সববাংলায়

যমুনোত্রী মন্দির

যমুনোত্রী মন্দিরটি উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উত্তর কাশী জেলায় অবস্থিত। আরও বিশদে বলতে গেলে মন্দিরটি বান্দরপুঞ্চ পর্বতের পাশে এবং কালিন্দ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৩০০ মিটার উচ্চতায় মন্দিরটির অবস্থান। উত্তরাখন্ডের চারটি প্রধান হিন্দু তীর্থস্থানের মধ্যে একটি হল এই যমুনোত্রী মন্দির। এই চারটি পবিত্র স্থানকে ছোট চারধাম বলা হয়ে থাকে। বাকি তিনটি ধাম হল গঙ্গোত্রী, বদ্রীনাথ এবং কেদারনাথ। ছোট চারধাম তীর্থযাত্রা এই যমুনোত্রী মন্দির থেকেই শুরু হয়ে থাকে।

যমুনোত্রী মন্দির সম্পর্কে বেশ কিছু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। যে বান্দরপুঞ্চ পর্বতের পাশে যমুনোত্রী মন্দিরটি অবস্থিত, সেই পর্বতকে ঘিরে রয়েছে সবচেয়ে জনপ্রিয় কিংবদন্তি। সেই কিংবদন্তি অনুসারে, লঙ্কা দহন করে আসবার পর এই স্থানের যমুনার ঠান্ডা জলে ভগবান হনুমান নিজের লেজের আগুন নিভিয়েছিলেন। সেইজন্যই এই শৃঙ্গটিকে বান্দরপুঞ্চ (বাঁদর এবং পুঞ্চ বা লেজ শব্দ দুটির সমাহার) বলা হয়ে থাকে। অন্য একটি কিংবদন্তি অনুসারে প্রাচীন এক ঋষি অসিত বৃদ্ধ বয়সে গঙ্গোত্রীতে যেতে পারেননি। ঋষির সমস্যার কথা বুঝতে পেরে নাকি এখান দিয়ে গঙ্গা নদীর স্রোত বইতে শুরু করেছিল। তাই যমুনোত্রী মন্দিরটিকে ঋষি অসিতের আশ্রম বলে মনে করা হয়। মহাভারতের একটি কাহিনী অনুসারে, যখন পান্ডবরা উত্তরাখণ্ডে তীর্থযাত্রায় এসেছিলেন, তখনই নাকি এখানে অসিত মুনির আশ্রমটি ছিল। পান্ডবরা প্রথমে যমুনোত্রী, তারপর গঙ্গোত্রী, তারপর কেদারনাথ হয়ে বদ্রীনাথের দিকে চলে গিয়েছিলেন। সেই থেকেই এই চারটি মন্দির উত্তরাখণ্ডে ছোট চারধাম নামে খ্যাত। এই মন্দিরকে ঘিরে আরও একটি কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। যমুনোত্রী মন্দিরের পূজনীয় দেবী যমুনাকে সূর্যের কন্যা এবং যমের যমজ বোন বলে মনে করা হয়। বেশ কিছু শাস্ত্রে দেবী যমুনাকেই যমী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার বৈষ্ণবদের কাছে এই যমুনোত্রী মন্দিরে পূজিতা দেবী যমুনা আসলে রাধার অবতার।

যমুনোত্রী মন্দিরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যমুনোত্রী মন্দিরটি ১৮৩৯ সালে তেহরি গাড়োয়ালের রাজা নরেশ প্রতাপ শাহ নির্মাণ করেছিলেন। কোন কোন সূত্র অনুসারে, রাজার নাম নরেশ সুদর্শন শাহ। তবে ভূমিকম্পের কারণে এই মন্দিরের একটি বিশাল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলত, উনবিংশ শতাব্দীতে জয়পুরের মহারানি গুলারিয়া দেবী এই ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরটির পুনর্নির্মাণ করেন। অন্য একটি সূত্রানুসারে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণের আগে মোট দুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ভূমিকম্পে নয়, বরং তুষার এবং বন্যায় সেই ক্ষতি হয়েছিল। মন্দিরের বর্তমান কাঠামোটি উনিশ শতকেই নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

যমুনোত্রী মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী ভীষণই নান্দনিক এবং আকর্ষণীয়। মন্দিরটি নাগর স্থাপত্যশৈলী অনুসরণে নির্মিত। মন্দিরের কাঠামোটি মূলত কাঠ এবং পাথর দ্বারা নির্মিত। এই মন্দির নির্মাণে গ্রানাইট পাথরের ব্যবহার করা হয়েছিল। মন্দিরে শঙ্কু আকৃতির একটি মিনার দেখা যায়। লাল এবং উজ্জ্বল হলুদ রঙের এই মন্দিরটি পাহাড় ঘেরা সবুজ প্রকৃতির মাঝে স্বমহিমায় বিরাজমান। মন্দিরের বাইরে সূর্যকুন্ড এবং গৌরীকুন্ডের অবস্থান স্থানটিকে আরও পবিত্র এবং মহিমান্বিত করে তুলেছে। এই মন্দিরের কাছেই অনেকগুলি গরম জলের ঝর্ণা আছে, সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল সূর্যকুন্ড। এখানে উল্লেখ্য যে, ভক্তেরা একটি কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে বিশেষত মসলিন কাপড়ে চাল এবং আলু রেখে তা সূর্যকুন্ডের গরম জলে সেদ্ধ করে সেটিকে দেবীর প্রসাদ হিসেবে নিয়ে যান। সেই সূর্যকুন্ডের কাছে একটি লাল-বাদামী রঙের শিলা রয়েছে। যমুনা দেবীকে পূজা করবার আগে সেই শিলাটিকে পূজা করার প্রচলন আছে৷ স্কন্দপুরাণ অনুসারে এই পবিত্র শিলার স্পর্শে কোন ব্যক্তি আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করতে পারে। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন যে, যমুনা নদীতে স্নান করলে অকাল মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের কাছেই একটি বেশ বড় আকারের প্রাঙ্গণ রয়েছে। মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে দেবতার প্রতিকৃতি, পৌরাণিক কাহিনী, ফুলের নকশার জটিল ও সূক্ষ্ম সব খোদাইয়ের কাজগুলি খুবই সুন্দর। মন্দিরটির মূলত দুটি অংশ, একটি হল সমাবেশ কক্ষ এবং তারপর গর্ভগৃহ। এই সমাবেশ মন্ডপটিতেই মূলত মন্দির পরিদর্শক, তীর্থযাত্রী ও ভক্তদের সমাগমের জায়গা। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই মন্দির ভক্তদের জন্য খোলা থাকে। তবে গোটা শীতকালটি দেবীমূর্তি থাকে খরসালি গ্রামে। সেখানে তখন পালকি করে দেবীকে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার এপ্রিল-মে মাসে ভক্তদের জন্য মন্দিরের দরজা খুলে যায় যখন, তখন মূর্তিকে মন্দিরে নিয়ে আসা হয়।

যমুনোত্রী মন্দিরের প্রধান বিগ্রহটি অর্থাৎ যমুনা দেবীর মূর্তিটি ১ ফুট লম্বা এবং কালো মার্বেল পাথর দ্বারা নির্মিত। মূর্তিটি অনেকগুলি মালা দিয়ে সজ্জিত। যমুনা দেবী মূর্তির পাশেই রয়েছে শ্বেতপাথরের গঙ্গাদেবীর মূর্তি।

যমুনোত্রী মন্দিরে বছরের বিভিন্ন সময় বিশিষ্ট কিছু দিনে নানারকম উৎসব পালিত হয়ে থাকে। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় বসন্ত পঞ্চমী উৎসবটির কথা। বসন্তের আগমন এবং শীতের শেষে মূলত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে এই উৎসব হয়। এই সময় মন্দিরে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এই দিন দেবী সরস্বতীর পূজা করেন স্থানীয় লোকজন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। বহু মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে এবং মূলত হলুদ পোশাক পরে এই উৎসব উদযাপন করে। কপালে হলুদ রঙের তিলক আঁকে ভক্তেরা, এমনকি হলুদ কাপড়ের তৈরি রুমালও ব্যবহার করে। পরবর্তী যে উৎসবের কথা বলতে হয় সেটি হল ফুল দেই উৎসব। চৈত্র মাসের প্রথম দিন এই উৎসব পালিত হয়ে থাকে। এসময় স্থানীয় লোকেরা, প্রধানত অল্পবয়সী মেয়েরা প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে নারকেল, ফুল, গুড়, মিষ্টি এবং ভাত দিয়ে সজ্জিত থালা উপহার হিসেবে দিয়ে আসে। বিশ্বাস করা হয় এর ফলে সৌভাগ্য এবং সমৃদ্ধি আসে। বিভিন্ন চৈতি ও ঋতুরাইনের গান গাওয়া হয়। এইসময় মন্দিরে বিশেষ পূজা হয় এবং সাই নামক একটি সুস্বাদু খাবার যমুনা দেবীকে উৎসর্গ করা হয়। এখানে আরেকটি জনপ্রিয় উৎসব হল ওলজিয়া উৎসব। এটি মূলত কৃষির উৎসব এবং আগস্ট মাসে ক্ষেত যখন ফসলে ভরে ওঠে তখন এই ওলজিয়া উৎসব পালিত হয়ে থাকে। ওলজিয়া মূলত ফসলের সমৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতারই উদযাপন। একে আবার ঘি সংক্রান্তিও বলা হয়ে থাকে। এই সময় এখানকার মানুষ ঘি দিয়ে ডাল, চাপাতি ইত্যাদি খায় এবং কপালে ঘি-এর তিলক পড়ে। আগেকার দিনে এই উৎসবে মামা এবং শ্বশুরকে উপহার দেওয়ার একটি প্রথা প্রচলিত ছিল, অবশ্য আজ আর এই প্রথা নেই। দীপাবলিও এই মন্দিরে জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। এই সময় অজস্র প্রদীপ দিয়ে মন্দির সাজানো হয় এবং বিশেষ পূজারও আয়োজন করা হয়। যমদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটার দিন প্রায় পাঁচ-ছয় মাসের জন্য এই মন্দির বন্ধ হয়ে যায়। বিগ্রহকে তখন পালকি করে খরসালি গ্রামে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়। আবার এপ্রিল-মে মাসে অক্ষয় তৃতীয়া উৎসবের মাধ্যমে মন্দির আবার ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এছাড়াও এই মন্দিরের সঙ্গে যেহেতু বৈষ্ণবদেরও একটা আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে, তাই বেশ বড় করে জন্মাষ্টমীও পালিত হয় এখানে। এসময় মন্দিয়ে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তেরা উত্তরাখণ্ডে এসে ভিড় করেন এবং এই যমুনোত্রী মন্দির থেকেই তাঁদের ছোট চারধাম যাত্রার সূচনা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading