সববাংলায়

১৫ আগস্ট ।। ভারতের স্বাধীনতা দিবস

বিভাগঃ , ,

প্রতিবছর প্রতিমাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে কিছু দিবস পালিত হয়। নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরী করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতে পালনীয় সেই সমস্ত দিবসগুলি মধ্যে একটি হল ‘স্বাধীনতা দিবস’ (Independence Day)। 

প্রতি বছর ভারতে  ১৫ আগস্ট দিনটি ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৪৭ সালের এই দিনটিতে ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনতা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাই ১৯৪৭ সাল থেকে প্রত্যেক বছর এই দিনটিতে সমগ্র ভারতে জাতীয় স্তরে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। 

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ আইনসভায় ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭’ পাশ করা হয়। এই আইন অনুযায়ী ভারতীয় সংবিধান সভাকে প্রথমে শুধুমাত্র আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করা হয়। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ভারতকে ব্রিটেনের রাজা চতুর্থ জর্জের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। ১৯৫০ সালে সংবিধান কার্যকরী হলে ভারতকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সার্বভৌমত্ব প্রদান করা হয়। যদিও এর পরেও ভারত ব্রিটিশ কমনওয়েলথ-এর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবেই থেকে যায়।  

দীর্ঘ সময়ের ব্যাপক স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। এই স্বাধীনতা সংগ্রাম মূলত দুটি অভিমুখে পরিচালিত হয়েছিল – অহিংস সত্যাগ্রহ এবং সশস্ত্র আন্দোলন। অহিংস ধারার প্রতিবাদের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। অন্যদিকে সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনগুলি। ভারতের এই সুদীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে কয়েকটি আন্দোলন ও বিদ্রোহ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। ১৭৫৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পত্তনের পর জাতীয় স্তরে প্রথম ব্যাপক প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৮৫৭ সালে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বা ”মহাবিদ্রোহ’-এর মধ্য দিয়ে। ওই বছরই ১০ মে মিরাটের সেনাছাউনিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্তর্ভুক্ত ভারতীয় সৈন্যরা এই বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই বিদ্রোহে বিশিষ্ট ভুমিকা গ্রহণ করেছিলেন মঙ্গল পাণ্ডে, রানী লক্ষীবাঈ, নানা সাহেব, বেগম হজরত মহল, রাজা প্রতাপ সিং, তাতিয়া টোপী, দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ, মৌলভি লিয়াকত আলি প্রমুখ এবং আরও অনেকে। ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহ নির্দয়ভাবে দমন করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছিল।   বিংশ শতকের শুরুর দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ গতি আসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হাত ধরে। এই সময়ে ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটে মহাত্মা গান্ধীর। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ব্যাপকভাবে অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। ভারতে মহাত্মা গান্ধীর হাত ধরে সত্যাগ্রহ ধারার আন্দোলনের প্রথম সূচনা হয় ১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারনে। যদিও এর আগে মহাত্মা গান্ধী ১৯১৪ সালে গুজরাটের বিনাগ্রামে তৃতীয় শ্রেণীর রেলওয়ে যাত্রীদের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ের বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অহিংস আন্দোলন ছিল রাওলাট সত্যাগ্রহ (১৯১৯), অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০), লবণ সত্যাগ্রহ (১৯৩১), আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩১), ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২) ইত্যাদি। এই সকল সত্যাগ্রহ আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনের সশস্ত্র আন্দোলনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছিল। সশস্ত্র আন্দোলনের মধ্যে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৯৩০), কাকোরি ষড়যন্ত্র (১৯২৫), আজাদ হিন্দ ফৌজের আক্রমন বিশেষভাবে উল্লেখ্য। স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের লাগাতার আক্রমণ ব্রিটিশরাজকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। সর্বোপরি ১৯৪৬ সালে ‘নৌ বিদ্রোহ’ সংঘটিত হলে ব্রিটিশরাজ উপলব্ধি করে যে এই দেশে রাজত্ব চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে সমগ্র বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উপনিবেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঝড় ওঠে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।   সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ধর্মীয় ভেদাভেদমূলক পরিস্থিতির কারনে ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান – এই দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু দিল্লীর লালকেল্লার লাহোরি গেটে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এই অনুষ্ঠানটি ওই সময় ভারতের জাতীয় সম্প্রচারক ‘দূরদর্শন’ সম্প্রচার করে। ভারতের জাতীয় পতাকার নকশা তৈরি করেছিলেন পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া।  

প্রত্যেক বছর ১৫ আগস্ট সমগ্র দেশে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। এই দিনটিতে প্রধানমন্ত্রী পতাকা উত্তোলন করেন ও জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দেন। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পতাকা উত্তোলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। এই দিনটি একটি জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ‘ন্যাশনাল হলিডে অ্যাক্ট, ১৯৮১’ অনুযায়ী এই দিনটিতে দেশের সরকারি ও বেসরকারি সমস্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মবিরতি থাকে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading