গুজরাটের গোমতী নদী ও আরব সাগরের তীরে দ্বারকা শহর অবস্থিত। হিন্দুদের শাস্ত্র অনুসারে দ্বারকা হল শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী এবং হিন্দুদের পবিত্র চারধামের একটি ধাম। অন্য তিনটি ধাম হল বদ্রীনাথ, জগন্নাথধাম ও রামেশ্বরম। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী শ্রীবিষ্ণু রামেশ্বরমে স্নান করে বদ্রীনাথে ধ্যান করেন, তারপর পুরীর জগন্নাথধামে খাবার খেয়ে দ্বারকায় বিশ্রাম করেন। দ্বারকার রাজা শ্রীকৃষ্ণের অপর নাম দ্বারকাধীশ। আনুমানিক ২৫০০ বছর আগে কৃষ্ণের প্রপৌত্র বজ্রনাভ কৃষ্ণের সম্মানে দ্বারকাধীশ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্যে নির্মিত দ্বারকাধীশ মন্দিরে কৃষ্ণ দ্বারকাধীশ অর্থাৎ দ্বারকার রাজা হিসেবে পূজিত হন। দ্বারকায় ধাম বলতে মূলত এই মন্দিরটিকেই বোঝায়। এই মন্দির জগৎ মন্দির নামেও খ্যাত।
দ্বারকা সম্পর্কে বেশ কিছু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। কিংবদন্তি অনুসারে কৃষ্ণের প্রপৌত্র বজ্রনাভ এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। হিন্দু ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক আদি শঙ্কর এই মন্দিরটি পরিদর্শনে এসেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। কিংবদন্তি অনুসারে কৃষ্ণ সাগরপাড়ে অবস্থিত বিস্তৃত একটি জমিকে সমুদ্রের গ্রাস থেকে উদ্ধার করে দ্বারকা শহর তৈরি করেছিলেন। মন্দিরের কাঠামোটি নাকি হরিগৃহ নামক কৃষ্ণের বাসভবনের উপরে নির্মিত হয়েছিল। এমন কথাও প্রচলিত আছে যে, বজ্রনাভের নির্দেশে মহাশক্তির সাহায্যে মন্দিরটি নাকি রাতারাতি নির্মাণ করা হয়েছিল। মহাভারতের কাহিনী অনুসারে, ঋষি দুর্বাসা একবার কৃষ্ণ ও তাঁর পত্নী রুক্মিণীর প্রাসাদ দেখবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। ঋষির ইচ্ছে ছিল কৃষ্ণদম্পতি তাঁর রথকে তাঁদের প্রাসাদে টেনে নিয়ে যাবেন। কৃষ্ণ-রুক্মিণী রাজি হয়ে দুর্বাসাকে রথে বসিয়ে তাঁকে বহন করে নিয়ে যেতে শুরু করেন। কিছুদূর যাওয়ার পর রুক্মিণী ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে কৃষ্ণের কাছে জলের অনুরোধ জানান। কৃষ্ণ তখন তাঁর শক্তি দিয়ে সেখানে একটি গর্ত খোঁড়েন এবং গঙ্গা নদীকে এই স্থানে নিয়ে আসেন। দুর্বাসা ক্রুদ্ধ হয়ে রুক্মিণীকে সেই স্থানে থাকার অভিশাপ দেন। দ্বারকায় যে রুক্মিণীর মন্দির দেখা যায়, তার পিছনে এই কাহিনীটি ছিল বলেই বিশ্বাস করা হয়। তবে এই দম্পতির কোন দোষ খুঁজে না পেয়ে, কৃষ্ণকে দুর্বাসা বর দেন যে তাঁর পায়ের তলা ব্যতীত সর্বত্র অজেয় থাকবেন তিনি। একই সাথে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে রুক্মিণী দেবতার স্ত্রীদের মধ্যে অগ্রগণ্যা হবেন এবং কৃষ্ণের চিরন্তন সঙ্গীনী হবেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বারো মিটার উচ্চতায় এই মন্দিরটি অবস্থিত। দ্বারকাধীশ মন্দির পশ্চিমমুখী। এই দ্বারকাধীশ মন্দিরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার্ল্ড ট্যালেন্ট অরগানাইজেশান’ ২০২১ সালে ‘ওয়ার্ল্ড অ্যামেজিং প্লেস’-এর শংসাপত্র প্রদান করেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী এই মন্দির আসলে ২২০০ বছরের পুরনো। খৃষ্টপূর্ব ২০০ শতকে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে কোন কোন সূত্রানুযায়ী মন্দিরটি প্রায় ২৫০০ বছরের পুরনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরটি বেশ কয়েকবার ধ্বংসের কবলে পড়েছে, তারপর আবার তার পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে আনুমানিক ৪১৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ গুপ্ত রাজবংশের শাসনামলে মন্দিরটি একবার পুনর্নির্মিত হয়েছিল। ইতিহাস এও বলে যে একাদশ শতকের দিকে মুসলিম বাহিনী এই মন্দির ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বেশ কয়েকবার এই মন্দিরের ওপর আক্রমণ নেমে এসেছিল। ইতিহাস অনুযায়ী ১৪৭২ সালে সুলতান মাহমুদ বেগাদা এই মন্দির ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। এরপর পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে চালুক্য শৈলীতে মন্দিরটি পুনরায় নির্মিত হয়েছিল এবং সেই কাঠামোটিই আজও বর্তমান রয়েছে।
দ্বারকাধীশ মন্দিরের স্থাপত্য নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ আকর্ষণ। প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন চালুক্য শৈলীতে নির্মিত এই মন্দির চুনাপাথর ও বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত। মোট ৭২টি স্তম্ভের ওপর নির্মিত পাঁচতলা এই মন্দিরটি সত্যিই অসাধারণ। মন্দিরে পৌঁছতে প্রত্যেককে ৫০টিরও বেশি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। মন্দিরের চুড়াতে ৫২ গজ কাপড়ের একটি পতাকা দৃশ্যমান। সেই পতাকায় দেখা যায় সূর্য ও চন্দ্রের ছবি, যা-কিনা কৃষ্ণের রাজত্বের প্রতীক। কিংবদন্তি অনুসারে সেই প্রতীকের অর্থ হল, যতক্ষণ আকাশে চন্দ্র ও সূর্য থাকবে ততক্ষণ মন্দিরের এই পতাকা উড়বে অর্থাৎ কৃষ্ণের এই রাজত্ব অটুট ও অম্লান থাকবে। এই পতাকাটি দিনে পাঁচবার পরিবর্তন করা হয়। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য যে, মন্দিরটিতে দুটি প্রধান চূড়া ছাড়াও আরও কয়েকটি ছোট ছোট চূড়া রয়েছে। ৭৮ মিটার উঁচু মন্দিরের সবচেয়ে লম্বা চূড়াটি ‘নিজ শিখর’ নামে পরিচিত। এই চূড়াতেই পতাকাটি লাগানো থাকে। এই মন্দিরের দুটি প্রবেশপথের দুটি নাম আছে, যথাক্রমে স্বর্গদ্বার এবং মোক্ষদ্বার। উত্তরদিকের প্রবেশদ্বারকে বলা হয় মোক্ষদ্বার এবং দক্ষিণদিকের প্রবেশদ্বারকে বলা হয় স্বর্গদ্বার। এই স্বর্গদ্বার থেকে ৫৬টি সিঁড়ি নেমে গেছে গোমতী নদীর দিকে। তীর্থযাত্রীরা মন্দিরে পুজো দেওয়ার আগে এই গোমতী নদীতে স্নান করে মন্দিরে প্রবেশ করে থাকেন। সেই হিসেবে মোক্ষ দ্বারকে প্রস্থান দ্বার হিসেবে ধরা যায়। সমগ্র মন্দিরের দেওয়ালে, স্তম্ভগুলিতে পাথরের ওপর সূক্ষ্ম খোদাইয়ের কারুকাজ, ফুলের মোটিফ, দেবদেবীর মূর্তি এবং বিভিন্ন রকম নকশা লক্ষ করা যায়। মন্দিরের ভিতরে গর্ভগৃহ ছাড়াও রয়েছে মন্ডপ (মন্দিরের সমাবেশ পরিসর), অর্ধমন্ডপ (সমাবেশ হলের বা মুখ্য মন্ডপের প্রবেশদ্বার), প্রদক্ষিণা পথ (গর্ভগৃহের চারপাশের পথ, মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় ভক্তরা এখানে কর্মে নিয়োজিত থাকে) এবং অন্তরাল (বিমান মন্ডপ থেকে নাট্যমন্ডপকে সংযুক্তকারী ছোট অন্তঃকক্ষ)। কেন্দ্রীয় মন্দিরের আশেপাশে রাধা, জাম্ববতী, সত্যভামা এবং লক্ষ্মীদেবীর মন্দির রয়েছে। মাধব রাওজি এবং ঋষি দুর্বাসার মন্দিরও এখানে লক্ষ করা যায়। মূল মন্দিরের সামনে রাধা-কৃষ্ণ ও দেবকীকে উৎসর্গ করা দুটি পৃথক মন্দিরও রয়েছে।
এই মন্দিরের বিগ্রহ কৃষ্ণ কিন্তু শিশু কৃষ্ণ বা কিশোর গোপালক বালক নন, বরং এখানে কৃষ্ণ রাজা হিসেবে বিরাজমান, যিনি এই মহাবিশ্বকে শাসন করছেন। ভগবান কৃষ্ণের এই মূর্তির নাম ত্রিবিক্রম। গর্ভগৃহে অবস্থিত কৃষ্ণের এই মূর্তি চারহাত-বিশিষ্ট ও কালো পাথরে নির্মিত। সেই চারহাতে যথাক্রমে সুদর্শন চক্র, পাঞ্চজন্য অর্থাৎ কৃষ্ণের শঙ্খ, পদ্মফুল ও গদা দেখতে পাওয়া যায়। বিগ্রহের মাথায় কৌস্তভ, শ্যামন্তক প্রভৃতি মণিকা খচিত মুকুট দেখা যায় এবং বিগ্রহটি সোনালী হলুদ রেশমে সজ্জিত।
দ্বারকাধীশ মন্দিরে উদযাপিত সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হল জন্মাষ্টমী। সেইসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী এসে জড়ো হন এখানে। সারা মন্দির আলো দিয়ে চমৎকারভাবে সাজানো হয়। জন্মাষ্টমীর সময় বিগ্রহ দর্শনের সময় কিছুটা বাড়ানো হয়। সেসময় রাত বারোটারও পরেও ভক্তেরা বিগ্রহ দর্শন করতে পারেন। পঞ্চামৃত অর্থাৎ দুধ, মধু, ঘি, দই এবং চিনি মিশিয়ে বিগ্রহকে অভিষেক স্নান করানো হয় এবং তারপর হলুদ একটি রেশমী বস্ত্রে সজ্জিত করা হয়। এই জন্মাষ্টমীর সময় সোনা, হীরা, পোখরাজ প্রভৃতি রাজকীয় অলঙ্কারে বিগ্রহকে সজ্জিত করা হয়। বিশেষ ভোগও নিবেদন করা হয় । ঢাকঢোল সহকারে ১০৮টি প্রদীপ দিয়ে প্রভুর আরতি করা হয়। ভজনের ধ্বনিতে এসময় মন্দির মুখরিত হয়ে ওঠে। মধ্যরাতে, কৃষ্ণের জন্মের সময়টিতে মন্ত্রজপ করা হয়। পরদিন সকালে দোলনায় শিশু কৃষ্ণের একটি মূর্তিও রাখা হয়। দ্বারকাধীশ মন্দিরে পালিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল, অন্নকূট উৎসব। মূলত কার্তিক মাসের প্রথম দিনে এই উৎসব পালিত হয়ে থাকে। এসময় দেবতাকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়। শত শত মিষ্টির পাশাপাশি নানারকম খাদ্যসামগ্রী এই সময় ভগবানকে উৎসর্গ করা হয়। তুলসী বিবাহ হল এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। কার্তিক মাসের একাদশতম দিনে এই উৎসব হয়। তুলসীর সাথে ভগবান বিষ্ণুর বিবাহ উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানটি পালিত হয়ে থাকে। মোট চারদিন ধরে এই উৎসব চলে এবং মাসের পনেরোতম দিনে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। বৈশাখ মাসে পালিত অক্ষয় তৃতীয়াও এই মন্দিরে উদযাপিত উৎসবগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসময় বিগ্রহকে ফুলের পোশাকে এবং বিশেষ চন্দনের পোশাকে সজ্জিত করা হয়। এই সমস্ত উৎসব ছাড়াও এখানে লাভ পঞ্চমী, মকর সংক্রান্তি, বামন জয়ন্তী, রামনবমী, দোলযাত্রা, রথযাত্রা ইত্যাদি উৎসব ধুমধাম করে পালিত হয়ে থাকে।
দ্বারকা শহরের সঙ্গে যেহেতু কৃষ্ণের সরাসরি যোগাযোগ ছিল, তাই এই মন্দির হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান