সরোজিনী নাইডু (Sarojini Naidu) একজন ভারতীয় মহিলা কবি, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাজনীতিক যিনি ভারতীয় ইতিহাসে বিখ্যাত ‘দ্য নাইটেঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া’ নামে। তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম ভারতীয় মহিলা সভাপতি এবং সংযুক্ত প্রদেশ(United Provinces, অধুনা উত্তর প্রদেশ)-এর প্রথম রাজ্যপাল।
১৮৭৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের হায়দ্রাবাদে এক হিন্দু বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে সরোজিনী নাইডুর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ডঃ অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম ডি.এসসি ও হায়দ্রাবাদের নিজাম কলেজের অধ্যক্ষ এবং তাঁর মা বরোদা সুন্দরী দেবী ছিলেন কবি। সরোজিনীর পৈত্রিক বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের ব্রাহ্মণগাঁওতে বর্তমানে যেটি বাংলাদেশে অবস্থিত। আট ভাইবোনের মধ্যে সরোজিনী নাইডু সবথেকে বড় ছিলেন। তাঁর ভাই বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন বিপ্লবী এবং আরেক ভাই হরিন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার এবং অভিনেতা। সবদিক থেকে তাঁদের পরিবার ছিল হায়দ্রাবাদের সম্মানীয় পরিবারগুলির মধ্যে অন্যতম। হরিন্দ্রনাথের স্ত্রী কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন উল্লেখযোগ্য নেত্রী। সরোজিনীর যখন উনিশ বছর বয়স তখন তাঁর বিয়ে হয় ডাঃ গোবিন্দরাজলু নাইডুর সাথে। ডাঃ গোবিন্দরাজলু জাতে অব্রাহ্মণ ছিলেন। সেই যুগে অসবর্ণ বিবাহের চল সমাজে খুব একটা না থাকলেও দুই পরিবারের সম্মতিক্রমে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের চারটি সন্তান হয়েছিল যথা – জয়সূর্য, পদ্মজা, রণধীর ও লীলামণি। কন্যা পদ্মজা পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হন।
সরোজিনী ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। মাত্র বারো বছর বয়সে তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মাঝে ১৮৯১ সাল থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত চার বছর পড়াশোনা বন্ধ রেখে তিনি নানা বিষয় অধ্যয়ন করেন। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি ছাড়াও তিনি উর্দু, পার্সি এবং তেলেগু ভাষা জানতেন। হায়দ্রাবাদের নিজাম তাঁর লেখা ‘মাহের মুন্নির’ নামক পার্সি নাটক পড়ে এত খুশি হন যে নিজাম চ্যারিটেবল ট্রাস্ট-এর পক্ষ থেকে প্রথমে ইংল্যান্ডের কিংস কলেজ ও তারপর কেমব্রিজের গারটন কলেজ থেকে তাঁর পড়াশুনা করার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে রাজী হয়ে যান।
১৯০৫ সালে সরোজিনী বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯১৫ সালে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস’-এ যোগ দেন। তিনি সমগ্র ভারতে সভা সমাবেশ করে নারী মুক্তি, শ্রমিক অধিকার রক্ষা ও জাতীয়তাবাদের সমর্থনে তাঁর বার্তা প্রচার করতে থাকেন। ১৯১৬ সালে তিনি বিহারে নীল চাষীদের অধিকারের দাবিতে প্রচার অভিযানে অংশ নেন। ১৯১৭ সালে নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে অ্যানি বেসান্তকে সভাপতি করে ‘উইমেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ গঠিত হলে সরোজিনী এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯১৯ সালে সরোজিনী নাইডু লন্ডন যাত্রা করেন ‘অল ইন্ডিয়া হোম রুল লিগ্’-এর সদস্যা হিসেবে। ১৯২০ সালে ভারতে ফিরে এসে তিনি গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব আফ্রিকান ভারতীয় কংগ্রেসে যে দুজন কংগ্রেস দলীয় প্রতিনিধি অংশ নেন, সরোজিনী নাইডু ছিলেন তাঁর মধ্যে একজন। ১৯২৫ সালে তিনি কানপুরে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯২৬ সালে ‘অল ইন্ডিয়া উইমেন কনফারেন্স’ গঠিত হলে সরোজিনী এর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং নারী শিক্ষা অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি নিউ ইয়র্ক সফরকালীন আমেরিকায় প্রচলিত আফ্রো-আমেরিকান ও রেড ইন্ডিয়ানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা করেন। ভারতে ফেরার পর তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যা হিসেবে নির্বাচিত হন।
১৯৩০ সালের ৫ মে লবণ সতাগ্রহ চলাকালীন গান্ধীজীকে গ্রেফতারের কিছুদিনের মধ্যেই গ্রেফতার হন সরোজিনী নাইডু। ১৯৩১ সালের ৩১ জানুয়ারি গান্ধীজীর সঙ্গে সঙ্গে তাঁকেও মুক্তি দেওয়া হয়। সেই বছরেই আবার তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। অসুস্থতার কারণে অল্পদিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান সরোজিনী নাইডু। ১৯৪২ সালের ২ অক্টোবর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সরোজিনী নাইডুকে আবার গ্রেফতার করা হয়। এই সময় গান্ধীজীর সঙ্গে একুশ মাস কারারুদ্ধ ছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে ‘এশিয়ান রিলেশন্স কনফারেন্স’-এর স্টিয়ারিং কমিটিতে সভাপতিত্ব করেন তিনি। গান্ধীজীর সঙ্গে তাঁর এতটাই স্নেহের সম্পর্ক ছিল যে তিনি গান্ধীজিকে’ মিকি মাউস ‘বলে ডাকতেন আর গান্ধীজী তাঁকে ‘বুলবুল’ বলে ডাকতেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর স্বাধীন ভারতের সংযুক্ত প্রদেশ(United Provinces, অধুনা উত্তর প্রদেশ)-এর প্রথম মহিলা রাজ্যপাল হিসেবে সরোজিনী নাইডু নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় সংবিধান রচনার জন্য গঠিত গণপরিষদে সরোজিনী নাইডু বিহার থেকে নির্বাচিত হন। গণপরিষদের এক বৈঠকে তৎকালীন অস্থায়ী সভাপতি সচ্চিদানন্দ সিনহা সরোজিনীকে কবিতায় বক্তব্য রাখার জন্য ম আহ্বান জানালে উত্তরে সরোজিনী এক কাশ্মীরি কবির লেখা কয়েকটা লাইন আবৃত্তি করেছিলেন- ‘’বুলবুল কো গুল মুবারক, / গুল কো চারমান মুবারক, / রঙ্গিন তাইবিয়াতোঁ কো রঙ্গ-এ-সুখান মুবারক।”
ভারতবর্ষে তাঁর জন্মদিনটিকে ‘জাতীয় নারী দিবস‘ হিসেবে উদযাপন করা হয়ে থাকে। কেবল রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য নয় সরোজিনী নাইডু স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্যও। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল – ‘দ্য লেডি অব দ্য লেক (The Lady of the Lake)’, ‘দ্য গোল্ডেন থ্রেসহোল্ড(The Golden Threshold)’, ‘ইন দি বাজারস অব হায়দ্রাবাদ (In the Bazaars of Hyderabad)’ ইত্যাদি। সরোজিনী কেমব্রিজে পড়াকালীন ইংরেজ কবি এডমন্ড গোসেস, আর্থার সাইমনস এবং ডব্লু.বি.ইয়েটস-এর কবিতার ভক্ত ছিলেন। লেখা কবিতা বিখ্যাত ব্রিটিশ পিরিয়ডিক্যাল ‘স্যাভয় ‘ তেও প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯০৮ সালে হায়দ্রাবাদে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদক প্রদান করেন যেটি তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ফেরত দিয়ে দেন।
১৯৪৯ সালের ২ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লখনউতে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৯০ সালে পালোমার অবজারভেটরিতে এলিনর হেলিনের দ্বারা আবিষ্কৃত গ্রহাণু ৫৬৪৭ এর নামকরণ সরোজিনী নাইডুর নামে করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান