ইতিহাস

গুরুদাস ব্যানার্জি

স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি (Gurudas Banerjee) একজন খ্যাতনামা ভারতীয় বাঙালি বিচারপতি ছিলেন যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় উপাচার্যের পদটিও অলংকৃত করেছিলেন।

১৮৪৪ সালে ২৬ জানুয়ারি কলকাতার নারকেলডাঙ্গায় একটি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে গুরুদাস ব্যানার্জির জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম সোনামণি দেবী। গুরুদাস ব্যানার্জির বাবা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘কার  ঠাকুর কোম্পানি’তে (Kar Thakur Company) কাজ করতেন। তিনি ছোট থেকেই গুরুদাসকে গীতা পাঠ করে শোনাতেন। গুরুদাস খুব অল্প বয়সেই তাঁর বাবাকে হারান। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা খুব কষ্ট করে তাঁকে মানুষ করেন।

গুরুদাস ব্যানার্জির প্রাথমিক শিক্ষা জেনারেল অ্যাসেম্বলি স্কুলে শুরু হলেও তিনি সেখানে বেশিদিন পড়েননি। পরবর্তীকালে তিনি ওরিয়েন্টাল সেমিনারি (Oriental Seminary) স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে কিছুদিন পড়ার পর তিনি হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। গুরুদাসের হেয়ার স্কুলে পড়াকালীন তখন সেখানকার প্রধানশিক্ষক ছিলেন প্যারীচরণ সরকার। প্যারীচরণের কাছে পড়তে গুরুদাস খুব পছন্দ করতেন, কারণ তিনি প্রত্যেক ছাত্রকে আলাদাভাবে নজর দিয়ে পড়াতেন। হেয়ার স্কুলে  গুরুদাস ব্যানার্জি প্রতিটি বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করতেন। স্কুল শিক্ষা শেষে তিনি জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন (অধুনা স্কটিশ চার্চ কলেজ) এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে  উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং এখানেও তিনি সব পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। গুরুদাস বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি সংস্কৃত ভাষাও শেখেন। তিনি ১৮৬৪ সালে গণিত নিয়ে স্নাতকোত্তরে প্রথম হন। ১৮৬৬ সালে তিনি বি এল (B.L) পরীক্ষায় পাশ করেন এবং ১৮৬৭ সালে তিনি আইনে ডক্টরেট (Doctorate) করেন। প্রখ্যাত কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বেশকিছুদিন প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা করেন। সেই সময় গুরুদাস ব্যানার্জি তাঁর ছাত্র ছিলেন। তিনি গুরুদাস ব্যানার্জিকে বাংলা থেকে ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন লেখা অনুবাদ করতে সাহায্য করতেন। বি এ (B.A) পড়াকালীন গুরুদাস ব্যানার্জি কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যকে শিক্ষক হিসেবে পান। তিনি তাঁর কাছে বাংলা সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ যখন প্রকাশিত হয় তখন গুরুদাস ব্যানার্জি সেই বইটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন এবং তাঁর সেই পরামর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কমিটি গ্রহণ করে। 

গুরুদাস ব্যানার্জির কর্মজীবন শুরু হয় প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিতের সহকারী লেকচারার (assistant lecturer) হিসেবে। সেই সময় কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁর ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি ১৮৬৬ সালে জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশনে গণিতের অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। তবে তিনি সেখানে মাত্র পাঁচ মাস কাজ করেন।

গুরুদাস ব্যানার্জি এরপর বহরমপুরে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি কিছুদিনের জন্য  মুর্শিদাবাদের নবাবের আইন উপদেষ্টা পদে নিয়োজিত হন। এর পাশাপাশি তিনি বহরমপুর কলেজে আইন এবং গণিতের  অস্থায়ী অধ্যাপক ছিলেন। ১৮৭২ সালে তিনি কলকাতা ফিরে আসেন এবং কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময় তাঁর মক্কেলদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাবের একটি জটিল মামলার সমাধান করে দিলে নবাব কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাঁকে বহুমূল্য উপহার দেন। খুব অল্প দিনের মধ্যেই আইনজ্ঞ হিসেবে গুরুদাসের সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৭৮ সালে তাঁকে টেগোর প্রফেসরশিপ অফ ল (Tagore Professorship of Law) এর জন্য মনোনীত করা হয়। এই বছরেই তাঁকে টেগোর আইন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি হিন্দু বিবাহ আইন ও স্ত্রীধন সম্পর্কে বক্তৃতা দেন।

১৮৮৮ সালে গুরুদাস ব্যানার্জি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন। ষোল বছর তিনি সেই পদে দায়িত্ব সামলেছেন। গুরুতর অসুস্থ না হলে তিনি কখনও অনুপস্থিত থাকতেন না এমনকি তাঁর ছেলে যতীন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জির মৃত্যুর দিনও তিনি আদালতে যান।

১৮৭৯ সালে গুরুদাস কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৮৯০ সালের ১ জানুয়ারি তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি সেই পদে নির্বাচিত হন। উপাচার্য থাকাকালীন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেন। সেই সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে বাংলা পড়ার আগ্রহ তৈরি করেন। লর্ড কার্জন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কার করার জন্য যে কমিশন তৈরি করেছিলেন গুরুদাস ব্যানার্জি তার সদস্য ছিলেন। ১৮৯২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সেই পদের দায়িত্ব সামলান। ১৯০৪ সালের ২২ জুলাই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি প্রদান করেন। তিনি বেশ কিছুদিন গণিত এবং সংস্কৃত বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

গুরুদাস বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজেও অধ্যাপনা করেছেন। ঋষি অরবিন্দ ঘোষ এই কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। গুরুদাস শিক্ষার প্রসার ঘটানোর জন্য স্কুল এবং কলেজের উন্নতির ক্ষেত্রে অনেক অবদান রাখেন। ১৯০৬ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। গুরুদাস মনে করতেন যে সুশিক্ষা দেওয়ার জন্য সুশিক্ষকের খুব প্রয়োজন। তিনি জাতিভেদ প্রথা দূরীকরণের চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে ছিলেন না। তিনি মনে করতেন শিশুদের জোর করে শিক্ষা প্রদান করা যায় না বরং তাদের কোন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারলে এবং মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে পারলে তাদের শিক্ষা সম্পন্ন হয়। তিনি এও মনে করতেন যে শিক্ষার প্রকরণ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি যার কোন ভালোবাসা নেই সে কোনদিনও আদর্শ শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে না। ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই সংযমী ছিলেন। কোন প্রকার বিলাসিতা তিনি বরদাস্ত করতেন না এবং কারও নামে নিন্দা করতেন।

১৯০৪ সালে তিনি বিচারপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯১৮ সালে দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন তিনি আমাশয় রোগে আক্রান্ত হন এবং এরপর দীর্ঘ রোগ যন্ত্রণা তাঁকে ভোগ করতে হয়।  ১৯১৮ সালের ২  ডিসেম্বর ৭৫ বছর বয়সে গুরুদাস ব্যানার্জির মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. বঙ্গগৌরব স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়: শ্রীশরৎকুমার রায় প্রণীত: শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র নাথ রায় বি, এ, ১৯২১, পৃষ্ঠা- ৫, ৭, ৯, ১০, ২০, ২১, ২৩, ৩০, ৩১, ৩৫, ৩৯, ৪১, ৪৩, ৪৫, ৪৬, ৪৮, ৫৬, ৫৯, ৭১, ৭২
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. http://www.sirgurudasmahavidyalaya.com/
  4. https://peoplepill.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন