ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম এক অনন্য মাত্রা পেয়েছিল রাজনীতির পরিসরে মহাত্মা গান্ধীর উত্থানের পর। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এই উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে ছিল আগে থেকেই এবং সেই কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাল গঙ্গাধর তিলক এবং অ্যানি বেসান্ত দ্বারা পরিচালিত হোমরুল আন্দোলন (Home Rule Movement)। ১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষের অন্তত একাংশের মানুষকে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছিল এই আন্দোলন। জাতীয় কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা নতুনভাবে তৈরি হওয়ার পশ্চাতে হোমরুল আন্দোলনের ভূমিকাকে অস্বীকার করা চলে না। গান্ধীজী, জিন্নার মতো নেতারা এই আন্দোলনের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে সহমত না হলেও তাঁরা এই আন্দোলনের ভারতব্যাপী প্রসার ও জনপ্রিয়তা সম্পর্কে হয়ত ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং পরে হোমরুল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। হোমরুল আন্দোলন তিলকের জনপ্রিয়তা এতই বৃদ্ধি করেছিল যে, ভারতবাসীর কাছে তিনি হয়ে গিয়েছিলেন ‘লোকমান্য’। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস হোমরুল আন্দোলন ছাড়া লিখিত হওয়া সম্ভব নয়।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ব্রিটেন যেহেতু সেই যুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, তাই ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতবর্ষের উপরেও এসে লেগেছিল যুদ্ধের আঁচ। সেই কারণেই ভারতবর্ষের বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছিল অনেকটাই, এছাড়াও যুদ্ধকালীন করের ভার ও সেই সঙ্গে বেকারত্বও বেড়েছিল পাল্লা দিয়ে। এমন সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধান যে রাজনৈতিক দল অর্থাৎ নরমপন্থী জাতীয় কংগ্রেসও প্রায় প্রাণহীন হয়ে পড়েছিল, ফলে ক্রমাগত মানুষ তাদের উপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করে। অবশেষে ১৯১৫ সাল নাগাদ পুনরায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি নতুন মঞ্চ প্রস্তুত হতে শুরু করে। বাল গঙ্গাধর তিলক যিনি মান্দালেতে নির্বাসনে ছিলেন তিনি প্রত্যাগমন করেন এবং ‘থিওসফিক্যাল সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা, একজন আইরিশ সমাজতান্ত্রিক, লেখক ও বক্তা শ্রীমতী অ্যানি বেসান্তের মর্যাদা এদেশে বৃদ্ধি পায়। এর পূর্বে ঘটে যাওয়া গদর বিদ্রোহ এবং সরকারের নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একটা অসন্তোষের পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছিল। এমনই পরিস্থিতিতে মূলত অ্যানি বেসান্ত এবং তিলকের নেতৃত্বে ‘হোমরুল আন্দোলন’-এর সূত্রপাত ঘটেছিল।
এই ‘হোমরুল’ শব্দটির অর্থ হল স্বায়ত্তশাসন। আয়ারল্যান্ডের রেমন্ডস্-এর ‘হোমরুল লিগ’-এর অনুকরণে অ্যানি বেসান্ত ভারতবর্ষে হোমরুল অর্থাৎ স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তনের পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেই সময় ভারতবর্ষের জন্য স্বায়ত্তশাসন কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে উল্লেখ্য যে, হোমরুল বলতে অ্যানি বেসান্ত প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক ব্যতীত শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতীয়দের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে বুঝতেন। গ্রাম পঞ্চায়েত, মিউনিসিপালিটি, জেলা বোর্ড, প্রাদেশিক ব্যবস্থা পরিষদ, নিখিল ভারতীয় পার্লামেন্ট ইত্যাদি সর্বত্রই ঔপনিবেশিক শাসনের অনুরূপ স্বায়ত্তশাসন হবে—এমনটাই চিন্তা ছিল অ্যানি বেসান্তের। তিনি ১৯১৪ সালের ২ জানুয়ারি ‘কমন উইল’ এবং ১৪ জুলাই ‘নিউ ইন্ডিয়া’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করে তাঁর আদর্শ প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। প্রথমত, যুদ্ধের বিরোধিতা করে ‘নিউ ইন্ডিয়া’ পত্রিকাতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভারতের ঔপনিবেশিক সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। শুধু আক্রমণই নয়, স্বায়ত্তশাসন গ্রহণ করবার জন্য স্পষ্ট এবং সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন। সরকার যুদ্ধচালাকালীন কোনও পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করলে আন্দোলনের ক্ষেত্রটি আরও দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত হতে শুরু করে।
আইরিশ হোমরুল লিগের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব অ্যানি বেসান্তের দ্বারা প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েই কিন্তু তিলক ভারতবর্ষে প্রথম হোমরুল লিগ তৈরি করেছিলেন। ১৯১৫ সালের ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বরে তিলক বোম্বাই, মধ্যপ্রদেশ এবং বেরার-এর চরমপন্থীদের একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। এই সম্মেলনের ভিত্তিতেই ১৯১৬ সালের ২৮ এপ্রিল তিলকের ‘ইন্ডিয়ান হোমরুল লিগ’ গড়ে ওঠে। এর সভাপতি নিযুক্ত হন জোসেফ ব্যাপ্টিস্টা এবং সম্পাদক হয়েছিলেন এন. সি. কেলকার। এছাড়াও তিলকের লিগের সদস্য হয়েছিলেন জি. এস. খাপার্দে, বি. এস. মুঞ্জে, আর. পি. কারন্দিকার-এর মতো মানুষেরা। এই লিগের তরফ থেকে সরাসরি ঘোষণা করা হয়েছিল যে, লিগের লক্ষ্য হল ”ব্রিটিশ সাম্রজ্যের অধীনে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে হোমরুল বা স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা এবং সেই উদ্দেশ্যে জনমতকে শিক্ষিত ও সংগঠিত করে তোলা”। বাল গঙ্গাধর তিলকের পত্রিকা ‘কেশরী’ এবং ‘মারাঠা’ও হোমরুল আন্দোলনের জমি তৈরি করতে থাকে।
প্রথমদিকে তিলক ও অ্যানি বেসান্ত কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথভাবে এই আন্দোলন পরিচালনার কথা ভেবেছিলেন কিন্তু নরমপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত জাতীয় কংগ্রেস সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাননি। শ্রীমতী অ্যানি বেসান্ত পরে মাদ্রাজের আদিয়ারে ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিজের দায়িত্বে ‘হোমরুল লিগ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লিগের বিস্তার ঘটতে শুরু করে। বোম্বাই, এলাহাবাদ, মথুরা, কানপুর, বারাণসী, কালিকট প্রভৃতি জায়গায় লিগের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে তিলকের লীগ কাজ করছিল মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেন্দ্রীয় প্রদেশ এবং বেরার-এর মতো এলাকাগুলিতে। তিলকের লিগের সদর দপ্তর ছিল দিল্লিতে এবং এর মোট ছয়টি শাখা ছিল অন্যদিকে বেসান্তের লিগের ছিল ২০০টি শাখা। তিলকের তুলনায় বেসান্তের লিগের সংগঠন কিঞ্চিৎ শিথিল ছিল, যদিও তাতে আন্দোলনের তীব্রতা কমে যায়নি।
এই আন্দোলনের প্রভাব সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে পুনরায় নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিলক এবং অ্যানি বেসান্তের আগুন ঝরানো বক্তৃতাগুলি দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। তিলক ও বেসান্তের পত্রিকাগুলির মাধ্যমে তাঁদের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল এবং তাঁদের ইস্তেহারগুলিও মানুষের মনে তৈরি করছিল উত্তেজনা। তিলক সেসময় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন এবং মানুষ তাঁকে প্রায় ঈশ্বরের মত শ্রদ্ধা করতে থাকে, সেকারণেই তিনি ‘লোকমান্য’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তিলক সরাসরি ঘোষণা করেছিলেন “স্বরাজ আমাদের জন্মগত অধিকার এবং আমরা তা অর্জন করবই”। তিলক এবং বেসান্ত উভয়েরই লিগের সদস্য খুব কম সময়ের মধ্যেই অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছিল। ভারতে একইসঙ্গে দুটি হোমরুল লিগ থাকলেও তাদের মধ্যে কিন্তু ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। উল্লেখ্য যে, ভারতের বাইরে লন্ডন ও সানফ্রান্সিসকোতেও হোমরুল লিগের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
লিগের নেতারা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন। এমনকি হাজার হাজার ভারতবাসীর স্বাক্ষর করা স্বায়ত্তশাসনের আবেদন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছেও জমা দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলন এতই তীব্র আকার ধারণ করে ক্রমে যে, সরকার ভীত হয়ে তিলক ও বিপিনচন্দ্র পালের দিল্লি ও পাঞ্জাবে এবং অ্যানি বেসান্তের মধ্যপ্রদেশ ও বেরারে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এমনকি লিগের কোনও সভাসমিতিতে যাতে ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করতে না পারে এই মর্মে বাংলা ছাড়া আর সর্বত্র আদেশ জারি করে সরকার। বিপ্লবাত্মক ও উত্তেজক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য তিলককে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁকে অন্তত একবছর ‘সদ্ভাব’-এ থাকার জন্য ও ২০ হাজার টাকা বন্ড ও দুজন জামিনদার রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। যদিও তিলক হাইকোর্টে আপিল করেন ও জিতে যান। অন্যদিকে বেসান্তের ‘নিউ ইন্ডিয়া’ পত্রিকার জন্য প্রথমে দু’হাজার টাকা এবং পরে দশ হাজার টাকা জামিন চায় সরকার। তিলক ও বেসান্তের ওপর সরকারের এমন আচরণ কংগ্রেসের ওপর প্রভাব ফেলে। তাঁরা এই দুই নেতাকে ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে সম্বর্ধনা দেন। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ এই সময় হোমরুল লিগের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি ঘোষণা করেছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, মধ্যপন্থী ও মৌলবাদীদের একীকরণের পাশাপাশি মুসলিম লীগ এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে ঐক্যসাধন অ্যানি বেসান্তের একটি অসাধারণ কৃতিত্ব।
১৯১৭ সালের ১৫ জুন যখন অ্যানি বেসান্ত ও তাঁর দুই সহকর্মীকে মাদ্রাজ সরকার গ্রেফতার করে তখন সারা দেশে উত্তেজনা, অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি বিদেশেও এর সমালোচনা হয়েছিল। গান্ধীজী, জিন্না, সুরেন্দ্রনাথ, মদনমোহন মালব্যের মতো লোকেরা এর তীব্র নিন্দা করেন। গান্ধীজী একে ‘গুরুতর ভ্রান্তি’ বলেছিলেন। স্যার সুব্রহ্মণ্য আইয়ার তাঁর ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। এমন প্রতিক্রিয়ার ফলে অবশেষে সরকার বেসান্তকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯১৭ সালে বেসান্তকে কলকাতা কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
কোনভাবেই আন্দোলনকে দমাতে না পেরে ভারত সচিব মন্টেগু ১৯১৭ সালের ২০ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন যে, ভারতে দায়িত্বশীল প্রতিনিধিমূলক সরকার স্থাপনই তার আশু লক্ষ্য বলে মনে করে ব্রিটিশ সরকার। হোমরুল আন্দোলনের তীব্রতাই এমন ঘোষণা করতে বাধ্য করেছিল ব্রিটিশকে। এর ফলেই ভারত সচিব মন্টেগু নীতিগতভাবে ভারতবাসীর স্বায়ত্তশাসনের অধিকার মেনে নিয়েছিল। তাছাড়া এই আন্দোলনের প্রভাবে কিন্তু নরমপন্থী জাতীয় কংগ্রেস জনগণের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিল। সর্বোপরি এই গণ-আন্দোলন গান্ধীজীর উত্থান এবং তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত গণ-আন্দোলনগুলির পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০২১।
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://byjus.com//
- https://amritmahotsav.nic.in/
- https://www.nextias.com//
- https://ebooks.inflibnet.ac.in/


আপনার মতামত জানান