ভ্রমণপিপাসু এক বিরাট সংখ্যক মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকে সমুদ্র, বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি, নীল জলে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মোহিনী রূপ দর্শনের আকাঙ্ক্ষা। সমুদ্র বলতেই বাঙালিরা সর্বাগ্রে দীঘা এবং পুরীর নামই ভেবে থাকেন। দীঘার জনপ্রিয়তা মূলত সমুদ্রের জন্য হলেও পুরী কেবলই সমুদ্রসৈকতের কারণেই বিখ্যাত নয়, তারই সঙ্গে একটা আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক আকর্ষণও রয়েছে এই জায়গাটির। পুরীর জগন্নাথ মন্দির বা জগন্নাথধাম হল হিন্দুদের চারধামের একটি ধাম। এছাড়াও মহাপুরুষ শ্রী শ্রী চৈতন্যদেবের পাদস্পর্শে এই পুরীর মাটি ধন্য হয়েছে। জগন্নাথদেবের মাহাত্ম্য, চৈতন্যদেবের সান্নিধ্য এইসব মিলিয়ে বাঙালির কাছে পুরী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সত্যিই দারুণ। স্বর্গদ্বারের কাছে কী দেখবেন সেই সমস্ত স্থানগুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হল।
পুরীতে স্বর্গদ্বারের কাছে কী দেখবেন
স্বর্গদ্বার সমুদ্র সৈকত
স্বর্গদ্বারের কাছে কী দেখবেন এই তালিকায় প্রথমেই নাম আসবে স্বর্গদ্বার সৈকত। পুরীতে বেশ কয়েকটি সমুদ্রসৈকত আছে। তাদের মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত অবশ্যই স্বর্গদ্বার সৈকত। স্বর্গদ্বার অর্থাৎ ‘স্বর্গের দরজা’। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী প্রভু জগন্নাথ স্বর্গ থেকে এই পথেই পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিলেন। এখানেই নাকি ভেসে এসেছিল ব্রহ্মদারু, যা দিয়েই জগন্নাথ মন্দিরের তিনটি প্রধান মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্বর্গদ্বারে রয়েছে একটি মহাশ্মশান। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর পর এখানে দাহ করা হলে নাকি মানুষের আত্মা স্বর্গে পৌঁছায়। এই মহাশ্মশানের পাশেই যে সমুদ্র সৈকত সেটিই স্বর্গদ্বার সমুদ্র সৈকত নামে পরিচিত। সেখানকার জলকে খুব পবিত্র বলে জ্ঞান করা হয়। বলা হয় শ্রীচৈতন্যদেবও এই স্বর্গদ্বারে স্নান করতেন। এখানে আগত অনেক পর্যটক ‘মহানদী’ নামে পরিচিত একটি স্থানে স্নান ও প্রার্থনা করেন। তবে পুণ্য অর্জনের জন্য না হলেও শুধুমাত্র সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করা বা সমুদ্র স্নান করতেই পর্যটকেরা ভিড় জমায় এখানে। এই জায়গাটি খুব জনবহুল। সারাদিন এই সৈকতে মানুষের ভিড় থাকে। সৈকত জুড়ে এখানে ছোটোখাটো প্রচুর দোকান রয়েছে। তাদের নিয়েই এখানে গড়ে উঠেছে বিরাট বাজার। পুরীর কেনাকাটি করতে মূলত এখানেই আসে সকলে। শাড়ি, ধুতি, চাদর থেকে শুরু করে ঝিনুক, শঙ্খ বা রূপোর ফিলিগ্রি ছাড়াও আরও নানারকম দ্রব্যের পসরা সাজিয়ে এখানে বসে থাকেন বিক্রেতারা। দিনের বেলাতে কিংবা সন্ধেবেলা, সবসময়তেই এই মার্কেটগুলি থেকে কেনাকাটা করা যায়। সামুদ্রিক মাছ-সহ আরও নানারকম খাবারও পাওয়া যায় অত্যন্ত সুলভে। স্বর্গদ্বার সৈকত এবং তৎসংলগ্ন এই বিশাল বাজার তাই পুরীর অন্যতম সেরা এক আকর্ষণ। প্রচুর হোটেল রয়েছে এখানে। দামি হোটেল থেকে শুরু করে কম খরচায় আরামে থাকবার মতো হোটেলের অভাবও হবে না এখানে।
গোল্ডেন সী বীচ
পুরী বললেই প্রথমত চোখের সামনে যা ভেসে ওঠে তা হল বিস্তীর্ণ নীল সমুদ্র, বহুদূর প্রসারিত বালিয়াড়ি। বড় বড় ঢেউ এসে যখন পাড়ে আছড়ে পড়ে সাদা ফেনায় বালির উপরে তৈরি হয় নকশা, অথচ ঢেউয়ের বিরাম নেই, একেরপর এক ছুটে আসছে গর্জন করে। সমুদ্রের এই অপার সৌন্দর্য মুছে দেবে মানুষের নাগরিক ক্লান্তি। পুরীর প্রধান সমুদ্র সৈকতগুলির একটি হল ‘গোল্ডেন বীচ’। পুরীর মে ফেয়ার হোটেল থেকে শুরু করে দিগাবারেনি পর্যন্ত ৮৭০ মিটার সুদীর্ঘ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই গোল্ডেন বীচ। বন ও প্রকৃতি দফতরের ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট পুরীর এই সমুদ্র সৈকতটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে এবং নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য ব্লু ফ্ল্যাগ প্রোগ্রাম’। নির্দিষ্ট মূল্যের টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয় এখানে। তিনঘন্টার জন্য প্রবেশমূল্য ২০ টাকা এবং সারাদিনের জন্য নানারকম সুবিধার নিরিখে ৫০ কিংবা ১০০ টাকা। ১০ বছরের কম শিশুদের জন্য কোনো প্রবেশমূল্য নেই। সঙ্গে গাড়ি থাকলে তা পার্কিং-এর জন্যও আলাদা অর্থ লাগবে। এই সোনালী সমুদ্র সৈকতের বুকে সূর্যোদয়, সূর্যাস্তের দৃশ্য আলাদা এক মুগ্ধতা তৈরি করবেই। ছবি তোলার নেশা যাদের, তাদের কাছে এই সময়গুলি খুবই লোভনীয়। সমুদ্র দেখা, সমুদ্রস্নান, ইত্যাদি ছাড়াও এই সমুদ্রসৈকতে বসার জন্য ভাড়া পাওয়া যায় চেয়ার, সময়ের হিসেবে নেওয়া হয় ভাড়া। তাছাড়াও ছোট থেকে বড় সকলেই সৈকতে উট, ঘোড়া খচ্চরের পিঠে চড়ে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে। এছাড়াও বোট রাইড, সাঁতার, সার্ফিং ইত্যাদির ব্যবস্থাও রয়েছে পর্যটকদের জন্য। স্থানীয় নানারকম খাদ্যের এবং কেনাকাটার দোকানও পাওয়া যাবে। পুরীর এই অতি জনপ্রিয় সৈকত থেকে কিছুদূরে স্যান্ড আর্টের দেখাও মিলবে।
নীলাদ্রি সী বীচ
গোল্ডেন সমুদ্র সৈকতের একেবারে কাছেই অবস্থিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র সৈকত হল এই নীলাদ্রি সমুদ্র সৈকত। মূলত বঙ্কিমুহান এবং মে ফেয়ার হোটেলের মাঝখানে ৫০০ মিটার জুড়ে বিস্তৃত এই নীলাদ্রি সী বীচ। স্টেশন থেকে এর দূরত্ব ২.২ কিলোমিটার। এই বীচটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশাসন একটি বেসরকারী সংস্থাকে নিযুক্ত করেছে। পর্যটকদের জন্য প্রশাসন কর্তৃক ছোট বাগান তৈরি করা হয়েছে, সেখানে রয়েছে সুদৃশ্য কুঁড়েঘর। এছাড়াও ছবি তোলবার জন্য আলাদা সুন্দর একটি স্থানও তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও অ্যাম্ফিথিয়েটার, ল্যান্ডস্কেপ লন-সহ শিশুদের জন্য নানা ক্রীড়া সরঞ্জামেরও ব্যবস্থা রয়েছে। সমুদ্রের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করবার সুযোগ এখানে পাবেন পর্যটকেরা। যেহেতু বেসরকারী একটি প্রতিষ্ঠান দ্বারা এই বীচটির রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, সেকারণে ২০ টাকা প্রবেশমূল্য দিয়ে এখানে ঢোকা যায়। এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সৈকত এটি, যে এখানে প্রবেশ করা মাত্রই মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, আনন্দে ভরে যায়।

লাইট হাউস
স্বর্গদ্বার থেকে এই লাইট হাউসটির দূরত্ব দেড় কিলোমিটার মতো। মেরিন ড্রাইভ রোডের ওপর অবস্থিত এই লাইট হাউসে একবার অন্তত ঘুরে আসা উচিত। যাঁরা লাইট হাউস বীচে থাকবেন তাঁদের জন্য এটি হাঁটা পথের দূরত্বে অবস্থিত। অনেকে সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়ে চলে যান এখানে। স্বর্গদ্বারের কাছ থেকেও এখানে হেঁটে আসা চলে। টিকিট কেটে বিকেল চারটে (কখনও সাড়ে চারটে) থেকে পাঁচটা (কখনও সাড়ে পাঁচটা) অবধি এখানে ওঠার অনুমতি পাওয়া যায়। এই লাইট হাউসটির উপর থেকে পুরীর সমুদ্র, বিশাল বালিয়াড়িকে অনবদ্য সুন্দর দেখতে লাগে। এর ওপরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য যদি প্রত্যক্ষ করা যায় , তবে তা জীবনের এক অতি মূল্যবান অভিজ্ঞতা হিসেবে থেকে যাবে। খেয়াল রাখবেন লাইট হাউসে জুতো খুলে ওপরে উঠতে হয়।

পুরীর মোহনা
স্বর্গদ্বার থেকে পুরীর মোহনা প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার এবং লাইট হাউস থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এখানে ধাউড়িয়া নদী এসে মিশেছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যে মন ভরে যায় এখানে। এখানকার সমুদ্র সৈকতে চারিদিকে নানা বর্ণ ও আকারের ঝিনুক ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মেরিন ড্রাইভ ধরে গাড়ি করে এখানে পৌঁছে যাওয়া যায় কিংবা অটো বা টোটো ভাড়া করেও চলে যেতে পারেন। সাধারণত খুব নির্জন স্থান এটি, তাই সন্ধেবেলা এদিকটায় না যাওয়াই ভালো।
স্বর্গদ্বারের কাছে কী দেখবেন যে তালিকাটি উল্লেখ করা হল সেগুলি ছাড়াও পুরীতে আরও কয়েকটি আশ্রম বা মঠের পাশাপাশি রয়েছে বহু এমন দর্শনীয় স্থান যেগুলি মূলত জগন্নাথ মন্দিরের আশে পাশে অবস্থিত।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৩
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান