সববাংলায়

জয়রামবাটি ভ্রমণ

বাংলার অধ্যাত্ম-সংস্কৃতির জগতে রামকৃষ্ণ পরমহংস এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব আর তাঁরই সঙ্গে উচ্চারিত হয় পরম সেবাময়ী স্নেহময়ী সকলের মা সারদা দেবীর নাম। তাই তাঁদের জন্মস্থান হিসেব পশ্চিমবঙ্গের কামারপুকুর এবং জয়রামবাটি খুবই বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে রামকৃষ্ণের জন্মস্থান কামারপুকুর এবং সারদা দেবীর জন্মস্থান জয়রামবাটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। সারদা দেবীর জন্ম এবং বাল্যকাল কেটেছে জয়রামবাটিতে। জয়রামবাটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে এবং মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার এক অনাম্নী গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হতে সপ্তাহান্তের ছুটিতে ঘুরতে চলে যান জয়রামবাটি।

জয়রামবাটি কোথায়

বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত জয়রামবাটি গ্রামটি বিষ্ণুপুর মহকুমার অন্তর্গত। জয়রামবাটি থেকে ৪৪ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে বিখ্যাত বিষ্ণুপুর শহরতারকেশ্বরের শিবমন্দির থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এবং কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে জয়রামবাটি অবস্থিত।

জয়রামবাটির ইতিহাস

জয়রামবাটি গ্রামে ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর সারদা দেবীর জন্ম হয়। তাঁর বাড়ির সামনেই ছিল পুণ্যপুকুর এবং একটি পাড় বাঁধানো সুন্দর দিঘি। এই দিঘি আজ মায়ের ঘাট বা মায়ের দিঘি নামে পরিচিত। জয়রামবাটির পাশ দিয়ে বয়ে চলা আমোদর নদকে সারদা মা বলতেন আমার গঙ্গা। সারদা দেবী এখানে স্নান করতেও আসতেন বলে শোনা যায়। সারদা মায়ের গৃহদেবতা ছিলেন সুন্দর নারায়ণ ধর্মঠাকুর যার একটি মন্দির রয়েছে পুণ্যপুকুরের পশ্চিম পাড়ে। অনতিদূরেই শান্তিনাথ মন্দিরের নাটমণ্ডপেই মা সারদা শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে পতিরূপে বরণ করেছিলেন। বিষ্ণুপুরে আসার সময় প্রতিবারই সারদা মা কোয়ালপাড়ায় জগদম্বা আশ্রমে এসে বিশ্রাম নিতেন, তারপর কলকাতায় রওনা হতেন। কোয়ালপাড়া তাই মায়ের বৈঠকখানা নামেই পরিচিত।

জয়রামবাটি কীভাবে যাবেন

জয়রামবাটি যেতে হলে ট্রেনে, বাসে বা গাড়ি করে যাওয়াই সুবিধেজনক। ট্রেনে করে তারকেশ্বর স্টেশনে নেমে সেখান থেকে বাসে ৫০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে খুব সহজে পৌঁছানো যায় জয়রামবাটি। কামারপুকুরের নিকটবর্তী স্টেশন গোঘাট কিংবা আরামবাগেও নামা যায়। তারকেশ্বর স্টেশনে নেমে পাশেই তারকেশ্বর বাসস্ট্যাণ্ড থেকে জয়রামবাটিগামী বাসে উঠে পড়া যাবে। তাছাড়া কলকাতা বা দক্ষিণবঙ্গ থেকে বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরগামী বাসে করেও যাওয়া যায়। আসানসোল, বর্ধমান, পানাগড়, দুর্গাপুর, মেদিনীপুর, বিষ্ণুপুর সহ বিভিন্ন জায়গা থেকেই সড়কপথে নিজের গাড়ি করে এখানে যাওয়া যায়।

জয়রামবাটিতে কোথায় থাকবেন

জয়রামবাটিতে থাকতে চাইলে সবথেকে ভালো হয় মঠ ও মিশনের অভ্যন্তরে আবাসিক আশ্রমে থাকা। বাইরে অনেক হোটেল থাকলেও জয়রামবাটির মঠের প্রাঙ্গণের মধ্যে থাকাই নিরাপদ এবং খরচও অনেক কম হয়। জয়রামবাটিতে মাতৃমন্দিরে থাকতে কোনো ভাড়া দিতে হয় না, তবে তা মঠ ও মিশনের সম্পাদক মহারাজের অনুমতি নিতে হয় আগে থেকে। সবসময়ই মানুষের ভিড় থাকার কারণে তিন রাতের বেশি এখানে থাকার অনুমতি পাওয়া যায় না। তাই ঘুরতে বেরোবার দু মাস আগে থেকে আশ্রমে যোগাযোগ করে নিতে হবে।

অন্যান্য সময়ের তুলনায় পুজোর সময় ভিড় অত্যন্ত বেশি থাকে বলে থাকার জায়গা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে পুজোর সময় ঘোরার হলে অবশ্যই আগে থেকে আশ্রমে কথা বলে রাখাই শ্রেয়। তাছাড়াও এখানে প্রচুর লজ আছে। লজগুলো আগে থেকে বা পৌঁছে দুভাবেই বুক করা যায়। তবে লজে যদি থাকতেই হয় তাহলে মঠের কাছে কোনও লজে থাকবেন, তাহলে সুবিধা হবে। যদি নিজে গাড়ি নিয়ে যান, তাহলে আগে থেকে লজের সাথে কথা বলে নেবেন যাতে গাড়ি পার্কিং নিয়ে কোন অসুবিধায় না পড়তে হয়।

জয়রামবাটিতে কী দেখবেন

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর -এ অসংখ্য দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে । শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের ভিতরেই অধিকাংশ দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে। প্রথমে দেখে নেওয়া যাক কামারপুকুরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি-  

জয়রামবাটি ভ্রমণ » সববাংলায়
মায়ের নতুন বাড়ি। ছবি – ইন্টারনেট

মাতৃমন্দির মঠ : জয়রামবাটির যে বাড়িতে সারদা দেবীর জন্ম হয়েছিল সেখানেই তৈরি হয়েছে এই মাতৃমন্দির। ভিতরে রয়েছে সুদৃশ্য সারদা দেবীর মর্মর মূর্তি। স্বামী সারদানন্দের প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল এই মাতৃমন্দির মঠ এবং মূল মন্দিরটি।

সিংহবাহিনীর মন্দির : জয়রামবাটির গ্রাম্য দেবী সিংহবাহিনীর মন্দিরটি খুবই জাগ্রত। জানা যায় এই মন্দিরেই সারদা দেবীর মা শ্যামাসুন্দরী দেবী দেখেছিলেন এক লাল চেরি পরা কিশোরী কন্যাকে।

মায়ের ঘাট ও আমোদর নদ : পুণ্যপুকুর নামে আগে পরিচিত ছিল এই মায়ের ঘাট। বাল্যকালে এই পুকুরের পাড়ে বসে গরুদের ঘাস খাওয়াতেন সারদা দেবী। আর এই আমোদর নদ ছিল সারদা মায়ের গঙ্গা, প্রায়ই এখানে স্নান করতে আসতেন সারদা মা।

এই সবই জয়রামবাটি মঠ বা মাতৃমন্দির প্রাঙ্গণের আশেপাশেই দেখা যাবে। তাছাড়া মায়ের পুরনো বাড়ি এবং নতুন বাড়ি, সারদা দেবীর গৃহদেবতা সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির, লক্ষ্মীজলা, বুধুই মোড়লের শ্মশানও ঘুরে দেখতে পারেন।

এছাড়া হুগলির আরামবাগ ছাড়িয়ে গেলে পাওয়া যায় তেলোভেলোর মাঠ। এই মাঠেই ডাকাতবাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছিল সারদা মায়ের, চাইলে জয়রামবাটি ঘোরার পরে এই স্থানটিও দেখে আসা যায় সাইটসিইং হিসেবে। তাছাড়া অন্যান্য সাইটসিইং-এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জয়রামবাটি থেকে ২ কিমি দূরত্বে শিহড়ে হৃদয়রাম মুখার্জীর বাড়ি এবং ‘মায়ের বৈঠকখানা’ হিসেবে পরিচিত কোয়ালপাড়ার জগদম্বা আশ্রম। দেড়- দুদিনের মধ্যেই খুব ভালো করে ঘুরে আসা যায় কামারপুকুর-জয়রামবাটি। তবে দুর্গাপুজোর সময় ঘুরতে এলে জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর দুই জায়গার পুজো দেখারই অভিজ্ঞতা হবে। মঠ-প্রাঙ্গণের মধ্যে কোনো আমিষ খাবার নিয়ে না ঢোকা উচিত। অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ কোনোভাবেই যাতে নোংরা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। খাবারের প্যাকেট বা খালি জলের বোতল নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলে আসাই শ্রেয়। এছাড়া অযথা হৈ-হল্লা বা চিৎকার-চেঁচামেচি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।  

জয়রামবাটিতে কখন যাবেন

বছরের যে কোনো সময়েই জয়রামবাটি যাওয়া যেতে পারে। তবে জয়রামবাটিতে মাতৃমন্দিরের বিশেষ কিছু সময়সূচি রয়েছে। এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মাতৃমন্দির ভোর ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা ০৫ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে আর অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত ৮টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এই মন্দির খোলা থাকে। এখানে উল্লেখ্য মন্দিরে প্রবেশের সময় ক্যামেরা, মোবাইল নিয়ে যাওয়া যায় না। মোবাইল সঙ্গে থাকলে তা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখতে হয়, মন্দিরের ভিতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ।

জয়রামবাটিতে কী খাবেন

জয়রামবাটিতে ঘুরতে এলে মাতৃমন্দিরের অন্নভোগ খাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া না করাই ভালো। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়া দরকার। প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত দুপুরের প্রসাদের কুপন দেওয়া হয়ে থাকে। রাতে যদি এই প্রসাদই খেতে চান, সেক্ষেত্রে একসঙ্গে রাতের কুপনটিও কেটে নিতে পারেন। এখানকার সব প্রসাদই নিরামিষ।

জয়রামবাটিতে কী কিনবেন

জয়রামবাটিতে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধীনে পল্লী উন্নয়ন সমিতির নানা স্টল থাকে যেখানে গ্রামীণ মহিলাদের হাতে তৈরি শাড়ি, শৌখিন জিনিস, আচার, ইত্যাদি পাওয়া যায়। ইচ্ছা থাকলে স্টল ঘুরে এগুলি কেনাকাটা করতে পারেন।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • মঠের যাত্রীনিবাসে থাকার জন্য আগে থেকে ইমেইলের মাধ্যমে আশ্রমের মহারাজদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তবে এখানে আসা উচিত। ইমেইল ছাড়া অন্য কোনভাবেই এখানে বুকিং পাওয়া যায় না।
  • আশ্রম ও মঠ প্রাঙ্গণ যাতে কোনভাবে নোংরা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
  • মন্দিরের মধ্যে ছবি তোলা যায় না, ফলে মন্দিরে ঢোকার সময় ক্যামেরা ব্যবহার করা যাবে না এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন মোবাইল ফোন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। ছবি তুললে ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশন থেকে ফোন সংগ্রহ করতে হয়।
  • এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মাতৃমন্দির ভোর ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা ০৫ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত ৮টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এই মন্দির খোলা থাকে।
  • নিজের গাড়ি নিয়ে গেলেও টোটো করে ঘোরাই সুবিধাজনক কারণ বেশ কিছু জায়গায় গাড়ি প্রবেশ করতে পারবেনা।
  • প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত দুপুরের প্রসাদের কুপন দেওয়া হয়ে থাকে।

ট্রিপ টিপস

  • কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চল থেকে কামারপুকুর এক দিনে ঘুরে নিতে চাইলে ভোরের বাস বা ট্রেন ধরে সকাল দশটার মধ্যে পৌঁছে দুপুরের বাসে বা ট্রেনে ফিরে আসতে পারেন। তাহলে হাতে অনেকটা সময় পাওয়া যাবে। তবে দুদিন হাতে সময় নিয়ে বেরোলে প্রতিটি স্থান খুব ভাল করে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://rkmjoyrambati.org/
  3. https://kamarpukurjayrambati.com/
  4. https://www.unfoldbangla.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading