ইতিহাস

রাজেন্দ্র লাহিড়ী

ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে কাকোরিতে ট্রেনের মধ্যে টাকা লুটের পরিকল্পনা করেছিলেন বিপ্লবী রাজেন্দ্র লাহিড়ী (Rajendra Lahiri)। দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলার আড়ালেও তাঁর পরিকল্পনা সক্রিয় ছিল। হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য রাজেন্দ্র লাহিড়ী ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। উত্তরপ্রদেশের গোণ্ডা জেলে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

১৯০১ সালের ২৯ জুন অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলার মোহনপুর গ্রামে রাজেন্দ্র লাহিড়ীর জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী। তাঁর বাবার নাম ক্ষিতিমোহন লাহিড়ী এবং মায়ের নাম বসন্তকুমারী দেবী। তাঁর জন্মের সময় তাঁর বাবা ক্ষিতিমোহন নিষিদ্ধ অনুশীলন সমিতির কর্মকান্ডে জড়িত থাকার দরুণ বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে কারাবাসে ছিলেন। মাত্র নয় বছর বয়সেই তাঁর বাবার অনুপ্রেরণায় রাজেন্দ্র লাহিড়ীর মনে দেশাত্মবোধ জাগরিত হয়। ঐ বয়সে তিনি তাঁর মামারবাড়ি বারাণসীতে চলে যান।

বারাণসীতেতেই রাজেন্দ্র লাহিড়ীর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। পরবর্তীকালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হন রাজেন্দ্র লাহিড়ী। এই সময়েই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে বিখ্যাত বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যালের। রাজেন্দ্রনাথের মনে জাগ্রত দেশপ্রেম, যৌবনদীপ্ত আবেগ, প্রাণশক্তি এবং বৈপ্লবিক চিন্তাধারা লক্ষ্য করে শচীন্দ্রনাথ সান্যাল তাঁকে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত করেন। একইসঙ্গে অনুশীলন সমিতির বারাণসী শাখার কো-অর্ডিনেটর এবং অস্ত্র-রক্ষক পদে নিযুক্ত হন রাজেন্দ্রনাথ। ভারতের স্বাধীনতার আগে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর উৎসাহ দেখে হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের গুপ্ত সভা ও আলোচনাগুলিতে তাঁকে ডাকা হত। বাংলা সাহিত্য পাঠের প্রতি গভীর আগ্রহের কারণে তিনি নিজেই তাঁর মা বসন্তকুমারীর নামে একটি ছোটো গ্রন্থাগার স্থাপন করেন। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত বেঙ্গলি সাহিত্য পরিষদের দায়িত্বে ছিলেন রাজেন্দ্রনাথ। কাশীতে তিনিই সমস্ত বিপ্লবীদের হাতে লেখা চিঠি সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলিকে সযত্নে গুছিয়ে রাখতেন। তাঁর এই কাজের উদ্দেশ্য ছিল বেনারসের বিপ্লবীরাও যাতে তাঁদের হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমে নিজেদের মনোভাব ব্যক্ত করতে পারেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


কাকোরি ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করার সময়ে রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী অন্যতম মুখ্য পরামর্শদাতা ছিলেন। আসফাকুল্লাহ্‌ খান এই পরিকল্পনা বিষয়ে প্রথমে যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন না এবং তাঁর মতে এই পরিকল্পনা সফল না হলে ভারতের গুপ্ত বিপ্লবী অভ্যুত্থান সম্পর্কে পুলিশি সতর্কতা আরো বেড়ে যেতে পারে। ফলে তখন রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ীই আসফাকুল্লাহ্‌কে বুঝিয়ে পরিকল্পনা ভালোমতো ব্যাখ্যা করে আরেকবার ভাবার জন্য বলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজেন্দ্রনাথই কাকোরি স্টেশনে ট্রেনকে চেন টেনে দাঁড় করান। দিনটা ছিল ১৯২৫ সালে ৯ আগস্ট। চেন টানা মাত্রই বিসমিলকে নির্দেশ দেন রাজেন্দ্রনাথ এবং সেই নির্দেশমাফিক আসফাকুল্লাহ্‌, চন্দ্রশেখর আজাদ এবং আরো দশজন বিপ্লবী টাকা ভর্তি সেই ব্যাগ ডাকাতি করেন। কাকোরির এই ঘটনার পরে বিসমিল রাজেন্দ্র লাহিড়ীকে বাংলায় পাঠান বোমা তৈরি শিখে আসার জন্য। রাজেন্দ্র বোমা তৈরি শিখতে দক্ষিণেশ্বরে আসেন। মনে রাখতে হবে, এই দক্ষিণেশ্বরের অনাকাঙ্ক্ষিত বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে যায়। রাজেন্দ্র যখন বোমা তৈরির সমস্ত সরঞ্জাম একত্র করছিলেন, তখন অন্য সহকারীদের অমনোযোগে এবং অসতর্কতায় একটা বোমা ফেটে যায়। সেই বিস্ফোরণের প্রবল শব্দে পুলিশ সতর্ক হয়ে যায় এবং নয়জন বিপ্লবী সহ রাজেন্দ্রকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর দশ বছরের কারাবাস ঘোষিত হয়। সেইসঙ্গে পুলিশ রাজেন্দ্র লাহিড়ী এবং অন্যান্য বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং কাকোরিতে ট্রেন-ডাকাতির বিরুদ্ধে সকল বিপ্লবীকে অভিযুক্ত করে ব্রিটিশ সরকার। বানানো তথ্যপ্রমাণ এবং মিথ্যে সাক্ষী সাজিয়ে তাদের সকলকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। রাজেন্দ্রনাথকে লক্ষ্ণৌতে নিয়ে আসা হয় এবং কারাবন্দি করা হয় তাঁকে।

বহু আবেদন, বহু সওয়াল-জবাবের পরেও ব্রিটিশ সরকার তাঁদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই রাজেন্দ্র লাহিড়ী, আসফাকুল্লাহ্‌ খান, বিসমিল এবং রোশান সিংহকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অন্যান্যদের ফাঁসির দিন স্থিরীকৃত হয় ১৯ ডিসেম্বর, কিন্তু তার দুই দিন আগেই অর্থাৎ ১৯২৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের গোণ্ডা জেলে রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ীকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসির দিন সকালে অভ্যাসবশতই ব্যায়াম করছিলেন রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী। জেলার সাহেব যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন যে জীবনের শেষ দিনেও কেন তিনি এতটুকু বিচলিত নন, তার উত্তরে রাজেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, হিন্দু হওয়ার কারণে পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেন তিনি এবং পরের জন্মে তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম হয়েই জন্ম নিতে চান। তিনি চান পরের জন্মে যেন তাঁর সব অসমাপ্ত কাজ তিনি সমাধা করতে পারেন। ফলে এই ফাঁসির দিনটাই তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই মৃত্যুই শেষ কথা নয়, বরং মুক্ত, স্বাধীন ভারতের বুকে তিনি আরেকবার জন্ম নেবেন এই বিশ্বাস তাঁর আছে। রাজেন্দ্রনাথের এই উক্তিতে ব্রিটিশ জেলার সাহেব আশ্চর্য হয়েছিলেন। ফাঁসির দড়িকে চুম্বন করে তাকে মালার মতো গলায় পরে নেন রাজেন্দ্রনাথ। মৃত্যুর আগে বন্দেমাতরম ধ্বনিতে জয়গান গেয়ে ওঠেন তিনি।

১৯২৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর গোণ্ডা জেলে রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর ফাঁসি হয়।

প্রতি বছর রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর মৃত্যুদিনে ১৭ ডিসেম্বর তারিখে সমগ্র গোণ্ডা জেলা জুড়ে পালিত হয় ‘লাহিড়ী দিবস’। তাঁর স্মৃতিতে একটি স্মারক মূর্তি স্থাপিত হয়েছে গোণ্ডা জেলায়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও