতে। শেয়ার গাড়িতেও যাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে প্রথমে দার্জিলিং এবং সেখান থেকে জোরবাংলো পর্যন্ত গিয়ে আবার দাওয়াইপানির গাড়ি ধরতে হবে। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন এবং শিয়ালদহ/হাওড়া/বর্ধমান রুটের মধ্যে বেশ কিছু ট্রেন আছে, এমনকি গ্রীষ্ম বা পুজোয় অনেক সময় ভিড় সামলাতে স্পেশ্যাল ট্রেনও দেওয়া হয়। বন্দে ভারত বা শতাব্দী এক্সপ্রেসের মতো প্রিমিয়াম ট্রেনে কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যেতে সময় সাড়ে সাত ঘন্টা থেকে সাড়ে আট ঘন্টা লাগে। অন্যান্য মেল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে এই দূরত্ব যেতে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা সময় লাগে।
বাসে করে যেতে হলে শিলিগুড়ি পর্যন্ত বাসে গিয়ে, শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যাবে দাওয়াইপানিতে। অন্যদিকে যদি প্রাইভেট গাড়িতে যেতে হয় তবে এনএইচ ১০ (বেঙ্গল-সিকিম হাইওয়ে) বা এনএইচ ১১০ (শিলিগুড়ি-দার্জিলিং হাইওয়ে) ধরতে হবে। এনএইচ ১০ ধরে এলে প্রথমে আসতে হবে তিস্তা বাজারে, সেখান থেকে চড়াই উঠতে হবে পেশোক রোড ধরে সিক্সথ মাইলের কাছাকাছি একটি ক্রসিং-এ পৌঁছনোর জন্য। যদি এনএইচ ১১০ ধরে আসেন তাহলে জোরবাংলো দিয়ে পেশোক রোডে এসে সেই ক্রসিংয়েই যেতে হবে। সেই ক্রসিং থেকে উত্তরদিকে কয়েক কিলোমিটার গেলেই পাওয়া যাবে দাওয়াইপানি গ্রাম। যদি আকাশপথে অর্থাৎ বিমানে আসতে হয়, তবে নিকটবর্তী বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামতে হবে এবং সেখান থেকে গাড়ি বুক করে সোজা চলে আসা যাবে গন্তব্য দাওয়াইপানিতে।
দাওয়াইপানিতে কোথায় থাকবেন
সাধারণত অফবিট দার্জিলিং ভ্রমণের পরিকল্পনার মধ্যে স্বল্পপরিচিত এই দাওয়াইপানি গ্রামটিকেও ধরা হয়। তবে এখানকার নেসর্গিক সৌন্দর্যের খবর ছড়িয়ে পড়ে সময়ের সাথে সাথে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দাওয়াইপানিতে বড় হোটেল না থাকলেও সুন্দর বেশকিছু হোমস্টে রয়েছে। প্রধানত সেই গ্রামের বাসিন্দারাই তাদের বাড়ির একাংশকে হোমস্টেতে রূপান্তরিত করে সেগুলিতে পর্যটকদের থাকবার ব্যবস্থা করেছেন। তবে হোমস্টেগুলিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কারণ প্রয়োজনীয় সমস্ত উপকরণ, সংযুক্ত বাথরুম ইত্যাদি সকল সুবিধাই সেগুলিতে রয়েছে। এছাড়াও সরল সাধাসিধে পাহাড়ি মানুষগুলির আতিথেয়তা তো অবশ্যই উপরি পাওনা।
দাওয়াইপানিতে কী দেখবেন
শৈলশহর দার্জিলিং থেকে কিছু দূরে এই শান্ত, নির্জন, সবুজে মোড়া ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম দাওয়াইপানি প্রকৃতির অকৃপণ দানে এক টুকরো স্বর্গের মতোই যেন বিরাজ করছে। পাইনবনের কুয়াশাবৃত আবছা আলোছায়া, উপত্যকার মাথায় মেঘেদের আনাগোনা, হিমালয় অঞ্চলের বিচিত্র পাখির কলরব, দূরে ধ্যানী ঋষির মতো গম্ভীর অথচ অপূর্ব সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহময় রূপ—সব মিলিয়ে দাওয়াইপানিতে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক মেলবন্ধন ঘটেছে যেন। পাখিপ্রেমীদের জন্যও দাওয়াইপানি এক উপযুক্ত জায়গা। এখানে হিমালয় অঞ্চলের বিচিত্র রঙবেরঙের পাখি যথা, হিমালয়ান মোনাল, ব্ল্যাক ফ্রাঙ্কোলিন, কোকলাস ফিজ্যান্টের মতো অনেক প্রজাতির পাখি দেখা যায়। সুদৃশ্য ছোট্ট এই গ্রামের পথে হেঁটে বেড়ালে, পাইনবনের ভিতরে সবুজ অন্ধকার গায়ে মেখে ঘুরে বেড়ালে যে শিহরন জাগে, যে রোমাঞ্চ হয় তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। দাওয়াইপানি থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য অসাধারণ লাগে। সূর্যাস্তের আগে আকাশের রক্তিম আভার প্রতিবিম্ব যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে আদুরে প্রলেপের মতো পড়ে থাকে কিংবা সূর্যোদয়ের সময় ভোরের প্রথম সোনালি আলো যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে পরিয়ে দেয় সোনার মুকুট, তখন সেই দৃশ্য দেখলে সত্যিই তা আজীবনের সম্পদ হয়ে থেকে যাবে। দাওয়াইপানির কাছেই ছোট্ট ‘খোলা’ নদীটিও অত্যন্ত সুন্দর। প্রকৃতির বুকে দুদন্ড অবসর যাপনের জন্য দাওয়াইপানি খুবই উপযুক্ত এক গন্তব্য হতেই পারে। দাওয়াইপানিতে সাধারণত কী কী দেখবার এবং করবার আছে, সেগুলি নিচে দেওয়া হল।

খোলা নদী – দাওয়াইপানি গ্রামের একরকম গা ঘেঁষেই বয়ে যাচ্ছে একটি ছোট্ট পাহাড়ি নদী, যেটি স্থানীয় ভাষায় খোলা নদী নামে পরিচিত। তবে এই নদীর জলকেই প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে ওষুধের জল বা দাওয়াইপানি বলে মনে করা হয় এবং সেখান থেকেই এই জায়গার নাম হয়েছে বলে মনে করা হয়। নদীর ধারে পিকনিকের আয়োজনও করা যেতে পারে। পাহাড়ি উপত্যকায় সেই বনভোজনের আয়োজন মন্দ হবে না। তবে জায়গাটি নোংরা করবেন না।
তামাংদের গ্রাম- দাওয়াইপানিতে গিয়ে তামাংদের গ্রাম ঘুরে দেখা যায়। সেখানে গেলে তামাং মানুষদের সঙ্গেও পরিচয় হবে, তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রীতিনীতি সম্পর্কেও একটি ধারণা পাওয়া যাবে। এমনকি তাদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের অনুষ্ঠানেও যোগ দেওয়া যেতে পারে।
জৈব খামার – দাওয়াইপানিতে জৈব পদ্ধতিতে সবজি ও ফলের চাষও করা হয়ে থাকে৷ চা, সবজি ও ফলের সেইসব অত্যাশ্চর্য খামারগুলি পরিদর্শন করা যেতে পারে। সেই খামারগুলিতে ঘুরলে জৈবচাষ বিষয়ে কিঞ্চিৎ জ্ঞানার্জনও করা যাবে৷
হাইকিং ও ট্রেকিং – দাওয়াইপানির মতো ছবির মতো সুন্দর পাহাড়ি উপত্যকাগুলি হাইকিং-এর জন্য একেবারে উপযুক্ত স্থান। পাহাড়ি এই সুদৃশ্য পরিপাটি গ্রামের পথে, পাইনবন এবং হিমালয়ের আরও নানা উদ্ভিদে পরিপূর্ণ বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে রোমাঞ্চকর হাইকিং-এর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যাবে। তাছাড়া দাওয়াইপানিতে ট্রেকিং করবারও সুযোগ পাওয়া যাবে। দাওয়াইপানির যে-কোনো হোমস্টে থেকে পেশোক রোড পর্যন্ত আনুমানিক এক ঘন্টার একটি সংক্ষিপ্ত ট্রেকিং-এর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভ করা যাবে৷ পারদর্শিতা অনুযায়ী ট্রেকাররা সহজ থেকে মাঝারি বা কঠিন ট্রেকিং-এর পথে ট্রেক করবার সুযোগ পেতে পারেন এখানে।
দাওয়াইপানির আশেপাশে বেশ কিছু জায়গা সাইটসিইং এর জন্য যাওয়া যায়। যেমন লামাহাট্টা, তাকদা, তিনচুলে, সিটং ইত্যাদি আরও কয়েকটি সুন্দর স্থানে ঘুরে আসতে পারেন পর্যটকেরা।
দাওয়াইপানিতে কখন যাবেন
বছরের বিভিন্ন সময়তেই অল্পবিস্তর পর্যটকদের আনাগোনা এখানে লেগে থাকলেও, অক্টোবর থেকে জুন মাস দাওয়াইপানি ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত। তবে বর্ষাকালটি এড়িয়ে যাওয়াই ভালো, কারণ বর্ষার সময়ে পাহাড়ি রাস্তায় ধ্বস নামার সম্ভাবনা থেকে যায়। গ্রীষ্মকালে শহরের দাবদাহ থেকে এই শীতল পাহাড়ি গ্রামটিতে ছুটি কাটাতে গেলেও মন্দ হয় না, আবার শীতের সময়ে এখানকার সৌন্দর্য হয় অন্যরকম৷ ঘন কুয়াশায় ঘেরা পাইনবনের অপূর্ব রূপ তখন দারুণভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- দাওয়াইপানি বেড়াতে গেলে বর্ষাকালটি এড়িয়ে চলাই মঙ্গল। অনেক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় পাহাড়ি রাস্তায় চড়াই উঠতে হবে সেখানে পৌঁছনোর জন্য। বর্ষার সময় সেইসব বিপজ্জনক পাহাড়ি পথে ধ্বসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
- দাওয়াইপানি গেলে সেখানকার জৈব খামারগুলি পরিদর্শন করতে গেলে খেয়াল রাখবেন যেন চাষের কাজে কোনো ক্ষতি না হয় এবং সেইসব খামারে আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নোংরা করবেন না।
- গ্রামের পথে বা জঙ্গলের রাস্তায় হাইকিং কিংবা ট্রেকিং-এর সময় শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেওয়াই ভালো, কারণ পাহাড়ি রাস্তায় ট্রেকিং-এর জন্য উপযুক্ত শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োজন।
- দাওয়াইপানি বেড়াতে গেলে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র যথেষ্ট পরিমাণে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো, কারণ দার্জিলিং থেকে দূরে এই স্বল্পপরিচিত গ্রামে সব সময় সমস্তরকম ওষুধ পাওয়া নাও যেতে পারে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান