সববাংলায়

দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ

বিভাগঃ ,

মহাভারতের শল্যপর্বের একেবারে শেষের দিকে ভীমদুর্যোধনের গদাযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে ভীমের দ্বারা দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ -এর কথা বর্ণিত আছে। দ্যূতসভায় কপট পাশাখেলার মাধ্যমে দ্রৌপদীকে জিতে নেওয়ার পর দুর্যোধন ভরা রাজসভায় তাঁকে নিজের অনাবৃত ঊরু দেখিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছিলেন। দ্রৌপদীর এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভীম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি গদা দিয়ে দুর্যোধনের দুই ঊরুভঙ্গ করবেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করে ভীমের এই প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হয়েছিল।

সহদেবের হাতে গান্ধাররাজ শকুনি ও তাঁর ছেলে উলুকের মৃত্যুর পর কৌরবদের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে লাগল। কৌরবপক্ষে কেবল দুর্যোধন, কৃপ, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা ছাড়া এগারো অক্ষৌহিণী সৈন্যের সমস্তই ধ্বংস হয়ে গেল। তখন দুর্যোধন প্রাণের ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে কুরুক্ষেত্রের কাছেই দ্বৈপায়ন নামে একটি হ্রদের জলের তলায় লুকিয়ে রইলেন। দুর্যোধনকে দেখতে না পেয়ে অশ্বত্থামা, কৃপ ও কৃতবর্মা তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে সঞ্জয়ের কাছে জানতে পারলেন যে দুর্যোধন হ্রদের নিচে লুকিয়ে আছেন। তখন তাঁরা সেখানে গিয়ে দুর্যোধনকে ডেকে বললেন, “মহারাজ! জল থেকে উঠে আসুন। আমরা তিনজনেই আজ আপনাকে সঙ্গে নিয়ে পান্ডবদের সাথে যুদ্ধ করব। আজ নিশ্চয়ই তারা পরাজিত হবে।”

পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে দুর্যোধন অনেক কষ্টে জলের নিচ থেকে মাথা তুলে উত্তর দিলেন, “আপনাদের জীবিত দেখতে পেয়ে আমি খুশি হলাম। কিন্তু আজ আমি আহত ও খুবই ক্লান্ত। আর পান্ডবদের অনেক সৈন্য এখনো বেঁচে আছে। আজ আর আমি যুদ্ধ করতে পারব না। আজ রাতে আমি এখানে বিশ্রাম নিই, কাল সকালে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে আমি আবার যুদ্ধ করব।” অশ্বত্থামা বললেন, “মহারাজ! আপনি উঠে আসুন। আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে আজ রাত্রি শেষ হওয়ার আগেই আপনার সব শত্রুদের আমি হত্যা করব।”

তাঁরা যখন এইসব কথাবার্তা বলছিলেন তখন একদল ব্যাধ সেই হ্রদের ধারে বসে বিশ্রাম করছিল। অশ্বত্থামারা তাদের দেখতে পাননি, কিন্তু ব্যাধের দল তাঁদের সবাইকেই দেখতে পেল এবং তাঁরা যা যা বলছিলেন সে সবই শুনতে পেল। কাজেই দুর্যোধন যে পান্ডবদের হাত থেকে বাঁচার জন্য দ্বৈপায়ন হ্রদের নিচে লুকিয়ে আছেন, একথা তারা ভালো করেই বুঝতে পারল। তখন তারা তাড়াতাড়ি করে গিয়ে পান্ডবদের কাছে গিয়ে দুর্যোধনের খবর দিল। পান্ডবদের পক্ষে তখনো দুই হাজার রথী, সাতশো গজারোহী, পাঁচ হাজার অশ্বারোহী ও দশ হাজার পদাতিক সৈন্য অবশিষ্ট ছিল। ব্যাধের দলের মুখে সব শুনে পান্ডবরা খুব খুশি হলেন এবং তাদের অনেক পুরস্কার দিয়ে তখনই সবাই মিলে তাঁরা দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে এসে উপস্থিত হলেন। দূর থেকে পান্ডবদের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েই কৃপ, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা সেখান থেকে পালিয়ে যান। হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে পান্ডবরা ভাবতে লাগলেন যে, কীভাবে দুর্যোধনকে হ্রদের জল থেকে বের করে আনা যায়।

দুর্যোধনকে গালি দিলে তিনি নিশ্চয়ই জল থেকে বেরিয়ে এসে পান্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন এই ভেবে যুধিষ্ঠির খুব কর্কশভাবে দুর্যোধনকে ডেকে বললেন, “দুর্যোধন! তুমি নিজের বন্ধুদের বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য কাপুরুষের মতো পালিয়ে এলে? এ কাজ মোটেই ভালো হয় নাই। যদি সাহস থাকে, তো এসো আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো।” এ কথার উত্তরে দুর্যোধন জলের তলা থেকেই শান্তভাবে বললেন, “আমি প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালাইনি। আমি খুব ক্লান্ত, তাই বিশ্রাম করছিলাম। তোমরাও যাও, বিশ্রাম করো। কাল ভোর হলে আমি তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব।” যুধিষ্ঠির বললেন, “আমাদের বিশ্রাম করা হয়ে গেছে। এখন হয় আমাদের যুদ্ধে হারিয়ে রাজ্য ভোগ করো, নয়তো আমাদের হাতে প্রাণ ত্যাগ করে স্বর্গে যাও।”

তাঁর কথা শুনে দুর্যোধন বললেন, “যুধিষ্ঠির! আমি যদি চাই, এখনো তোমাদের সবাইকে হারাতে পারি। কিন্তু আমার সব প্রিয়জনই এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে, আর কার জন্য আমি যুদ্ধ করব? আমি তোমাদের এমনিই রাজ্য ছেড়ে দিচ্ছি। তোমরা নিজের রাজ্যে সুখে বাস করো, আমি হরিণের ছাল পরে বনে চলে যাচ্ছি।” যুধিষ্ঠির হেসে উঠে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, “এখন আর এসব বলে কী হবে! তুমি আমাদের রাজ্য দান করার কে? তুমি উঠে এসো, আমরা তোমাকে বধ করে রাজ্য ছিনিয়ে নেব।” এমন কঠিন কথা শুনে দুর্যোধন আর শান্ত থাকতে পারলেন না। তিনি জলের তলা থেকে উঠে এসে পান্ডবদের বললেন, “আমি এখনই তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার কোনো অস্ত্র নেই, বর্ম নেই, রথও নেই। তোমাদের কাছে তো সবই আছে। তাহলে তোমরা যদি এখন একসঙ্গে আমাকে আক্রমণ করো তবে তা ধর্মযুদ্ধ হবে না।”

এই কথা শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, “আমাদের অস্ত্রভান্ডার থেকে তুমি যেমন ইচ্ছা অস্ত্র বেছে নাও। বর্ম পর, চুল বেঁধে নাও, তোমার যা যা প্রস্তুতি নেওয়ার তুমি নিয়ে নাও। তারপর আমাদের পাঁচজনের মধ্যে যে কোনো একজনের সঙ্গে যুদ্ধ করো। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, সেই একজনকে হারাতে পারলেই সমস্ত রাজ্য তোমার হবে।” দুর্যোধন তখন বর্ম পরলেন ও মাথায় পাগড়ি বাঁধলেন। তারপর একটি বিশালাকায় গদা তুলে নিয়ে বললেন, “আমি এই গদা নিয়ে যুদ্ধ করব। তোমাদের পাঁচজনের মধ্যে যে কেউ আমার সাথে যুদ্ধ করতে পারো। ন্যায়মতে গদাযুদ্ধ করলে দেবতারাও আমাকে সহজে হারাতে পারবেন না।”

এইসব ঘটনা দেখে কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “মহারাজ! আপনি কী মনে করে দুর্যোধনকে যার সঙ্গে ইচ্ছা যুদ্ধ করতে বললেন? সে যদি গদা নিয়ে আপনাকে, অর্জুনকে বা নকুল-সহদেবকে আক্রমণ করে বসে তাহলে কী হবে আপনি একবারও ভেবে দেখেছেন? গদাযুদ্ধে ভীমের শক্তি বেশি, আর দুর্যোধনের শিক্ষা বেশি—আর শিক্ষাতেই হারজিত হয়। আমার এখন মনে হচ্ছে পান্ডবদের ভাগ্যে রাজ্য ভোগ করা লেখা নেই। বিধাতা তাঁদের বনে থাকার জন্যই সৃষ্টি করেছেন।” তখন ভীম নিজের গদা তুলে নিয়ে সিংহনাদ করতে করতে দুর্যোধনকে বললেন, “দুরাত্মা! আমরা সব পাপীদের হত্যা করেছি। একমাত্র তুমিই বাকি আছো। আজ এই গদার আঘাতে তোমাকেও হত্যা করে আমাদের অপমানের প্রতিশোধ নেব।” দুর্যোধনও তার উত্তরে ভীমকে অনেক গালি দিলেন। এইসময় ভীম ও দুর্যোধনের গদাযুদ্ধের গুরু বলরাম সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে দুজনেই খুব খুশি হলেন।

তারপর কৃষ্ণের পরামর্শে সবাই মিলে দ্বৈপায়নের তীর ছেড়ে কুরুক্ষেত্রে চলে এলেন। সেখানে এসে ভীম ও দুর্যোধনের মধ্যে গদাযুদ্ধ শুরু হল। দুজনে পাগলা হাতির মতো গর্জন করতে করতে দুজনকে আক্রমণ করলেন। দুটি গদার সংঘর্ষের ভীষণ শব্দে চারিদিক কেঁপে উঠল। ধাতব গদা দুটি থেকে আগুন ছিটকে বেরোতে লাগল। মন্ডল, গতি, প্রত্যাগতি, অস্ত্র, যন্ত্র, পরিমোক্ষ, প্রহার, রঞ্জন, পরিবারণ, অভিদ্রাবণ, আক্ষেপ, বিগ্রহ, পরাবর্তন, সংবর্তন, অবলুপ্ত, উপলুপ্ত, উপন্যস্ত প্রভৃতি যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল একে অন্যের উপরে দেখতে লাগলেন। কিন্তু এ সব কৌশলে দুর্যোধনেরই বেশি অধিকার ও ক্ষমতা দেখা যেতে লাগল। তিনি একবার ভীমের বুকে এমন গদার আঘাত করলেন যে কিছুক্ষণ পর্যন্ত ভীমের আর নড়াচড়ার শক্তি রইল না। অবশ্য একটু পরেই ভীমও গদার এক ঘায়ে দুর্যোধনকে অজ্ঞান করে দিলেন। জ্ঞান ফেরার পর দুর্যোধন ভীমের কপালে সজোরে আঘাত করলেন। সেই আঘাতে ভীমের কপাল থেকে রক্ত পড়তে থাকল। সেই সাংঘাতিক আঘাতও ভীম সহ্য করে নিলেন। তারপরেই দেখা গেল ভীমের আঘাতে দুর্যোধন ঘুরতে ঘুরতে মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দুর্যোধনের আঘাতে ভীমেরও সেই অবস্থা হল। তারপর দুর্যোধন গর্জন করতে করতে ভীমকে এমন আঘাত করলেন যে ভীমের কবচ ছিঁড়ে গেল।

এতক্ষণে শ্রীকৃষ্ণ খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন যে সমস্ত নিয়ম মেনে যুদ্ধ করলে ভীম কখনোই দুর্যোধনকে হারাতে পারবেন না। সুতরাং অন্যায় যুদ্ধেই তাঁকে বধ করতে হবে। তিনি অর্জুনকে ইঙ্গিত করে সেই কথাই বললেন। অর্জুন কৃষ্ণের মনের কথা বুঝতে পেরে ইশারা করে ভীমকে নিজের ঊরু দেখালেন। ভীম তা দেখে বুঝলেন যে গদা দিয়ে আঘাত করে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করতেই হবে, তবেই পান্ডবদের জয় হবে। যদিও গদাযুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষের নাভির নিচে আঘাত করা নিষিদ্ধ, কিন্তু রাজ্যের স্বার্থে এইটুকু অন্যায় করতে ভীম প্রস্তুত হলেন।

ভীম ও দুর্যোধন অনেকক্ষণ যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁরা কিছু সময় বিশ্রাম করে আবার যুদ্ধের জন্য তৈরি হলেন। তখন ভীম ইচ্ছা করেই দুর্যোধনকে আঘাতের সুযোগ দিলেন। দুর্যোধন ছুটে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভীম প্রবল জোরে তাঁকে আঘাত করলেন। কিন্তু দুর্যোধন সেই আঘাত এড়িয়ে গিয়ে পাল্টা আঘাত হানলেন। আশ্চর্য কৌশলে ভীমও সে আঘাত এড়িয়ে গিয়ে দুর্যোধনকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন। তখন ভীমকে এড়াবার জন্য দুর্যোধন লাফ দিয়ে শূন্যে উঠতেই ভীম ভীষণ আঘাতে দুর্যোধনের দুই ঊরুভঙ্গ করলে অসহায়ভাবে দুর্যোধন মাটিতে পড়ে গেলেন। ভীম তখন তাঁর মাথায় লাথি মেরে বললেন, “দুরাত্মা! আমাদের ও দ্রৌপদীর সকল অপমানের এই প্রতিশোধ।” বলতে বলতে ভীম আবার দুর্যোধনের মাথায় লাথি মারলেন।
ভীমের এই কাজ দেখে যুধিষ্ঠির খুব দুঃখিত হয়ে বললেন, “ভীম! তুমি তো তোমার প্রতিজ্ঞা রেখেছ, তাহলে আহতকে আঘাত করে কেন পাপ বাড়াচ্ছ? সৎ হোক বা অসৎ, এ আমাদের ভাই। একে আর আঘাত কোরো না। এর অবস্থা দেখলে এখন দুঃখ হয়।” এই বলে যুধিষ্ঠির চোখের জল ফেলতে লাগলেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘মহাভারত’,কালীপ্রসন্ন সিংহ ,শল্যপর্ব, অধ্যায় ৩১-৩৫, পৃষ্ঠা ৬৩-৭৪, অধ্যায় ৫৬-৬০, পৃষ্ঠা ১১১-১২০
  2. ‘ছেলেদের মহাভারত’, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় মুদ্রণ, শল্যপর্ব, পৃষ্ঠা ১৮১-১৮৫

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading