বাংলা সিনেমায় যে সকল চরিত্রাভিনেতা কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম অভিনেতা হলেন হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় (Haradhan Bandopadhyay)। পার্শ্বচরিত্র হয়েও কীভাবে দর্শকদের নজর কেড়ে নেওয়া যায় তার আদর্শ উদাহরণ তৈরি করে দিয়ে গেছেন হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বেতার নাটকের মধ্যে দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু করে ধীরে ধীরে থিয়েটার ও সিনেমা জগতে পদার্পণ করেছিলেন। বড়পর্দা, থিয়েটার ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন তিনি। সুদীর্ঘ অভিনয় জীবনে সবমিলিয়ে তিনি প্রায় ৬৫ বছর অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি নিজের ক্যারিয়ারে শতাধিক বাংলা সিনেমায় বাংলার বিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। জীবনের শেষের দিকেও তিনি অবলীলায় অভিনয় করতেন। আর নিজের অভিনয় দক্ষতায় মুগ্ধ করেছিলেন সকলকে। শুধু বাংলা সিনেমা নয়, বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বেশ কিছু হিন্দি ছবি অর্থাৎ বলিউডেও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন।

১৯২৬ সালের ৬ নভেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর স্ত্রীর নাম পরিণীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের দুই ছেলের নাম প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়। কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান বাংলা সিনেমা ও টিভি সিরিয়ালের জনপ্রিয় অভিনেতা। এছাড়া অভিনেত্রী লাবনী সরকার হলেন হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ।
হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়ায়। চুয়াডাঙ্গায় ভিক্টোরিয়া জুবিলি হাই ইংলিশ স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি কুষ্টিয়া মিউনিসিপ্যাল স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতায় আসেন এবং কলকাতার সিটি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে তিনি ওই কলেজ থেকেই আইএ পাশ করেছিলেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য তাঁকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছিল। তবে তিনি দমে যাননি, বরাবরই তিনি ছিলেন জেদি ও প্রতিবাদী প্রকৃতির মানুষ। জেল থেকে ফিরেও তিনি বিভিন্ন সময়ে নানা মিটিং, মিছিল, প্রচারে, প্রতিবাদ সভায় যোগ দিতেন।
এক নজরে হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী:
- জন্ম: ৬ নভেম্বর, ১৯২৬
- মৃত্যু: ৫ জানুয়ারি, ২০১৩
- কেন বিখ্যাত: হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সিনেমা ও থিয়েটারের এক কিংবদন্তি অভিনেতা, যিনি প্রায় ৬৫ বছর ধরে অভিনয় করেছেন। তিনি সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনসহ বহু বিখ্যাত পরিচালকের ছবিতে শতাধিক চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। পার্শ্বচরিত্রেও অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা দেখিয়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে এক অনন্য মর্যাদা অর্জন করেছিলেন।
- পুরস্কার: শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার, বঙ্গবিভূষণ সম্মান ইত্যাদি।
আর্থিক অনটনের জন্য হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরি নেন ‘কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল কোম্পানি’তে। ব্রিটিশ আমলে এই কোম্পানিতে কোনও জেল খাটা আসামীকে কাজ দেওয়া হত না। কিন্তু হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের অর্থকষ্টের জন্য নিজের পূর্ব পরিচয় গোপন রেখে ওই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে হারাধনের জেলে বন্দি থাকার কথা জানাজানি হওয়ার পর কোম্পানি থেকে তাঁকে বিতাড়িত করা হয়। এরপর তিনি বাটা কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও ম্যানেজারের অসভ্য আচরণের কারণে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় ছোটখাটো কাজ করে অবশেষে ১৯৪৬ সালে তিনি ‘দি ওরিয়েন্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’-এ চাকরি পান। আর এখানে তিনি দীর্ঘদিন চাকরি করেছিলেন।
হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ছিল নানা বর্ণময়। যাত্রা দলের নাটক দেখে নাটকের প্রতি তাঁর প্রথম আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর ইন্সুরেন্স কোম্পানির চাকরির পাশাপাশি আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য তিনি বেতারে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সঞ্চালনার কাজ শুরু করেন। ভাল কণ্ঠস্বর থাকার দরুণ অল্প দিনেই বেতারে তাঁর জায়গা পাকা হয়ে গিয়েছিল। বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, বিশুদ্ধ উচ্চারণ তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত। এরপর তিনি বেতার নাটকেও অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আসলে হারাধনের রেডিওতে কাজ করার পিছনে অন্য এক কারণ ছিল। তিনি যখন কুষ্টিয়ায় থাকতেন সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঝে মাঝেই সেখানে যেতেন। হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখার সুযোগ পেলেও সেই সুযোগ নষ্ট করেছিলেন। তখন স্বদেশী কাজে মত্ত ছিলেন তিনি। এই জন্য অনুতপ্ত হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় রেডিওর সঞ্চালক হিসাবে বিনা পয়সায় বিভিন্ন শিল্পীর কাছ থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে রবীন্দ্রনাথকে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন।
হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় বেতার নাটকের অভিনয়ের পাশাপাশি উৎপল দত্তের ‘লিটিল থিয়েটার’ দলে যোগ দিয়েছিলেন। এই সময় তিনি ‘সাংবাদিক’ ও ‘ফেরারি ফৌজ’ নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা পান। এরপর তিনি অভিনেতা হিসেবে মিনার্ভা, বিশ্বরূপা, সরকারিনা মতো পেশাদার রঙ্গমঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করা শুরু করেন। তিনি অভিনয় করেছিলেন অহীন্দ্র চৌধুরী (Ahindra Choudhury), ছবি বিশ্বাস (Chhabi Biswas) এবং উৎপল দত্তের মতো বিখ্যাত ও দক্ষ অভিনেতাদের সঙ্গে। অথচ তাঁর অভিনয় দেখে কখনই তাঁকে একজন নবাগত অভিনেতা বলে মনে হত না। মঞ্চে তিনি ‘চরিত্রহীন’, ‘চাঁদ সওদাগর’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘শাজাহান’, ‘দেবদাস’, ‘দুই পুরুষ’ ইত্যাদি জনপ্রিয় নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এরপর ক্রমে তিনি একজন বিখ্যাত মঞ্চ শিল্পী হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
থিয়েটারে পাশাপাশি তিনি বড় পর্দায় কাজ করা শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে পরিচালক অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Atanu Banerjee) ‘দেবদূত’ চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়ে তাঁর বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে। সিনেমাটি বাণিজ্যিক ভাবে সফল না হলেও দক্ষ অভিনেতা হিসেবে তিনি সকলের নজর কেড়েছিলেন। তবে হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয়তা পান ১৯৫১ সালের ‘বরযাত্রী’ সিনেমার মধ্যে দিয়ে। এটি একটি বাংলা কমেডি সিনেমা। এই সিনেমায় হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিলোচন বা তিলুর ভূমিকা অভিনয় করেছিলেন। নানারকম হাসির কাণ্ডকারখানা সম্মিলিত এই সিনেমাটি দারুন জনপ্রিয় হয়েছিল। এরপর একের পর এক ছবিতে ডাক আসতে শুরু করে তবে তিনি থিয়েটারে অভিনয়ও করতে থাকেন।
উৎপল দত্ত পরিচালিত ‘মেঘ’ সিনেমায় হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ রায় একদিকে যেমন তাঁকে খুব স্নেহ করতেন আবার অন্যদিকে হারাধনও তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। ‘মানিকদা’কে তিনি নিজের জীবনের ঈশ্বর বলে মনে করতেন। ১৯৬২ সালে হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন বিজয় বসুর ‘ভগিনী নিবেদিতা’ সিনেমায়। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। তিনি ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ সিনেমা, উৎপল দত্তের ‘ঘুম ভাঙার গান’, মৃণাল সেনের ‘আকাশকুসুম’ সিনেমাতে অভিনয় করে প্রতিভাবান অভিনেতার মর্যাদা পেয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি ‘শতরঞ্জকি খিলাড়ি’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। সেই সময় বিখ্যাত অভিনেতা হয়েও কেবলমাত্র সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধে তিনি এই সিনেমায় এক মিনিটেরও কম দৃশ্যে অভিনয় করতে রাজি হয়েছিলেন। এছাড়া সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ সিনেমাতে তিনি নিজের স্ত্রী পরিণীতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রথমবারের জন্য অভিনয় করার জন্যও রাজি করিয়েছিলেন ।
এছাড়াও হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অমর প্রেম’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘পদিপিসির বর্মী বাক্স’, ‘কলকাতা ৭১’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘শাখা প্রশাখা’, ‘কোরাস’, ‘যদি জানতেম’ প্রভৃতি বিখ্যাত সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। তবে তিনি কখনোই একই রকমের চরিত্রে অভিনয় করেননি। বারবার ভেঙেছেন নিজেকে, তৈরি হয়েছেন নতুন চরিত্রের জন্য আর এই কারণেই পরিচালক ও দর্শকদের ভালবাসার মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আর বোধহয় এই জন্য তাকে বরাবরই মনে হয়েছে সমসাময়িক ও স্বভাবজাত অভিনেতা। নানা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বদলেছেন অভিনয়ের স্বাদ। ‘ননীগোপালের বিয়ে’, ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ মতো সিনেমায় তাঁর কমেডি চরিত্রগুলি আজও বাঙালির মনে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এছাড়া খল চরিত্রেও তিনি নজর কেড়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ছাড়াও তিনি তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, সলিল দত্ত, সলিল সেন, রাজেন তরফদারের মত বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে কাজ করেছিলেন।
২০০৫ সালে তিনি শেখর দাসের (Shekhar Das) ‘ক্রান্তিকাল’ সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের জীবনের শেষের দিকে হিন্দি সিনেমা ‘পরিণীতা’, অনুরাগ বসুর (Anurag Basu) ‘বরফি’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া আধুনিক কালের ‘শত্রু’, ‘খোকা ৪২০’-এর মত সিনেমাতেও তিনি অভিনয় করেছিলেন। ২০১৩ সালের ‘খোকা ৪২০’ তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত শেষ ছবি। তাছাড়া তিনি দীর্ঘদিন দূরদর্শনেও কাজ করেছিলেন। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ও ‘ভাষার’ মতো বাংলা সিরিয়ালে তাঁর অভিনয় আজও বাঙালি দর্শক মনে রেখেছে।
হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবন অভিনয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁকে আলাদা করে অভিনয় করতে হত না, তাঁর কাছে অভিনয় ছিল এক সহজাত বিষয়। মঞ্চ নাটকের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চলচ্চিত্রজগতে সাফল্য লাভ করা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না, তবুও অভিনয়ের প্রতি নিখাদ ভালবাসার কারণে তিনি সেই বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি কখনও ছোট কিংবা বড় চরিত্র নিয়ে ভাবেননি শুধু নিজের অভিনয় নিয়ে ভেবেছিলেন। সাংসারিক প্রয়োজনে চাকরি করেছিলেন আর নেশার মায়াজালে জড়িয়ে অভিনয়কে করে তুলেছিলেন তাঁর জীবনের প্রধান চালিকা শক্তি।
১৯৬১ সালে হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়কে উল্টো রথ ম্যাগাজিন শ্রেষ্ঠ মঞ্চ শিল্পীর পুরস্কার দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০০৫ সালে তিনি ‘ক্রান্তিকাল’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতা হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। আবার ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি।
২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি কলকাতায় হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান