ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীর মৃত্যু

পরীক্ষিৎ

পাণ্ডবদের তৃতীয় প্রজন্মের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন পরীক্ষিৎ । তিনি ছিলেন অর্জুনপুত্র অভিমন্যু ও বিরাট রাজ্যের রাজকন্যা উত্তরার সন্তান। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তাঁর জন্ম হয়। সেই সময় কুরুবংশ ‘পরীক্ষিণ’ অর্থাৎ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে বলে সম্রাট যুধিষ্ঠির তাঁর নাম রাখেন ‘পরীক্ষিৎ’। যুধিষ্ঠিরের পরে তিনি হস্তিনার সিংহাসনে বসেন এবং ষাট বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন।    দুর্যোধনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে দ্রোণপুত্র অশ্বথামা যখন ঘুমন্ত অবস্থায় পাণ্ডবপক্ষের প্রায় সকলকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেন, তখন পুত্রশোকে আকুল দেবী দ্রৌপদী যুধিষ্ঠিরকে অনুরোধ করেন অশ্বথামার মাথার সহজাত মনিটি এনে দেওয়ার জন্য। দ্রৌপদীর অনুরোধ শুনে ভীমঅর্জুন তখনই অশ্বথামাকে খুঁজে বের করে তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন। অর্জুনকে আটকাবার জন্য অশ্বথামা ‘ব্রহ্মশির’ নামে এক ভয়ানক অস্ত্র ছুঁড়ে মারলে কৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুনও দ্রোণের কাছে পাওয়া ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। দুই অস্ত্রের তেজে পৃথিবী কেঁপে উঠল। শুরু হল ভয়ঙ্কর বজ্রপাত ও উল্কাবৃষ্টি। 

মহাপ্রলয় আসন্ন দেখে নারদ ও ব্যাসদেব দুই অস্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্জুন ও অশ্বথামা দুজনকেই তাঁদের নিজের নিজের অস্ত্র ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ করলেন। তখন অর্জুন বললেন, “আমি অশ্বত্থামার অস্ত্রকে আটকানোর জন্যই এ অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলাম। আমি যদি অস্ত্র থামিয়ে দিই তবে অশ্বত্থামার অস্ত্র আমাদের ভস্ম করে দেবে। যাতে আমরা সবাই রক্ষা পাই আপনারা তাই করুন।” এ কথা বলে অর্জুন নিজের অস্ত্র থামিয়ে দিলেন।

কিন্তু অশ্বত্থামার নিজের অস্ত্র থামাবার ক্ষমতা ছিল না। এ অবস্থায় মহর্ষিরা ঠিক করলেন যে অশ্বত্থামার অস্ত্রের আঘাতে মারা যাবে অভিমন্যু ও উত্তরার শিশুপুত্র এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে অশ্বত্থামা তাঁর মাথার সহজাত মনিটি পাণ্ডবদের দান করবেন। এই ঘটনার ফলস্বরূপ মৃত অবস্থায় উত্তরার সন্তান জন্ম নেয়। পাণ্ডবদের একমাত্র বংশধরের এমন অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন কুন্তী, দ্রৌপদী, উত্তরা সহ সব পাণ্ডবরমণীরা। সবার আকুল কান্নায় কৃষ্ণের দয়া হয়। তিনি এসে শিশুটিকে জীবন দান করেন। যুধিষ্ঠির তাঁর নাম রাখেন ‘পরীক্ষিৎ’।পাণ্ডবরা মহাপ্রস্থানে যাওয়ার আগে পরীক্ষিৎকে হস্তিনার সিংহাসনে বসান। তিনি খুব ধার্মিক এবং গুণবান রাজা ছিলেন। প্রজাদের তিনি নিজের ছেলের মতো করে পালন করতেন। 

এভাবে কিছুদিন চলার পর একদিন মহারাজ পরীক্ষিৎ মৃগয়া করতে গেলেন। অনেক পশু তাঁর অস্ত্রের আঘাতে মারা গেলেও একটি হরিণ কোনোরকমে বেঁচে ছুটে পালিয়ে গেল। মহারাজ সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে হরিণটিকে তাড়া করলেন। কিন্তু কিছুতেই তাকে ধরতে পারলেন না। এভাবে ছুটতে ছুটতে তিনি একটি বিশাল মাঠে এসে উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন একজন তপস্বী একটি গরুর বাঁটে মুখ লাগিয়ে দুধ পান করছেন। তাঁকে দেখে রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মুনিবর! আমি অভিমন্যুর পুত্র মহারাজ পরীক্ষিৎ। আমার বাণ খেয়ে একটি হরিণ পালিয়ে গেছে। সেটি কোনদিকে গেছে আপনি কি দেখেছেন?”  সেই তপস্বী ছিলেন মহর্ষি শমীক। তিনি তখন মৌনব্রত (অর্থাৎ কোনো কথা না বলবার ব্রত) নিয়েছিলেন। তাই তিনি রাজার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। এদিকে সারাদিন হরিণের পিছনে ছুটে খিদে-তেষ্টায় কাতর রাজা বারবার জিজ্ঞাসা করেও মুনির কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে ভীষণ রেগে গেলেন। রাগের মাথায় তখন তিনি ধনুকের আগায় করে কাছে পড়ে থাকা একটা মরা সাপ তুলে এনে মহর্ষি শমীকের গলায় জড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন। 

মহর্ষি শমীক খুব ভালো করেই রাজা পরীক্ষিৎকে চিনতেন ও তাঁর স্বভাবের কথা জানতেন। তাই তিনি এই ঘটনার পরেও কিছুমাত্র রাগ করলেন না। কিন্তু মুনির ছেলে শৃঙ্গী ছিলেন খুব রাগী মানুষ। তিনি তখন তপস্যা করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে এক ঋষিপুত্রের মুখে বাবার এই অপমানের কথা সবুনে তিনি রাগে জ্বলে উঠলেন। এই ঘটনার সঙ্গে মহারাজ পরীক্ষিৎ জড়িয়ে আছেন তা জেনে তিনি অভিশাপ দিলেন, “যে দুষ্ট আমার বাবাকে এমন অপমান করেছে, আজ থেকে সাতদিন পরে তক্ষক নামে ভয়ানক বিষধর সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হবে।”   

এরপর তিনি তপোবনে ফিরে এসে দেখলেন সত্যিই তাঁর বাবার গলায় একটি মরা সাপ জড়ানো আছে। তখন শৃঙ্গী কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বললেন, “বাবা! দুষ্ট রাজা পরীক্ষিৎ বিনা দোষে আপনাকে এমন অপমান করেছে। তাই আমি তাঁকে শাপ দিয়েছি যে সাতদিন পরে তক্ষকের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হবে।” এ কথা শুনে মহর্ষি শমীক খুব দুঃখ পেলেন। তিনি শৃঙ্গীকে ভর্ৎসনা করে বললেন, “বাছা! তুমি খুব ভুল কাজ করেছ। এমন ধার্মিক রাজা একটা অন্যায় কাজ করে ফেললেও তাঁকে এমন অভিশাপ দেওয়া তোমার উচিত হয়নি। আমরা তপস্বী, ক্ষমা করাই আমাদের ধর্ম। রাজা আমার মৌনব্রতের কথা জানতেন না, জানলে তিনি কখনোই এমন কাজ করতেন না।” এইসব কথা শুনে শৃঙ্গীও অনুতাপ করতে লাগলেন। 

তখন মহর্ষি শমীক রাজাকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য গৌরমুখ নামে এক শিষ্যকে রাজার কাছে পাঠালেন। তাঁর মুখে সব কথা শুনে রাজাও নিজের কৃতকর্মের জন্য ভীষণ অনুতপ্ত হলেন। তারপর রাজা মন্ত্রীদের সঙ্গে অনেক পরামর্শ করে এই ভীষণ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় খুঁজতে লাগলেন। সবার সম্মতিতে কারিগরদের ডেকে এনে একটি বিশাল উঁচু থাম তৈরি করানো হল। সেই থামের আগায় একটি ঘর বানিয়ে মহারাজ পরীক্ষিৎ অনেক ভালো ভালো কবিরাজ, বৈদ্যদের সাথে রাশি রাশি সাপের বিষের ওষুধ সঙ্গে নিয়ে সাবধানে বাস করতে লাগলেন। থামটির চারিদিকে রাতদিন অস্ত্রধারী সৈন্যরা পাহারা দিতে লাগল। তাদের চোখ এড়িয়ে কারোরই রাজার কাছে যাওয়ার উপায় রইল না।   সেকালে কাশ্যপ নামে একজন ঋষি বিশের বিষের অব্যর্থ ওষুধ জানতেন। রাজাকে তক্ষকে কামড়াবে এই খবর পেয়ে তিনি ঠিক করলেন যে তিনি রাজাকে বাঁচাতে যাবেন। বেঁচে উঠলে রাজা নিশ্চয়ই তাঁকে অনেক পুরস্কার দেবেন। এই ভেবে তিনি রাজার কাছে যাবেন বলে স্থির করলেন। পথের মধ্যে কাশ্যপের সঙ্গে এক ব্রাহ্মণের দেখা হল। সেই ব্রাহ্মণই ছিলেন তক্ষক, তিনি ব্রাহ্মণের বেশ ধরে রাজাকে কামড়াতে যাচ্ছিলেন। কাশ্যপকে দেখে ব্রাহ্মণবেশী তক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রাহ্মণ! আপনি এত তাড়াতাড়ি করে কোথায় যাচ্ছেন?”   

কাশ্যপ উত্তর দিলেন, “আমি শুনেছি রাজা পরীক্ষিৎকে তক্ষক নামে ভয়ানক সাপ কামড়াবে। আমি সাপের বিষের ওষুধ জানি, তাই আমি রাজাকে বাঁচাতে যাচ্ছি।” এ কথা শুনে তক্ষক বললেন, “হে ব্রাহ্মণ! আমিই সেই তক্ষক। আমি যদি কাউকে কামড়াই তাহলে কেউ তাকে রক্ষা করতে পারে না। তাই আপনি বৃথাই এতো পরিশ্রম করছেন। আপনি ঘরে ফিরে যান।”কাশ্যপ বললেন, “আমি নিশ্চয়ই রাজাকে বাঁচাতে পারব, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।” তক্ষক বললেন, “যদি সত্যিই আপনার এতো ক্ষমতা থাকে তবে আমি এই বটগাছটিকে কামড়াচ্ছি। দেখি আপনি একে বাঁচাতে পারেন কি না।”

এই বলে তক্ষক একটি বিশাল বটগাছকে কামড়ালেন। তাঁর বিষের তেজে মুহূর্তের মধ্যে বিরাট গাছটি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কাশ্যপ সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। দেখতে দেখতে তাঁর মন্ত্রের জোরে বটগাছটি আবার আগের মত করেই বেঁচে উঠল। কাশ্যপের অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হয়ে তক্ষক তাঁকে বললেন, “মুনিবর! আপনার ক্ষমতা দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। কিন্তু রাজা পরীক্ষিতের নিয়তি এটাই যে তাঁর এভাবেই মৃত্যু হবে। আমি বরং আপনাকে আপনার প্রয়োজনমত অর্থ দান করছি, আপনি তা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।” কাশ্যপের প্রয়োজন ছিল শুধু অর্থের। তাই তিনি তক্ষকের কথা শুনে তাঁর দেওয়া অর্থ নিয়ে ফিরে গেলেন। কাশ্যপকে ফিরিয়ে দিয়ে তক্ষক হস্তিনায় এসে দেখলেন যে সরাসরি মহারাজ পরীক্ষিৎ কে কামড়ানোর কোনো উপায় নেই। তিনি তখন অন্য উপায় বের করলেন। তাঁর আদেশে কয়েকজন সাপ ব্রাহ্মণের বেশ ধরে ফল, ফুল, কুশ আর জল নিয়ে রাজাকে আশীর্বাদ করতে গেলেন। আর তক্ষক একটি ছোট্ট পোকার রূপ ধরে একটি ফলের মধ্যে লুকিয়ে রইলেন। ব্রাহ্মণদের আসার উদ্দেশ্য শুনে সৈন্যরা তাঁদের আটকাল না। ব্রাহ্মণবেশী সাপেরা তখন রাজাকে আশীর্বাদ করে সেই ফলটি দিয়ে বিদায় নিলেন। রাজা তখন ফলটি খেতে গিয়ে দেখলেন ফলটির ভিতর থেকে একটি ছোট্ট পোকা বেরিয়ে আসছে। তার শরীর তামার মত, চোখদুটি কালো। এদিকে সেই দিনের সূর্য অস্ত গেলেই সাতদিন পূর্ণ হয় এবং রাজার বিপদ কেটে যায়। রাজা দেখলেন সূর্য তখন অস্তে যাচ্ছেন, তা দেখে রাজার ভয় অনেকটা কমে যাওয়াতে তিনি মজার ছলে বললেন, “এখন আর আমার বিষের ভয় নাই। এখন যদি এই পোকাই তক্ষক হয়ে আমাকে কামড়ায়, তবে আমার শাপও কাটে, মুনির কথাও রক্ষা হয়।” এই বলে তিনি সেই পোকাটিকে নিজের গলায় রেখে হাসতে লাগলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই ছোট্ট পোকাটি এক বিশাল সাপে পরিণত হয়ে গর্জন করতে করতে রাজার গলা জড়িয়ে ধরে তাঁকে কামড়ে দিল। বিষের তেজে সাথে সাথেই মহারাজ পরীক্ষিতের মৃত্যু হল। এইভাবে পরীক্ষিতের মৃত্যু হওয়ার পর হস্তিনার সিংহাসনে বসেন তাঁর ছেলে জন্মেজয়।

তথ্যসূত্র


  1. ‘মহাভারত’,কালীপ্রসন্ন সিংহ, স্ত্রীপর্ব, অধ্যায় ১৩-১৬, পৃষ্ঠা ২৫-২৯
  2. ‘পরীক্ষিতের কথা’, উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় প্রকাশ, পৃষ্ঠা ৫০৯-৫১৪
  3. ‘মহাভারত সারানুবাদ', রাজশেখর বসু, আদিপর্ব, পৃষ্ঠা ১৮-২১, কলিকাতা প্রেস, তৃতীয় প্রকাশ

আপনার মতামত জানান