বাংলায় শক্তিপূজার চল বহু প্রাচীন। মোট ৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে ১৪টি শক্তিপীঠ। উজানির মঙ্গলচণ্ডী মন্দির সেই রকমই একটি শক্তিপীঠ। শক্তিপীঠ হওয়ার দরুন মন্দিরটি স্থানীয়দের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। মূলত বর্ধমান ও সংলগ্ন অঞ্চল থেকে একদিনের জন্য পর্যটকেরা এখানে ঘুরতে যান। শুধু বর্ধমান থেকেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জায়গা থেকেও এখানে পর্যটকেরা ঘুরতে যান। মন্দিরের কাছেই রয়েছে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি, যা বাঙালির কাছে একটি আকর্ষণীয় জায়গা।
উজানির মঙ্গলচণ্ডী মন্দির পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কোগ্রামে অজয় নদের পাড়ে অবস্থিত। বর্ধমান শহর থেকে মন্দিরটির দূরত্ব ৩৮ কিলোমিটার।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সেই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহখন্ড থেকে মাতা সতীর বাঁ হাতের কনুই পড়ে কোগ্রামের উজানিতে।
প্রচলিত কাহিনী অনুসারে মর্ত্যে মা মঙ্গলচন্ডীর পূজা প্রচারের জন্য অভিশাপগ্রস্থ স্বর্গের অপ্সরা খুল্লনা রূপে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। ধনপতি সওদাগর খুল্লনাকে বিয়ে করে। কিন্তু শিবভক্ত সওদাগর মঙ্গলচন্ডীর পূজা করত না। একবার বাণিজ্যে বেরোবার আগে তিনি মায়ের ঘটে লাথি মেরে বাণিজ্যে গিয়েছিল। দেবীর আক্রোশে সে আর উজানি নগরে ফিরে আসেনি। খুল্লনা মা মঙ্গলচন্ডীকে পূজায় সন্তুষ্ট করে তার স্বামীর ফিরে আসবার জন্য প্রার্থনা করে। অনেক বছর পর সওদাগর ফিরে আসে। বলা হয় সেই থেকে মঙ্গলচণ্ডীর পূজা হয়ে আসছে।
এই মন্দিরে সারা বছর ধরে ভক্তদের ভিড় হয়। বিভিন্ন পূজায় মন্দিরে বিভিন্ন মেলা বসে। কোগ্রামের অন্যতম বিখ্যাত উৎসব হচ্ছে উজানির মেলা। “মনসা মঙ্গল” কাব্য থেকে জানা যায়, উজানিনগরের রাজা তাঁর প্রজাদের মকরসংক্রান্তির স্নানের জন্য কোগ্রামে অজয় নদের চরকে বেছে নিয়েছিলেন। সেই থেকে প্রতি বছর পয়লা মাঘে অজয় নদের চরে উজানির মেলা বসে। এছাড়াও দুর্গাপূজার সময়েও এখানে মেলা বসে। সেই সময়ে প্রচুর মানুষ এখানে পূজা দিতে আসে। তাছাড়া জ্যৈষ্ঠ মাসের জয় মঙ্গলবার এবং দোল পূর্ণিমার দিনেও মঙ্গলচণ্ডীর বিশেষ পূজায় ভিড় হয় মন্দিরে।
ট্রেনে যেতে হলে বর্ধমান স্টেশন থেকে গুসকরা স্টেশনের ট্রেন নিতে হবে। প্রতি দেড় ঘণ্টা অন্তর বর্ধমান স্টেশন থেকে গুসকরা স্টেশনের জন্য ট্রেন ছাড়ে। গুসকরা স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে মন্দিরে যেতে হবে। বাসে যেতে হলে বর্ধমান থেকে নতুনহাট বাস স্ট্যান্ড অবধি যেতে হবে। তারপর টোটো ভাড়া করে মন্দিরে যেতে হবে। নিজের গাড়ি হলে বর্ধমান থেকে জাতীয় সড়ক ১১৬এ হয়ে নতুনহাট বাস স্ট্যান্ড যেতে হবে, তারপর নতুনহাট গুসকরা রোড দিয়ে উজানির মঙ্গলচণ্ডী মন্দির যাওয়া যাবে। বর্ধমান থেকে এর দূরত্ব ৩৮ কিলোমিটার।
এখানে থাকবার জন্য সেই রকম কোন হোটেলের ব্যবস্থা নেই। সাধারণত আশপাশের অঞ্চল থেকে মানুষেরা একদিনের জন্য এখানে ভ্রমণ করতে যান।
এখানে দ্রষ্টব্যের মধ্যে পড়ে উজানির মঙ্গলচণ্ডী মন্দির এবং কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি।

উজানির মঙ্গলচণ্ডী মন্দির – মূল মন্দিরটিতে প্রথমে একটি বারান্দা আছে, যার ভিতরে আয়তাকার গর্ভগৃহ রয়েছে। এই গর্ভগৃহের মধ্যে মা মঙ্গলচণ্ডীর ছোটো কালো পাথরের দশভূজা মূর্তি রয়েছে। মূল মন্দিরের সামনে একটি ছোট নাটমন্দির রয়েছে। সারা মন্দিরটি হলুদ রঙের এবং এর ওপর লাল রঙে মন্দিরের নাম খোদাই করা রয়েছে।
প্রত্যেকটি শক্তিপীঠে দেবী এবং ভৈরব অধিষ্ঠিত থাকেন। এই পীঠে দেবীর নাম মঙ্গলচন্ডী। দেবীর ভৈরব উঁচু কালো রঙের পাথরের একটি শিবলিঙ্গ। নাম কপিলাম্বর। অনেকে কপিলেশ্বর বলেও উল্লেখ করেন। শিবলিঙ্গের সামনে নন্দীর কালো পাথরের একটি ছোট মূর্তি আছে। শুধু তাই নয়, ভৈরবের বাঁদিকে একটি বজ্রাসন বুদ্ধমূর্তিও আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এই মূর্তিটি পাল যুগের। মন্দির চত্বরে গাছে ঢাকা সুন্দর পরিবেশ। মন্দির সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১টা এবং দুপুর ৩টে থেকে সন্ধে ৭টা অবধি খোলা থাকে।

কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি – মন্দির থেকে পায়ে হাঁটা দুরত্বে রয়েছে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি। পুরনো এই বাড়িটি এখনও সযত্নে রক্ষিত আছে। বাড়িটির নাম মধুকর। এই বাড়ির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে অজয় ও কুনুর নদী। কবি এখানে বসে লিখেছেন তাঁর অনেক কবিতা। শক্তিপীঠ দর্শনের পর কবির বাড়ি দর্শন এই ভ্রমণে এক অন্য মাত্রা দেবে।
এই মন্দিরে সারা বছর ধরেই যাওয়া যায়। যদি পূজায় বা মেলায় যেতে চান তাহলে প্রতি বছর পয়লা মাঘে উজানির মেলা বা দুর্গাপূজার মেলায় যেতে পারেন। তাছাড়া জ্যৈষ্ঠ মাসের জয় মঙ্গলবারে মঙ্গলচণ্ডীর বিশেষ পূজা হয় মন্দিরে। সেই সময়েও মন্দির দর্শনে যেতে পারেন। তবে বিশেষ পূজা দেওয়ার ব্যাপার না থাকলে বছরের অন্য সময় ফাঁকায় মন্দিরে যেতে পারেন। শুধু মনে রাখবেন শনি এবং মঙ্গলবারে এখানে ভিড় বেশি হয়।
ট্রিপ টিপস
- কীভাবে যাবেন – ট্রেনে যেতে হলে বর্ধমান স্টেশন থেকে গুসকরা স্টেশনের ট্রেন নিতে হবে। গুসকরা স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে মন্দিরে যেতে হবে। বাসে যেতে হলে বর্ধমান থেকে নতুনহাট বাস স্ট্যান্ড অবধি যেতে হবে। তারপর টোটো ভাড়া করে মন্দিরে যেতে হবে। নিজের গাড়ি হলে বর্ধমান থেকে সরাসরি উজানির মঙ্গলচণ্ডী মন্দির যাওয়া যাবে। বর্ধমান থেকে এর দূরত্ব ৩৮ কিলোমিটার।
- কোথায় থাকবেন – এখানে থাকবার জন্য সেই রকম কোন হোটেলের ব্যবস্থা নেই। সাধারণত আশপাশের অঞ্চল থেকে মানুষেরা একদিনের জন্য এখানে ভ্রমণ করতে যান।
- কী দেখবেন – এখানে দ্রষ্টব্যের মধ্যে পড়ে উজানির মঙ্গলচণ্ডী মন্দির এবং কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি।
- কখন যাবেন – এই মন্দিরে সারা বছর যাওয়া যায়। মন্দির সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১টা এবং দুপুর ৩টে থেকে সন্ধে ৭টা অবধি খোলা থাকে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৩
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- একান্ন পীঠ, হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়, দীপ প্রকাশন, পৃষ্ঠা ২৪২-২৪৪, উজ্জয়িনীতে মঙ্গলচণ্ডিকা
- https://bengali.indianexpress.com/
- https://www.aajbangla.in/


আপনার মতামত জানান