কেউ কেউ বলে দীঘা হল “বাঙালির গোয়া”, আবার ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর একটি চিঠিতে দীঘাকে “প্রাচ্যের ব্রাইটন” বলে উল্লেখ করেছেন। কথাতেই আছে, বাঙালির ঘোরার তিনটে জায়গা হল দীপুদা, অর্থাৎ দীঘা, পুরী আর দার্জিলিং। দীঘা বাঙালির কাছে কখনও পুরনো হয় না। তাই সারা বছর ধরেই এখানে প্রচুর ভিড় থাকে। দীঘাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ওল্ড দীঘা এবং নিউ দীঘা। ওল্ড দীঘাতে অবস্থিত দীঘা মোহনা থেকে দীঘার সীমা শুরু হয় এবং নিউ দীঘার ওসিয়ানা সৈকতে গিয়ে দীঘার সীমা শেষ হয়। দীঘা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা করতে দীঘাতে কী দেখবেন সেই স্থানগুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হল।
ওল্ড দীঘা সৈকত – পূর্বে দীঘা বলতে এই জায়গাটিকেই বোঝাত। পরে ভিড় বাড়ায় সমুদ্রসৈকত নিউ দীঘা অবধি প্রসারিত হয়েছে। আর সেজন্যই এই সৈকতের নামের আগে জুড়ে গেছে ‘ওল্ড’। এখানে ঢেউয়ের উচ্চতা খুব বেশি। এখানে বিকালে বা ভোরবেলায় এই ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখা একটা অভিজ্ঞতার বিষয়। বড় ঢেউ আর সেই ঢেউকে আটকাতে বোল্ডার থাকায় সব জায়গা স্নানের উপযুক্ত নয়। স্নানের জন্য বিশেষ জায়গা চিহ্নিত করা আছে। তবে স্নান না করলেও এখানে সমুদ্রের তীরে ছাউনির তলায় বসে ডাব খেতে খেতে সমুদ্রকে উপভোগ করতে পারেন। তাছাড়া ওল্ড দীঘায় বেশি মজা সন্ধেবেলা। এখানের সৈকতে সামুদ্রিক মাছ ভাজা বিক্রি শুরু হয় সন্ধ্যাতে। প্রচুর মানুষ সেই মাছ ভাজা খাবার জন্য ভিড় জমায়।

দীঘা মোহনা – ওল্ড দীঘা থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে চম্পা নদী যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে, সেই জায়গাটিই দীঘার মোহনা নামে পরিচিত। এটি আন্তর্জাতিক মাছের বাজার। এখানে মৎস্যজীবীদের জালে বিভিন্ন ধরনের মাছ ওঠে, যা দেখাই একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। যেমন ২০১৩ সালে দীঘা মোহনায় প্রায় ৮০০ কেজি ওজনের একটি মাছ উঠেছিল, যা দেখতে পর্যটকদের ভিড় ছিল দেখার মত। শুধু দেখাই নয়, চাইলে মাছ কিনেও আনা যায়। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখতে এখানে মানুষ ভিড় জমায়। তবে এখানে আসার আদর্শ স্থান ভোরবেলা। বেলা বাড়তে বাড়তে দীঘা মোহনায় ভিড় কমে, সমুদ্র একটু দূরে যায়। তখন এই সৈকতে একা বা কয়েকজন মিলে হেঁটে চলাও একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা। এতটা ফাঁকা সৈকত দীঘায় আর কোথাও পাওয়া যায় না। এখানে সমুদ্রের অনেকটা ভেতর অবধি রাস্তা করা আছে। সকালে জোয়ারের সময় সেটা জলের স্রোতে ঢেকে যায়। একটু বেলা হলেই জল দূরে সরে গেলে রাস্তার শেষ অবধি হেঁটে সমুদ্রকে ছুঁয়ে আসা যায়।
মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম অ্যান্ড রিজিওনাল সেন্টার (MARC) – দীঘার অন্যতম একটি আকর্ষণ হল দ্য মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম অ্যান্ড রিজিওনাল সেন্টার। এটি ওল্ড দীঘা সমুদ্র সৈকতের কাছে অবস্থিত। এটি দেশের বৃহত্তম এবং সুসজ্জিত সামুদ্রিক অ্যাকোয়ারিয়াম। এই অ্যাকোয়ারিয়াম সোমবার থেকে শনিবার (মঙ্গলবার বাদে) সকাল ১০টা থেকে সন্ধে ৬ টা অবধি খোলা থাকে। এখানে কোন প্রবেশমূল্য নেই।

নিউ দীঘা সৈকত – দীঘায় থাকা এবং সমুদ্র স্নান বলতে মূলত নিউ দীঘাকেই বোঝায়। এখানের সমুদ্রে সারাদিনই ভিড় থাকে। এখানে ঢেউ ওল্ড দীঘার চেয়ে কম, তাই ওল্ড দীঘাতে থাকলেও স্নান করলে নিউ দীঘাতেই এসে করা উচিত। নিউ দীঘা ওল্ড দীঘার তুলনায় বেশি পরিষ্কার। যদিও দিন দিন পর্যটকেরা নিউ দীঘাকেও সমানভাবে নোংরা করে চলেছে। এখানের সৈকতটি বেশ চওড়া ছিল, কিন্তু সমুদ্র এগিয়ে আসার ফলে এখানে বর্তমানে বালির সৈকত সেই অর্থে নেই। ভোরবেলায় এই সমুদ্রসৈকতে হাঁটার পাশাপাশি অনেকেই বল বা বেলুন নিয়ে সৈকতে খেলা করে। তবে ঢেউ বেড়ে যাওয়ার কারণে এখানে সাবধানে চলাফেরা বা খেলাধুলা করা উচিত।
অমরাবতী পার্ক – অমরাবতী পার্ক নিউ দীঘা সমুদ্র সৈকতের কাছে অবস্থিত। এই পার্কে ছোট একটি লেক রয়েছে যাকে অমরাবতী লেক বলে। এখানে আপনারা বোট রাইডিং করতে পারেন। এছাড়াও লেকের উপরে একটি রোপওয়ে আছে যেখানে আপনারা চড়ে আকাশ থেকে দীঘার ভিউ দেখতে পারেন।

দীঘা পিকনিক স্পট – স্থানীয় মানুষেরা দীঘাতে বাস বা গাড়ি করে পিকনিক করতে যান। দুর্দান্ত দীঘা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা করতে অনেকেই এখানে পিকনিক করতে যান। অতীতে নিউ দীঘার ঝাউবনের পাশে পিকনিক করে জায়গাটিকে অনেকে নোংরা করে চলে যেতেন। বর্তমানে নিউ দীঘা থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা আলাদা পিকনিক স্পট বানানো আছে। সেখানে গাড়ি পার্কিং এরও সুবিধা রয়েছে।
দীঘা বিজ্ঞান কেন্দ্র – দীঘা বিজ্ঞান কেন্দ্র শিশুদের জন্য দুর্দান্ত জায়গা। এখানে গেলে শিশুদের দীঘা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অসাধারণ হবেই। করতে অনেকেই এখানে পিকনিক করতে এতে প্রচুর বিজ্ঞান সম্পন্ন প্রকল্প এবং মজাদার জিনিস রয়েছে যা শিশুই নয়, সব বয়সের মানুষরাই আনন্দের সাথে উপভোগ করতে পারে। এখানে প্রবেশের সময় সকাল ৯:২০ থেকে বিকাল ৬:৩০ পর্যন্ত । দীঘা বিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রবেশ মূল্য ২৫ টাকা।

ওসিয়ানা সৈকত – বর্তমান সময়ে দীঘার সবচেয়ে নিরিবিলি এবং পরিচ্ছন্ন সৈকত হল ওসিয়ানা। নিউ দীঘার সীমানা যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানে অবস্থিত এই সৈকত। এই সৈকতটি বেশ চওড়া। সৈকতের সামনে সুন্দর করে বাঁধানো সিঁড়ি রয়েছে। এই সিঁড়ির দুইপাশে রয়েছে ঝাউবন এবং কাঁটাতার দিয়ে ঝাউবন ঘেরা যাতে সাধারণ মানুষ সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। এর ফলে ঝাউবনে ঢুকে বনটি নোংরা করার আর সুযোগ নেই। এখানে সমুদ্রের পাড়ে কিছুদূর ছাড়া ছাড়া ওয়াচ টাওয়ার বানানো আছে। সেখানে বসে সামুদ্রিক হাওয়া খেতে খেতে সমুদ্র দেখার মজা উপভোগ করতে পারেন।
এছাড়া দীঘা থেকে যে সমুদ্রসৈকত আর জায়গাগুলো যাওয়া যায় তা হল বাঁকিপুট, জুনপুট, মন্দারমনি, তাজপুর, চাঁদপুর, উদয়পুর, শঙ্করপুর, তালসারি, চন্দনেশ্বর শিব মন্দির ইত্যাদি।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৩
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to সববাংলায়Cancel reply