ধর্ম

বাগবাজারের পুজো

বাগবাজারের পুজো

বাগবাজারের পুজো মানেই বাগবাজার সার্বজনীন ক্লাবের সুপ্রাচীন সাবেকি দেবীর আরাধনা। কলকাতার প্রাচীন সার্বজনীন পুজোর মধ্যে বাগবাজার আর কুমোরটুলীই আদিতম। সে অনেক কাল আগের কথা। প্রথমে জমিদারবাড়ির সাবেক বনেদী দুর্গাপুজোর আনন্দেই কলকাতা মেতে উঠতো শরতের আগমনে। বড়ো বড়ো জমিদাররা, ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রাসাদোপম বাড়ির ঠাকুরদালানে দেবীর আরাধনা করতেন। সে ছিল এক এলাহি ব্যাপার! সাধারণ মানুষের তাতে প্রবেশাধিকার ছিল না। কে কত জাঁক করলো পুজোয় তা নিয়ে পরস্পরের মধ্যে চলতো এক অদৃশ্য লড়াই। ক্রমেই সামন্ত-প্রথা লুপ্ত হল, জমিদারবাড়ির জৌলুসের প্রদীপ নিভতে থাকলো। এই সময়পর্বেই বারোয়ারি পুজো শুরু। বারো জন বন্ধু মিলে শুরু করে দিল প্রথম বারো-ইয়ারি পুজো। তাতেও হল না। দেবীর আরাধনা ক্রমেই নেমে এলো ‘সবহারাদের মাঝে’ – যে সাধারণ মানুষ এতদিন জমিদারবাড়ির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতো দেবীর পূজা, এবারে তারাই সমভিব্যাহারে চাঁদা দিয়ে কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এক মাইলফলক তৈরি করে দিল। ১৯১০ সালে প্রথম শুরু হয়েছিল বারোয়ারি দুর্গাপুজো। আর তাঁর কিছুকাল পরেই ১৯১৯ সালে শুরু হয় বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব। অভাবিতভাবে যে পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নাম, জড়িয়ে আছে বহু বিপ্লবীর অংশগ্রহণের ইতিহাসও। চলুন জেনে নেওয়া যাক বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজোর অন্দরের কথা।

বাগবাজারের দেবীমূর্তির অমন মোহনীয় ডাকের সাজ, সাবেকি একচালার মুন্সিয়ানা আর দেবীর বরাভয়দাত্রী দুই চোখ না দেখলে যেন কোনো বাঙালিরই পুজো দেখা সম্পূর্ণ হয় না। অনেকে বাগবাজারের পুজো না দেখে অন্যান্য জায়গার পুজো দেখতেই চান না। কী মায়া, কী ছায়া গো…. গানের রেশ ধরে প্রশ্ন জাগে কী মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে এই বাগবাজারের পুজোয়? শোনা যায়, সেকালের বড়ো বড়ো জমিদারবাড়ির পুজোতে ভোগ খাওয়ানো হতো; যদিও তা সেবাধর্মে নয়, দেখনদারিত্বে। একবার এক জমিদারবাড়িতে এরকমই ভোগ খেতে গিয়ে ভোগ না পেয়ে এবং অপমানিত হয়ে কয়েকজন সাধারণ কলকাতাবাসী একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে তারা নিজেরাই একসাথে মিলে দেবীর আরাধনা করবেন। ১৯১৮ সালে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পরের বছরই ১৯১৯ সালে পুজো শুরু হয়ে যায় – কলকাতার প্রথম সার্বজনীন দুর্গাপুজো। যদিও প্রথমে সেই পুজো হয়েছিল নেবুবাগানে আর সেই কারণে পুজোর নাম হয় ‘নেবুবাগান বারোয়ারী দুর্গোৎসব’। নেবুবাগান লেন ও বাগবাজার স্ট্রিটের মোড়ে প্রথম পুজো হলেও ১৯২৪ সালে তা সরে গিয়ে বাগবাজার স্ট্রিট আর পশুপতি বোস লেনের মোড়ে হতে শুরু করে। তারপরে যদিও আরো স্থান পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে একবার বাগবাজার কালীমন্দিরেও দুর্গাপুজো করেছিলেন এলাকার সাধারণ মানুষ। অনেক পরে ১৯২৬ সালে এই পুজোর নাম পরিবর্তিত হয় বাগবাজার সার্বজনীনে আর ১৯৩০ সালে সলিসিটর দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাক্ষিণ্যে এই পুজো প্রথম নিবন্ধীকৃত হয়। বাগবাজার সার্বজনীন পুজোয় তাঁর অবদানও ছিল অনেক। তিনিই প্রথম পূজার পাশাপাশি একটি প্রদর্শনী আয়োজন করেছিলেন যেখানে বিভিন্ন স্বদেশি-শিল্পের পণ্য বিক্রি করা হতো। মনে রাখতে হবে, সে সময় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে আগে থেকেই স্বদেশিয়ানার জোয়ার এসেছিল। স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মাতৃ আরাধনার পাশাপাশি স্বদেশি বার্তা প্রচারই ছিল দুর্গাচরণের উদ্দেশ্য। চিত্তরঞ্জন দাশ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘মুকুটহীন রাজা’ বলে সম্বোধন করতেন। দেশ জুড়ে স্বদেশি শিল্পের প্রচার ও প্রসারে তাঁর প্রভূত ভূমিকা ছিল। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত এই বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজোর সভাপতি ছিলেন দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তিনিই নন, আরো বহু বিখ্যাত বাঙালির নাম জড়িয়ে আছে এই পুজোর সভাপতি হিসেবে। দুর্গাচরণের পরে সভাপতিত্ব করেছিলেন হরিশঙ্কর পাল। কলকাতা কর্পোরেশনে চব্বিশবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। সে সময় কলকাতার মেয়র কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশ। অভাবিতভাবে বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজোর সভাপতির পদে আসীন হন স্বয়ং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। সময়টা তখন ১৯৩৮ সাল। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সভাপতিত্ব করেছিলেন নেতাজী স্বয়ং। তাঁর পরে সাংবাদিক-সম্পাদক কুমার বিশ্বনাথ রায় সভাপতি হন ১৯৪০ সালে। শোনা যায় এই বাগবাজারের পুজোতে সভাপতি ছিলেন সারদাচরণ দাশও। রসগোল্লার সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিখ্যাত দুই প্রবাদপ্রতিম বাঙালি নবীনচন্দ্র দাশ এবং কৃষ্ণচন্দ্র দাশের উত্তরসূরি হিসেবে বিখ্যাত সারদাচরণের হাত ধরেই রসগোল্লা আধুনিক রূপ পায় আর তা ঘটে এই বাগবাজারের পুজোকে কেন্দ্র করেই। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সভাপতি থাকাকালীন পুজোর ভোগের মিষ্টি নিজ দায়িত্বে তৈরি করতেন সারদাচরণ। বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে বহু গুণীজনের পদচারণা ঘটেছে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আশাপূর্ণা দেবী, বালক ব্রহ্মচারী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিকাশ রায় তালিকা শেষ হবে না।

এমনই ঐতিহ্যমণ্ডিত পুজোর মাতৃমূর্তি অতসী রঙে রঞ্জিত, সবুজ বর্ণের অসুর রয়েছে ঐ একচালাতেই। ডাকের সাজের এমন মাধুর্য্যপূর্ণ প্রকাশ কলকাতার আর কোথাও বিশেষ দেখা যায় না। আর এই অসামান্য সুন্দর প্রতিমা গড়ার কারিগর কুমোরটুলির জিতেন পাল এবং তাঁর দুই পুত্র কার্তিকচন্দ্র আর সাধনচন্দ্র। সবথেকে বেশি নজর কাড়ে প্রতিমার শিখরচুম্বী মুকুট। প্রায় আট ফুট উঁচু এই মুকুট নির্মাণ করতেন কৃষ্ণনগরের বাচ্চু মুখার্জি। বাগবাজারের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বীর বিপ্লবীদের আত্মোৎসর্গের এক বিশেষ ব্রতের ইতিহাস। জাতীয়তাবোধে দৃপ্ত বাঙালি সন্তানেরা স্বাধীনতার প্রাক্কালে এই বাগবাজারের পুজোতেই অষ্টমীর দিন মিলিত হতো ‘বীরাষ্টমী ব্রত’-এ, নেতাজীই ছিলেন এই ব্রতের উদ্‌গাতা। স্বাদেশিকতা আর জাতীয়তাবাদে দৃপ্ত বাংলায় সে সময় এই বীরাষ্টমী ব্রতে বাগবাজারের পুজোর মাঠে চলতো লাঠি খেলা, কুস্তি, ছুরি খেলা যা বাঙালির সাহসিকতাকে উজ্জীবিত করে তুলতো। শোনা যায় ব্রিটিশ পুলিশ এই সময় পুজোমণ্ডপের আশেপাশে টহল দিতো কারণ তাদের সন্দেহ ছিল এই বীরাষ্টমী ব্রতকে কেন্দ্র করে গুপ্ত বিপ্লবীরা অস্ত্র পাচার করতে পারেন। তবে সত্যই অনুশীলন সমিতির সদস্যরা সেই দিন এই সমাবেশে এসে হাজির হতেন, মিশে থাকতেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। বীরাষ্টমী ব্রতের ঐতিহ্য আজও সমানভাবে চলে আসছে বাগবাজার সার্বজনীনে। একদা সুভাষচন্দ্রের সংস্পর্শ লাভ করা এই পুজো কলকাতার বাঙালিদের কাছে গর্ব এবং লুপ্ত গৌরবের প্রতিভূ।

বিভিন্ন বনেদী বাড়ির পূজা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

হুদুড় দুর্গা কে?



ছবিতে ক্লিক করুন

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন