বাঙালির হাতের কাছের হিল স্টেশন হল দার্জিলিং (Darjeeling)। সুযোগ পেলেই বাঙালি ঘুরতে চলে যায় সেখানে। কথাতেই আছে, বাঙালির ঘোরার তিনটে জায়গা হল দীপুদা, অর্থাৎ দীঘা, পুরী আর দার্জিলিং। দার্জিলিংকে বলা হয় “পাহাড়ের রানী” (Queen of the Hills)। পাহাড়ি এলাকার মনোরম পরিবেশ, কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ, দারুণ চা-এর স্বাদ, ট্রয় ট্রেন সব মিলিয়ে দার্জিলিং এক অন্য স্বাদে ভরা। দার্জিলিং শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। দার্জিলিং ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সুন্দর করতে দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থানগুলো (Places to Visit in Darjeeling) সবকটা ঘুরে দেখুন। দার্জিলিং-এ কী দেখবেন সেই স্থানগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত যে স্থানগুলো পায়ে হেঁটে ঘুরতে পারেন এবং দ্বিতীয়ত যে স্থানগুলো গাড়ি নিয়ে ঘুরতে হয়। দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থানগুলোর বর্ণনা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হল।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – পায়ে হেঁটে কী দেখবেন
দার্জিলিং এ কয়েকটি জায়গা পায়ে হেঁটে ঘুরতে হয়। সেখানে গাড়ি প্রবেশের জায়গা নেই বা হোটেল অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় পায়ে হেঁটেই এই জায়গাগুলোতে যাওয়া যায়। জায়গাগুলো নীচে দেওয়া হল –
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – চৌরাস্তা মল
দার্জিলিং এর প্রাণকেন্দ্র হল চৌরাস্তা মল অঞ্চল। দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান বলতে প্রথমেই বোধয় চৌরাস্তা মলের কথাই মাথায় আসবে। এখানে খোলা জায়গাটিতে মানুষের বসার জন্য ও দার্জিলিংকে উপভোগ করার জন্য খোলা মঞ্চ, চেয়ার এবং বেঞ্চি বানানো আছে। মাঝে মাঝেই বিশেষ দিন উপলক্ষে কোনও না কোনও অনুষ্ঠান হয় সেখানে। মঞ্চের সামনে রয়েছে বিখ্যাত নেপালি কবি ভানুভক্ত আচার্যের সোনালী মূর্তি।

মল অঞ্চলে চা হাতে নিয়ে বসে চারপাশে পুরনো স্থাপত্যের বিল্ডিং, কোনও অনুষ্ঠান বা কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ দেখতে দেখতে বা প্রিয়জনের সাথে গল্প করতে করতে সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের সকালে এখানের ভিউ অসাধারণ। এখানে স্থানীয় দোকানের পাশাপাশি, রেস্টুরেন্ট, গিফটের দোকান, বইয়ের দোকান, কিউরিও শপ, চায়ের দোকান ইত্যাদি রয়েছে। নেহেরু রোড থেকে চৌরাস্তা মলে ওঠবার মুখেই রয়েছে সুন্দর একটি ঝর্না। সকালে সেখানে পাখিদের কোলাহল এবং সন্ধেবেলায় রঙিন ঝর্না দেখতে খুবই ভাল লাগবে।
আরও পড়ুন: দার্জিলিং ভ্রমণ
চৌরাস্তা মলে চারটি রাস্তা এসে মিলেছে বলে একে চৌরাস্তা বলে। প্রথম রাস্তাটি হল নেহেরু রোড। এই রোডেই রয়েছে ট্যুরিস্টদের জন্য সমস্ত দোকান বা রেস্টুরেন্টগুলো। দ্বিতীয় রাস্তাটি ডক্টর জাকির হুসেইন রোড যেখানে রয়েছে স্থানীয় সব দোকান। তৃতীয় এবং চতুর্থ রাস্তাদুটো আসলে একটাই রাস্তা মল রোড যেটা চৌরাস্তা মলের একপ্রান্তে শুরু হয়ে গভর্নর হাউস থেকে বাঁক নিয়ে চৌরাস্তা মলের অন্যপ্রান্তে শেষ হয়েছে। এই মল রোড বরাবর হাঁটতে হাঁটতে কাঞ্চনজঙ্ঘার অনেকগুলো ভিউ পয়েন্ট পাওয়া যায়। যারা গভর্নর হাউসের কাছাকাছি হোটেলগুলোতে থাকবেন, তাঁদের জন্য এই মল রোডের ভিউ পয়েন্টগুলো খুবই কাছে এবং খুবই উপভোগ্যও হবে। রাত ৮টার পর চৌরাস্তার দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যায়।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বাড়ি
চৌরাস্তা মলের যে রাস্তাটা নীচে নেমে গিয়েছে ভুটিয়া বস্তির দিকে, সেই রাস্তা ধরে মিনিটখানেক এগোলেই রাস্তার বাম দিকে দেখা যাবে দেশবন্ধুর বাড়ি।

এই বাড়িতেই অসুস্থ দেশবন্ধুকে দেখতে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। বাড়িটির নীচতলায় একটি ঘরে একটি জাদুঘর আছে, যেখানে দেশবন্ধুর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং ছবি সংরক্ষিত করা আছে। তবে বর্তমানে বাড়ির দশা ভগ্নপ্রায়। এই বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল। তারপরই সরকার বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে এখানে সংরক্ষণের কাজ চলছে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – সেন্ট অ্যান্ড্রিউ চার্চ
চৌরাস্তা মলের বামদিকের মল রোড ধরে হেঁটে কিছুটা গেলে রাস্তার ওপরেই পড়বে দার্জিলিং-এর অন্যতম পুরনো স্থাপত্য সেন্ট অ্যান্ড্রিউ চার্চ। এই চার্চের দুর্দান্ত ক্লক টাওয়ার ব্রিটিশ স্থাপত্যের একটি চমৎকার উদাহরণ। এই ক্লক টাওয়ারের ঘণ্টা পুরো দার্জিলিং জুড়ে শুনতে পাওয়া যায়। ১৮৪৩ সালে এই চার্চ স্থাপিত হলেও ১৮৬৭ সালে বজ্রপাতের ফলে এর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৮৭৩ সালে চার্চটি পুনঃনির্মাণ করা হয়েছিল। এই চার্চের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বা গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় বস্তুটি হল লেফটেন্যান্ট জেনারেল জর্জ ডব্লিউ আইলমার লয়েডের সমাধিস্তম্ভ, যেটিকে ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে থেকে হেরিটেজ স্ট্রাকচার বলে ঘোষণা করা হয়েছে। চার্চটি বাইরে দেখে দেখা গেলেও রোজ ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। শুধুমাত্র রবিবার সকাল ৯টা থেকে ১১ টা অবধি সকলের জন্য এটি খোলা থাকে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – অবসার্ভেটরি হিল
চৌরাস্তা মলের ডানদিকের মল রোড দিয়ে একটু এগিয়ে উঁচুতে উঠবার জন্য পাথুরে সিঁড়ি রয়েছে। এই সিঁড়ি দিয়ে উঠে উপরে যে পাহাড়ি এলাকাটি রয়েছে, তাকে অবসার্ভেটরি হিল (Observatory Hill) বলা হয়। অবসার্ভেটরি হিলটির পাদদেশের চারদিক মল রোড দিয়ে ঘেরা। চৌরাস্তার ডানদিকের মল রোড দিয়ে যেমন এখানে ওঠা যায়, তেমনি চৌরাস্তার বামদিকের মল রোড ধরে অনেকটা এগিয়ে ঢালু পাহাড়ি রাস্তা দিয়েও এখানে ওঠা যায়। বর্তমানে এখানে কোনও অবসার্ভেটরি নেই, কিন্তু বেশ কিছু ভিউ পয়েন্ট আছে যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তবে এই দৃশ্য উপভোগ করতে অবশ্যই ভোরবেলা যেতে হবে এবং আকাশ পরিষ্কার থাকলে তবেই এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – মহাকাল মন্দির
অবসার্ভেটরি হিলের ওপরে অবস্থিত শতাব্দী প্রাচীন একটি মন্দির হল মহাকাল মন্দির। এই মন্দির হিন্দু দেবতা শিবের নামে হলেও মন্দিরটি হিন্দু এবং বৌদ্ধ উভয়েরই উপাসনা কেন্দ্র। এখানে হিন্দু এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির আশ্চর্য মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যায়। মন্দিরের প্রবেশের মুখেই লাল, নীল, সবুজ, হলুদ বিভিন্ন রঙের পতাকা দেখে অনেকেই একে বৌদ্ধ মঠ ভেবে ভুল করতে পারেন।

মন্দিরের মূল আরাধ্য হলেন ভগবান শিব বা মহাকাল এবং তিনটি সোনালী রঙের শিবলিঙ্গ এখানে পূজা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই শিবলিঙ্গগুলি পাহাড়ের চুড়ায় স্বয়ং প্রকট হয়েছিলেন, যা স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গের প্রতীক বলে মানা হয়। ভগবান শিবের পাশাপাশি এখানে বুদ্ধের মূর্তিও রয়েছে। সেই জন্য এখানে হিন্দু এবং বৌদ্ধ দুই পুরোহিতই দেখতে পাবেন। এখানে শিব ছাড়াও অন্যান্য হিন্দু দেবতাদেরও পূজা করা হয়। সমস্ত কিছু মিলিয়ে এক শান্ত, মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। তবে এখানে বাঁদরের প্রচুর আধিক্য, যদিও তারা দর্শনার্থীদের বিরক্ত করে না। তবুও নিজের ব্যাগ, ক্যামেরা, মোবাইল সাবধানে রাখাই শ্রেয়। মন্দির ভোরবেলায় খোলে এবং বিকেলে বন্ধ হয়ে যায়। মন্দিরে যেতে হলে সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে যাওয়াই সবচেয়ে ভাল।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – লয়েড বোটানিক্যাল গার্ডেন
চৌরাস্তা মল থেকে ১৫-২০ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথের দুরত্বে লয়েড বোটানিক্যাল গার্ডেন (Lloyd Botanical Garden) অবস্থিত। চাইলে দার্জিলিং ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি করেও এখানে যেতে পারেন। ভাড়া গাড়ি প্রতি ৩০০ টাকা। ১৮৭৮ সালে উইলিয়াম লয়েড বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরির জন্য ৪০ একর জমি দান করেন। তাই তাঁর নামেই বোটানিক্যাল গার্ডেনটির নামকরণ করা হয়েছে। এখানে অন্তত ২৫০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এখানে গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না এমন নয়, তবে মল অঞ্চলের কাছে হওয়ায় গাড়ি যেতে চায় না। সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৪টে অবধি এটি খোলা থাকে। আগে এখানে প্রবেশের জন্য কোনও মূল্য ছিল না। ২০১৮ সাল থেকে এখানে মাথাপিছু ২০ টাকা প্রবেশমূল্য নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: দার্জিলিং টয় ট্রেন ভ্রমণ
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – টয় ট্রেন
চৌরাস্তা মল থেকে ১৫-২০ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথের দুরত্বে দার্জিলিং স্টেশন অবস্থিত। চাইলে দার্জিলিং ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি করেও স্টেশনে যেতে পারেন। ভাড়া গাড়ি প্রতি ৩০০ টাকা। এখানে বিভিন্ন টয় ট্রেন, তার ইঞ্জিনগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন। স্টেশন থেকে চারপাশের অসাধারণ দৃশ্য পাবেন এবং চাইলে ছবিও তুলতে পারেন। এই স্টেশন থেকেই টয় ট্রেন জয় রাইড নেওয়া যায়।
টয় ট্রেনের পোশাকি নাম দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে বা ডিএইচআর। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ডিএইচআরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। জয় রাইডের ক্ষেত্রে টয় ট্রেন দার্জিলিং স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু হয়ে বাতাসিয়া লুপ এবং ভারতের সর্বোচ্চ রেলওয়ে স্টেশন ঘুম স্টেশন হয়ে আপনাকে আবার দার্জিলিং স্টেশনে নামিয়ে দেবে। সাধারণত দুই ধরনের টয় ট্রেন থাকে। বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের টয় ট্রেন এবং ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের টয় ট্রেন। স্টেশন থেকে টয় ট্রেনের টিকিট বুক করা গেলেও আগে থেকে বুক করে না এলে দার্জিলিং ঘুরতে এসে জয় রাইড পাওয়া মুস্কিল হয়ে পড়ে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – গাড়ি করে কী দেখবেন
উপরে উল্লিখিত জায়গাগুলোই শুধু পায়ে হেঁটে দেখা যায়। এছাড়াও দার্জিলিং-এ দেখার মত প্রচুর জায়গা রয়েছে। সেই জায়গাগুলো গাড়ি বুক করেই যেতে হয়। একদিনে সমস্ত জায়গা ঘোরাও যাবে না। কোনদিনে কোন জায়গাগুলো যেতে চান সেগুলো ট্রাভেল এজেন্ট বা গাড়িচালকের সাথে কথা বলুন। সেই অনুযায়ী আপনার গাড়ির মূল্য বাড়তে বা কমতে পারে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট
দার্জিলিং চৌরাস্তা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট হল দার্জিলিং শহরের দ্বিতীয় প্রাচীনতম চা বাগান। ৪৪০ একর জুড়ে রয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে বাগানটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। গাইড সহ এখানে ঘুরতে পারেন এবং অবশ্যই চা কিনতে পারেন। এখান থেকে চা বাগানের খুব সুন্দর ভিউ নেওয়া যায়, বিভিন্ন পোশাক পরে ছবি তুলতে পারবেন। পোশাকের চার্জ আলাদা। তবে এখানের সব জায়গায় ছবি তোলা যায় না। সেই ব্যাপারে অবশ্যই নজর দেবেন। যাবার রাস্তা বেশ খারাপ তাই যাবার আগে গাড়ির সাথে এছাড়াও এখানে অন্যান্য বেশ কিছু চা বাগান আছে যেখানে যেতে পারেন। কোন চা বাগান পর্যটকদের জন্য খোলা সেই ব্যাপারে গাইডের সাথে কথা বলে নেওয়া বেশি ভাল। তবে যেখানেই যান না কেন, চা পাতা তুলে দেখবার কোন প্রয়োজন নেই।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – দার্জিলিং চিড়িয়াখানা
দার্জিলিং চৌরাস্তা থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দার্জিলিং চিড়িয়াখানার পোশাকি নাম পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক (Padmaja Naidu Himalayan Zoological Park)। ৬৭.৫ একর জায়গা জুড়ে থাকা এই পার্কটি হিমালয়ের প্রাণীজগতের ওপর গবেষণা করার জন্য ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধী, সরোজিনী নাইডুর কন্যা তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রথম এবং দীর্ঘতম মেয়াদসম্পন্ন মহিলা রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডুর নামে পার্কটির নামকরণ করেন।

এখানে স্নো লেপার্ড, রেড পাণ্ডা, ইয়াক, হিমালয়ের কালো ভাল্লুক, সাইবেরিয়ান টাইগার, তিব্বতি নেকড়ের মত বিরল প্রজাতির প্রাণীর দেখা পাওয়া যায়। এটি একমাত্র চিড়িয়াখানা যেখানে তিব্বতি নেকড়ের প্রজনন হয়েছে। এছাড়াও এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা যেখানে স্নো লেপার্ড এবং সাইবেরিয়ান টাইগারের প্রজনন হয়েছে। চিড়িয়াখানা ভালো করে ঘুরে দেখতে প্রায় তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লাগবে। ১১০ টাকা প্রবেশমূল্যের টিকিট কেটে এখানে প্রবেশ করতে হয়। এর মধ্যেই আছে বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম (Bengal Natural History museum)। বৃহস্পতিবার চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট
দার্জিলিং চিড়িয়াখানা থেকেই হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট (Himalayan Mountaineering Institute) যাবার পথ রয়েছে। এটি ভারতের প্রথম পর্বতারোহণ প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সেরা পর্বতারোহণ প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি হিসাবে স্বীকৃত। সেখানে তাদের মিউজিয়াম রয়েছে।
তাই পর্বতারোহণে আগ্রহী ট্যুরিস্টদের কাছে দার্জিলিং-এর অন্যতম একটি আকর্ষণ হল এটি, এখানে পাহাড়ে চড়ার জন্য তাঁরা প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। চিড়িয়াখানার টিকিটেই এখানে প্রবেশ করা যায়। তবে শো-এর জন্য আলাদা টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়াও রোপ ক্লাইম্বিং, ইনডোর ওয়াল ক্লাইম্বিং এইরকম এক্টিভিটি করতে আলাদা টিকিটের প্রয়োজন। মিউজিয়ামের জন্য আলাদা টিকিট নেই এবং এর ভেতরে পুরনো অনেক পার্বত্য অভিযানের বিবরণ থেকে শুরু করে সেই অভিযানে যাত্রীরা কী পোশাক পড়েছিল বা সঙ্গে কী জিনিস ছিল, দুর্গম পাহাড়ে প্রাপ্ত বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য জিনিস রয়েছে। মিউজিয়ামের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ।
আরও পড়ুন: দার্জিলিং চিড়িয়াখানা এবং হিমালয়ান ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং ভ্রমণ
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – তেনজিং রক এবং গোম্বু রক
হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট থেকে কিছুটা দূরে লেবং কার্ট রোডের দুই পাড়ে অবস্থিত দুটি বড় পাথর হল যথাক্রমে তেনজিং রক এবং গোম্বু রক। তেনজিং নোরগের নামে বিশাল তেনজিং রকটির নামকরণ করা হয়েছে এবং নাওয়াং গোম্বুর নামে গোম্বু রকটির নামকরণ করা হয়েছে। নাওয়াং গোম্বু তেনজিংয়ের ভাইপ ছিলেন এবং তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি দুবার এভারেস্টে উঠেছিলেন।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – দার্জিলিং রোপওয়ে
চৌরাস্তা মল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে রয়েছে দার্জিলিং রঙ্গিত ভ্যালি প্যাসেঞ্জার রোপওয়ে। এখানে রোপওয়েতে চড়তে পারেন। রোপওয়ে থেকে দার্জিলিংয়ের অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়। ২০০৩ সালে রোপওয়ে দুর্ঘটনায় চারজন পর্যটকের মৃত্যুর পর থেকে পরিষেবা বন্ধ ছিল। আবার সব ঠিক করে ২০১২ সাল থেকে পরিষেবা চালু হয়েছে। টিকিটমূল্য মাথাপিছু ২৬০ টাকা। তবে রোপওয়ে ওঠার আগে ১ থেকে ২ ঘণ্টা অবধি লাইনে অপেক্ষা করতে হতে পারে। কখনও কখনও আরও বেশি সময় লাগে। অনেকক্ষেত্রেই রোপওয়ে চড়তে গিয়ে অন্যান্য জায়গাগুলো ঘোরা হয় না।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – রঙ্গিত ভ্যালি টি এস্টেট
চৌরাস্তা মল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে রয়েছে দার্জিলিং রঙ্গিত ভ্যালি টি এস্টেট। রোপওয়ে থেকে এই জায়গার দারুণ ভিউ পাওয়া যায়। এখানে চা বাগান ঘুরে দেখতে পারেন, কিন্তু চা পাতা ছিঁড়লে জরিমানা হবে। টি এস্টেটের বাইরেই রয়েছে এই টি এস্টেটের অনেকগুলো চায়ের দোকান। সেখান থেকে চায়ের স্বাদ গ্রহণ করে চা কিনতে পারেন।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – পিস প্যাগোডা
চৌরাস্তা মল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে একটি ধবধবে সাদা বৌদ্ধ স্তূপ রয়েছে যা পিস প্যাগোডা বা শান্তিস্তুপ নামে পরিচিত।

জাপানি বৌদ্ধ নিপ্পোনজান ম্যাওহজি সংগঠন, শান্তি বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এইরকম শান্তিস্তুপ প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৭২ সালে নিপ্পোনজান-ম্যাওহজি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিচিদাত্সু ফুজি এই স্তুপের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই স্তুপটির উচ্চতা ২৮.৫ মিটার এবং এটি দার্জিলিংয়ের সর্বোচ্চ স্তুপ। এই স্তুপের চারপাশে চারটি চকচকে এবং সোনার পালিশ করা বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। এছাড়াও, স্তুপের দেয়ালে গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কাহিনী আটটি বেলেপাথরের প্লেটে খোদাই করা রয়েছে। সাদা ধবধবে এই স্তুপ থেকে দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ দেখে মনে এক অন্যরকম শান্তি মেলে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – জাপানি মন্দির
পিস পাগোডার পাশে একটি জাপানি মন্দির রয়েছে। এটির পোশাকি নাম নিপ্পোনজান ম্যাওহজি বৌদ্ধ মন্দির।

এখানে প্রতিষ্ঠাতা ফুজি গুরুজির ছবি এবং বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। জুতো খুলে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে বড় প্রার্থনাসভা দেখতে পাওয়া যায়। ভোরবেলা ৪ঃ৩০টে থেকে ৬ টা অবধি এবং বিকাল ৪ঃ৩০টে থেকে ৬ঃ৩০ টা অবধি এখানে প্রার্থনা হয়। সেই সময়ে পৌঁছতে পারলে যে কেউ প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে প্রার্থনার সময়ে ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ। অন্য সময়ে ছবি তোলায় কোন বাধা নেই।
আরও পড়ুন: দার্জিলিং এর সমস্ত দর্শনীয় স্থান
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – বাতাসিয়া লুপ ও ইকো গার্ডেন
চৌরাস্তা মল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে টয়ট্রেনের জন্য তৈরি একটি সর্পিল রেলপথ হল বাতাসিয়া লুপ। এই সর্পিল রেলপথটি দুর্দান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং এর একটি উদাহরণ। এটি ১৯১৯ সালে চালু হয়েছিল।

টয় ট্রেনের জয় রাইডে ১০ মিনিটের জন্য ট্রেন এখানে থামে। তবে ট্রেনে না চড়লেও এখানে আলাদাভাবে অবশ্যই যাওয়া উচিত। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৫০ টাকা। এখানের মনোরম পরিবেশ এবং বাগানটি খুব সুন্দর। বিভিন্ন ধরণের গাছের সমারোহ এখানে। এখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা সৈন্য়, যারা দেশের জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিল, তাদের সম্মান জানিয়ে একটি স্মৃতিসৌধ রয়েছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এই স্মৃতিসৌধের পেছনে কাঞ্চনজঙ্ঘার যে তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ দেখা যায়, সে এক অপরূপ দৃশ্য। এখানে ছবি তোলবার জন্য পাহাড়ি কাপড় ভাড়া পাওয়া যায়।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – ঘুম স্টেশন এবং মিউজিয়াম
চৌরাস্তা মল থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে ৭৪০৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ভারতের সর্বোচ্চ স্টেশন ঘুম। টয় ট্রেনের জয় রাইডে ২০ মিনিটের জন্য ট্রেন এখানে থামে। তবে ট্রেনে না চড়লেও এখানে আলাদাভাবে অবশ্যই যাওয়া উচিত।
স্টেশনের পাশেই আছে মিউজিয়াম যেখানে প্রবেশ মূল্য মাথা পিছু ২০ টাকা। সকাল ১০ টা থেকে বেলা ১ টা এবং দুপুর ২ টো থেকে বিকেল ৪ টে অবধি মিউজিয়াম খোলা থাকে। এখানে ব্রিটিশ আমলে ব্যবহৃত রেলগাড়ির যাবতীয় সরঞ্জাম, পুরনো আমলের টয় ট্রেনের দুষ্প্রাপ্য ছবি এবং সেই সময়ের টয় ট্রনের মডেল সাজানো রয়েছে। এগুলো দেখতে দেখতেই সময় কেটে যায়। স্টেশনের বেশ কিছু খাবারের দোকান রয়েছে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – রক গার্ডেন
দার্জিলিং চৌরাস্তা থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে রক গার্ডেন অবস্থিত। ঘুম স্টেশনের পূর্বে ডানদিকে মোড় নিয়ে রক গার্ডেন যাওয়া যায়। এখানে সুন্দর ফুলের বাগানের পাশাপাশি বিভিন্ন উচ্চতায় পাহাড়ের গা ঘেঁষে বসার স্থান তৈরি হয়েছে। সঙ্গে আছে সুন্দর ঝর্না। প্রতিটা মোড় পেরিয়ে যখন পার্কের নিচের দিকে তাকানো হয়, তখন এক অসাধারণ ভিউ দেখতে পাওয়া যায়। বাচ্চাদের জন্য তো বটেই, বড়দের জন্যও খুব আকর্ষণীয় এই রক গার্ডেন। তবে রক্ষণাবেক্ষণের কিঞ্চিৎ অভাবে এখানে বেশ কয়েকটি বেঞ্চি ভেঙ্গে গেছে। বসবার সময় তাই সাবধানে বসতে হবে। ওপরের দিকের রাস্তাগুলোও বেশ কিছু জায়গায় খুবই সাবধানে উঠতে হবে। এখানের প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – গঙ্গা মায়া পার্ক
রক গার্ডেন থেকে ৩ কিলোমিটার নিচে গঙ্গা মায়া পার্ক অবস্থিত। জিএনএলএফ প্রতিবাদে পুলিশের গুলিতে নিহত ব্যক্তির নামে এই পার্কের নামকরণ।

এখানে বোটিং ছাড়াও পর্যটকদের জন্য গোর্খা লোকনৃত্যের আয়োজন করা হয়। সবুজে ঘেরা এই পার্কটিতে বসে দার্জিলিং ঘোরার ক্লান্তি মিটিয়ে নিতে পারেন। ১৯৯৯ সালে পার্কটি তৈরি হয়েছিল। এখানে অনেক দোকানপাটের বিল্ডিং করা থাকলেও এখন সেগুলো বন্ধ। ভিতরে থাকবার জন্য সুন্দর একটি বিল্ডিং বানানো থাকলে সেটিরও ভগ্নদশা অবস্থা। সব মিলিয়ে পার্কটিতে এখন পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। এখানের প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ২০ টাকা। সাধারণত একদিনের ট্যুর প্যাকেজে এই জায়গাটি থাকে না। আপনাকে গাড়ির সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে হবে।
দার্জিলিং-এর দর্শনীয় স্থান – টাইগার হিল
চৌরাস্তা মল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টাইগার হিল থেকে বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাচ্ছাদিত শৃঙ্গের সৌন্দর্য দেখা দার্জিলিং-এর অন্যতম আকর্ষণ। তবে তার জন্য মোটামুটি রাত সাড়ে ৩টে থেকে ৪টের যেতে হবে টাইগার হিলে। নাহলে প্রচুর ভিড়ে জায়গা পাবেন না। সূর্যোদয়ের সময়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ যে আগুনের রূপ নেয়, তা লিখে বোঝানো মুস্কিল। বেশ কিছুক্ষণ এখানে থাকতে ইচ্ছে হবে। সময় কখন বেরিয়ে যাবে বুঝতেও পারবেন না। কিছুক্ষণ পর সকালবেলায় কাঞ্চনজঙ্ঘার শৃঙ্গের রঙ দেখবেন কেমন বদলে গেছে। তখন সেটা ধবধবে সাদা।

টাইগার হিলে শীতের জামাকাপড় বেশি করে পড়বেন। উচ্চতার কারণে এখানে প্রচুর ঠাণ্ডা থাকে। টাইগার হিলে মূলত কাঞ্চনজঙ্ঘার দারুণ ভিউ দেখতে পাওয়ার জন্য মানুষ যায়। তবে যেদিন টাইগার হিলে যাওয়ার প্ল্যান করবেন সেদিন বেশ কয়েকটি অন্য জায়গা নাও দেখতে পারেন। কারণ চৌরাস্তা মল থেকে এটি যেদিকে অবস্থিত সেইদিকে অন্য ভিউ পয়েন্টগুলো নেই। তাই যেতে আসতে খানিকটা সময় লাগবে। কিছু সময় আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে মাউন্ট এভারেস্ট ও দেখা যায়।
এ ছাড়াও দার্জিলিং-এ দেখার মধ্যে রয়েছে প্রচুর মনাস্ট্রি যেমন ডালি মনাস্ট্রি, ঘুম মনাস্ট্রি, ভুটিয়া বস্তি মনাস্ট্রি, আলু বাড়ি মনাস্ট্রি ইত্যাদি ইত্যাদি। মনাস্ট্রি ছাড়া দার্জিলিং ভ্রমণ অসম্পূর্ণ। আর এতো গেল দার্জিলিং-এ কী দেখবেন । দার্জিলিং-এর আশেপাশে সিটং, তিনচুলে, লামাহাট্টা, বিজনবাড়ি, চটকপুর এরম প্রচুর অফবিট জায়গা রয়েছে। দার্জিলিং-এর আশেপাশে সেই সমস্ত অফবিট জায়গা নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন এখানে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
আরও পড়ুন: দার্জিলিং এর সমস্ত মনাস্ট্রি
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব প্রতিনিধি
- Darjeeling, City Guide Map; Editors : Dr. R P Arya, Jitender Arya, Dr. Gayathri Arya, Anshuman Arya; Distributors: Prasad Book House,Siliguri
- http://www.dhr.in.net/
- https://www.darjeeling-tourism.com/
- https://darjeeling.gov.in/
- https://www.atlasobscura.com/
- https://traveltriangle.com/


আপনার মতামত জানান