খেলা

ব্যাডমিন্টন খেলা

ব্যাডমিন্টন খেলা

একটি অন্যতম জনপ্রিয় ইনডোর গেমস হল ব্যাডমিন্টন খেলা (Badminton Games)। মূলত দুজন বা চারজন খেলোয়াড়ের মধ্যে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। একটি র‍্যাকেট আর একটি শাট্‌ল কক দিয়েই খেলতে হয় ব্যাডমিন্টন। সাধারণত এটি আউটডোর গেম হিসেবে খেলা হলেও আদপে আনুষ্ঠানিক ব্যাডমিন্টন খেলাগুলি ইনডোর কোর্টে আয়োজিত হয়। চিন ও ব্রিটেনে এই খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ডেনমার্ক, ভারত, বাংলাদেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশেও ব্যাডমিন্টন অন্যতম জনপ্রিয় খেলাগুলির মধ্যে পড়ে।

ঐতিহাসিকেরা মনে করেন প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় এই ব্যাডমিন্টন খেলার সূত্রপাত ঘটেছিল। ব্যাবিলনের পুরোহিতরা একটি ছোট বৈঠা দিয়ে একটি তুলোর বলকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। যে পুরোহিত যতক্ষণ সেই তুলোর বলটিকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখতে পারতেন, তার আয়ু নির্ণীত হত তত বেশি। ফলে ব্যাডমিন্টনের মতোই এই রীতি সেকালে ছিল আয়ু বা ভবিষ্যৎ জানার মাধ্যম। ক্রমে গ্রিস, মিশর, ভারত প্রভৃতি দেশেও এই খেলাটি ছড়িয়ে পড়ে। জাপানে একইরকম একটি খেলা প্রচলিত ছিল মধ্যযুগে যার নাম ‘হানেটসুকি’ (Hanetsuki)। জাপানে নববর্ষের উদ্‌যাপন উপলক্ষ্যে একটি কাঠের তক্তা আর একটি শাটল্‌কক দিয়ে হানেটসুকি খেলা হত। কাঠের তক্তাটিকে সেকালে জাপানি ভাষায় বলা হত ‘হাগোইটা’ (Hagoita) আর শাটল্‌ককটির নাম ছিল ‘ও হেন’ (O’ Hen)। কিন্তু আধুনিক ব্যাডমিন্টনের মত এই খেলায় কিন্তু কোনও জাল ব্যবহার করা হত না। উনিশ শতকে ইউরোপে ‘ব্যাটলডোর অ্যান্ড শাটল্‌ কক’ (Battledoor and Shuttlecock) নামে একটি খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। একটি কাঠের প্যাডল এই খেলায় ব্যবহৃত হত যাকে ব্যাটলডোর বলা হত। শাটলের মধ্যে মোরগের পালক ব্যবহার করা হত বলেই সম্ভবত সেই সময় থেকে এর নাম হয় শাটল্ কক। অনেকেই মনে করেন এই ব্যাটলডোরই বর্তমানে র‍্যাকেটের রূপ নিয়েছে। তবে ব্যাডমিন্টন নামটি কোথা থেকে এবং কবে এল, তার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে অনুমান করা হয় গ্লুচেস্টারশায়ারে অবস্থিত ডিউক অফ বিউফোর্টের ব্যাডমিন্টন হাউস থেকেই এই নামটি এসেছে। কিন্তু এই মতবাদ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ১৮৬০ সাল নাগাদ লন্ডনের এক খেলনা ব্যবসায়ী আইজ্যাক স্প্রাট ‘ব্যাডমিন্টন ব্যাটলডোর – এ নিউ গেম’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়। আবার ১৮৬৩ সালে কর্নহিল পত্রিকার পাতায় ব্যাটলডোর ও শাটলকক খেলার বর্ণনাকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয় যেখানে একেই ব্যাডমিন্টন বলে চিহ্নিত করা হয় প্রথম। তবে আধুনিক ব্যাডমিন্টন খেলার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে ব্রিটিশ ভারতের সামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতের পুনেতে এই ব্যাডমিন্টন খেলা খুবই জনপ্রিয় ছিল। ১৮৭০-এর দশকে ভারতের তাঞ্জাভুরে এই খেলা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় খেলায় শাটলককের বদলে ব্যবহৃত হত পশমের বল। পুনের গ্যারিসন শহরে এই খেলাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং শহরের নামানুসারে সেই খেলার নাম হয়ে যায় ‘পুনাহ্‌’। ১৮৭৩ সালে এই খেলার নিয়মাবলী নির্মিত হয়। প্রথমে দুই জন খেলোয়াড়ের মধ্যেই এই খেলাটি হত, কিন্তু পরে পুনেতেই চারজন খেলোয়াড়ের মধ্যে ব্যাডমিন্টন খেলার নিয়মাবলী তৈরি হয়। পুনেতে যে রবার উৎপন্ন হত, তা দিয়েই শাটল্‌ কক বানানোও শুরু হয়ে যায় সেই সময়। ভারতের এই খেলার ধারণাটি নিয়েই ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের দেশে অর্থাৎ ব্রিটেনে প্রসারিত করেন। ব্রিটেনের ফোকস্টোন শহরে একটি বাড়িতে প্রথম একটি ব্যাডমিন্টন ক্লাব তৈরি করেন ব্রিটিশরা এবং সেখানে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত পুনের নিয়মানুসারেই ব্যাডমিন্টন খেলা হত। তবে ১৮৮৭ সালে বাথ ব্যাডমিন্টন ক্লাব এই নিয়মের আধুনিকীকরণ করে। ১৮৯৩ সালে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ শহরে ডানবার নামের একটি বাড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাডমিন্টন খেলা সংক্রান্ত সমস্ত নিয়মাবলী প্রকাশ করে ‘ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন অফ ইংল্যান্ড’। এই অ্যাসোসিয়েশনই বিশ্বে প্রথম ‘অল ইংল্যান্ড ওপেন ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ’ শুরু করে। ক্রমে ক্রমে আন্তর্জাতিক স্তরেও এই ব্যাডমিন্টন খেলা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। একক ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ১৯৩৪ সালে গড়ে ওঠে ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন’ (International Badminton Federation)। প্রাথমিকপর্বে কানাডা, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ইত্যাদি দেশগুলি এই সংস্থার সদস্য হয়। ২০০৬ সাল থেকে এই সংস্থাটি ‘ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন’ নামে পরিচিত হয়।

এই খেলার মূল লক্ষ্যই হল র‍্যাকেটের সাহায্যে শাটল্‌ কককে আঘাত করে অপরপক্ষের কোর্টে ফেলা। যদি সেক্ষেত্রে বিপক্ষীয় খেলোয়াড় পুনরায় সেই শাটল্‌ কক ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন, সেক্ষেত্রে একটি র‍্যালি (Rally) চলে। যদি কোনও সময় বিপক্ষীয় খেলোয়াড় শাটল্‌ ককটি আর ফেরাতে না পারেন বা তার কোর্টেই মাটি স্পর্শ করে শাটল্‌ ককটি, তবে উক্ত খেলোয়াড় এক পয়েন্ট অর্জন করেন। একটি সেটে জেতার জন্য ২১ পয়েন্টের প্রয়োজন হয় এই খেলায়। বেশিরভাগ ম্যাচেই মোট ৩টি সেট থাকে। সাধারণত দুভাবে ব্যাডমিন্টন খেলা হয় – প্রথমত একক (singles) এবং দ্বিতীয়ত দ্বৈত (Doubles)। শাটল ককটির রবারের মাথাতে আঘাত করে ককটিকে বিপক্ষের কোর্টে পাঠাতে হয়। ব্যাডমিন্টনের কোর্টেরও একটি নির্দিষ্ট পরিমাপ রয়েছে। এই কোর্টের দৈর্ঘ্য হয় ১৩.৪ মিটার এবং প্রস্থ হয় ৬.১ মিটার। কোর্টের একেবারে মাঝ বরাবর একটি জাল টাঙানো থাকে যার দৈর্ঘ্য ১.৫৫ মিটার। কোর্টের প্রত্যেক পাশে দুটি ট্রাম লাইন (Tram Line) রয়েছে। ভিতরের দাগগুলি একক খেলার জন্য এবং বাইরের দাগগুলি দ্বৈত খেলার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দুভাবে পয়েন্ট অর্জন করতে পারেন খেলোয়াড়। প্রথম বিপক্ষের খেলোয়াড় শাটল্‌ ককে আঘাত করার আগেই যদি সেটিকে কোনও খেলোয়াড় অপর পারের কোর্টের মাটি স্পর্শ করাতে সক্ষম হন, তবে উক্ত খেলোয়াড় ১ পয়েন্ট পান। আবার বিপক্ষের খেলোয়াড়ের আঘাত করা শাটল্‌ কক যদি জালে আটকে যায়, কিংবা কোর্টের সীমানার বাইরে চলে যায় তাহলেও ১ পয়েন্ট পাওয়া যায়। প্রত্যেক সেটে ২০ পয়েন্ট অর্জন করতে হয় ঐ সেট জেতার জন্য। যে খেলোয়াড় অন্তত দুটি সেটে জয়লাভ করেন তিনিই বিজয়ী হিসেবে ঘোষিত হন। ব্যাডমিন্টন দুজন খেলোয়াড়ের মধ্যেও হতে পারে, আবার চারজন খেলোয়াড়ের মধ্যেও হতে পারে। জালের তির্যকভাবে খেলোয়াড়কে ‘সার্ভ’ করতে হয় এবং সার্ভের সময় খেয়াল রাখতে হয় যাতে ‘সার্ভিং’-এর সময় শাটল ককটি যাতে খেলোয়াড়ের কোমরের নীচের অবস্থানে থাকে। কোন খেলোয়াড় প্রথমে সার্ভ করবে এবং কোর্টের কোন দিক থেকে শুরু করবে তা নির্ধারিত হয় টসের মাধ্যমে। শাটল্‌ ককে প্রথমবার আঘাতের পর কোর্টের মধ্যে সর্বত্রই খেলোয়াড়েরা চলাফেরা করতে পারেন। যদি কোনও সময় কোনও খেলোয়াড়ের শরীরের কোনও অংশ জালে স্পর্শ করে, তবে তার জন্য বিপক্ষীয় খেলোয়াড় ১ পয়েন্ট পায়। আবার একইসঙ্গে দুবার যদি শাটল্‌ ককে আঘাত করা হয়, তবে তাও ‘দোষ’ (Fault) হিসেবে বিবেচিত হয়। সমগ্র খেলার মধ্যে দুবার বিরতি হয়, প্রথম সেটের পরে ৯০ সেকেন্ডের একটি বিরতি-পর্ব এবং ২য় সেটের পরে ৫ সেকেন্ডের একটি বিরতি পর্ব। সমগ্র ম্যাচটি পরিচালনা করেন একজন আম্পায়ার এবং তিনি ছাড়াও দুজন লাইনম্যান থাকেন দুটি কোর্টের পাশে।

‘ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া’ সমগ্র ভারতে এই ব্যাডমিন্টন খেলাগুলি পরিচালনা করে থাকে। ভারতের কয়েকজন বিখ্যাত ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হলেন পি ভি সিন্ধু, লক্ষ্ম্যা সেন, চিরাগ শেট্টি, প্রকাশ পাড়ুকোন, সাইনা নেহওয়াল প্রমুখ। ভারতীয় ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বের ১ নং স্থান প্রথম অর্জন করেন প্রকাশ পাড়ুকোন। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাইনা নেহওয়াল ভারতের প্রথম মহিলা ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বের ১ নং স্থান অধিকার করেন। অলিম্পিকে তিনিই প্রথম ব্যাডমিন্টনে পদক অর্জন করতে সক্ষম হন। ২০১৯ সালে পি ভি সিন্ধু প্রথম ভারতীয় হিসেবে ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হন। তিনিও অলিম্পিকে পরপর দুবার পদক জয় করেন। অলিম্পিকে ভারতীয় ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়েরা ১টি রৌপ্য পদক এবং ২টি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছে, একইভাবে এশিয়ান গেমসে ভারতের সংগ্রহে ছিল ১টি রৌপ্য পদক এবং ৯টি ব্রোঞ্জ পদক। কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের নৈপুণ্য ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মোট ৭টি স্বর্ণপদক, ৭টি রৌপ্য পদক এবং ১১টি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছিল ভারত এই প্রতিযোগিতায়।  


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়