সববাংলায়

লোকসভা নির্বাচন : ১৯৫১ থেকে ২০১৯

ভারতবর্ষের মতো গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের শাসনকর্তা নির্বাচন করেন জনসাধারণ। এই নির্বাচনও আবার নানাবিধ। লোকসভা নির্বাচন (Parliamentary Election) তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরিভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ ও মেয়াদ জড়িত থাকে। এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে লোকসভায় প্রবেশ করা সদস্য ‘সংসদ সদস্য’ বা সাংসদ নামে পরিচিত হন। লোকসভার আসন সংখ্যাও পূর্বাপর একই থাকেনি, তা পরিবর্তিত হয়েছে। লোকসভার আসন সংখ্যা অনুযায়ী আবার প্রতিটি রাজ্যকে কয়েকটি আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাতে বিভক্ত করা হয়।

ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভা ‘হাউস অব দ্য পিপল’ নামে পরিচিত। ভারতীয় সংবিধানের ৭৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদ দুটি কক্ষ অর্থাৎ উচ্চকক্ষ (রাজ্যসভা) ও নিম্নকক্ষ (লোকসভা)-এর সমন্বয়ে গঠিত হয়। ভারতীয় সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছরে একবার লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। মূলত ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ভোটিং সিস্টেম দ্বারা সাংসদেরা নির্বাচিত হন। এই সিস্টেমে একজন ভোটার একজন প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন এবং সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচনে জয়লাভ করে। এই সিস্টেমটি সবচেয়ে সহজ নির্বাচনী ব্যবস্থাগুলির মধ্যে একটি। এই সিস্টেমটি মধ্যযুগ থেকে ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্স নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রতিটি রাজ্যকে সংবিধানের দুটি বিধানের অধীনে আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করা হয়। সেই বিধানদুটি হল, ১) প্রতিটি রাজ্যকে লোকসভায় এমনভাবে আসন বরাদ্দ করা হবে যাতে আসন সংখ্যা এবং রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাত সমস্ত রাজ্যের ক্ষেত্রেই প্রায় সমান থাকে।

এবং ২) প্রতিটি রাজ্যকে এমনভাবে আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করা হবে যাতে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জনসংখ্যা এবং তাতে বরাদ্দকৃত আসনের সংখ্যার অনুপাত গোটা রাজ্য জুড়েই সমান থাকে।

লোকসভার সদস্য হতে গেলেও প্রার্থীকে কয়েকটি শর্ত মানতে হয়। যেমন, বয়স ২৫ বছরের কম হলে চলে না, অবশ্যই তাঁকে ভারতের নাগরিক হতে হবে এবং দেশের যে-কোনো প্রান্তের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম থাকতে হবে, অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত হলে চলবে না ইত্যাদি।

লোকসভা নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সেই দলের প্রধান নেতাই সাধারণত রাষ্ট্রপতি দ্বারা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে অবশ্যই যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন তাঁকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের যে-কোনো একটির সদস্য হতে হবে। যদি তা না হন, তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তাঁকে সংসদের সদস্য হতেই হবে।

ভারতীয় সংবিধান দ্বারা বরাদ্দ লোকসভার সর্বাধিক সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৫২।  বর্তমানে লোকসভায় ৫৪৩টি আসন পূরণের জন্য নির্বাচন হবে। প্রত্যেক রাজ্যের আসন সংখ্যা এখানে উল্লিখিত হল:

পশ্চিমবঙ্গ – ৪২, উত্তরপ্রদেশ – ৮০ (সবচেয়ে বেশি), তামিলনাড়ু – ৩৯, মহারাষ্ট্র – ৪৮, অন্ধ্রপ্রদেশ – ২৫, অরুণাচল প্রদেশ – ২, আসাম – ১৪, বিহার – ৪০, চন্ডীগড় – ১, ছত্তিশগড় – ১১, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউ – ২, দিল্লি – ৭, গোয়া – ২, গুজরাট – ২৬, হরিয়ানা – ১০, হিমাচল প্রদেশ – ৪, জম্মু ও কাশ্মীর – ৫, ঝাড়খণ্ড – ১৪, কর্ণাটক – ২৮, কেরালা – ২০, লাদাখ – ১, মণিপুর – ২, লাক্ষাদ্বীপ – ১, মধ্যপ্রদেশ – ২৯, মেঘালয় – ২, মিজোরাম – ১, নাগাল্যান্ড – ১, ওড়িশা – ২১, পুদুচেরি – ১, পাঞ্জাব – ১৩, রাজস্থান – ২৫, সিকিম – ১, তেলেঙ্গানা – ১৭, ত্রিপুরা – ২, উত্তরাখন্ড – ৫, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ – ১।

স্বাধীন ভারতে লোকসভার প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫১-৫২ সালে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ১৮তম লোকসভা নির্বাচন।

প্রথম থেকে লোকসভা নির্বাচনগুলির সংক্ষিপ্ত খতিয়ান নিচে উল্লেখ করা হল –

১৯৫১-৫২ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই নির্বাচন ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গৃহীত সংবিধানের নিয়মানুযায়ী পরিচালিত হয়েছিল। নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে এবং সুকুমার সেন প্রথম নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। সেই সময় লোকসভার ৪৮৯টি আসন ২৫টি রাজ্যের ৪০১টি নির্বাচনী এলাকায় বরাদ্দ করা হয়েছিল। ৪৮৯টি আসনের জন্য ১৯৪৯জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। মোট ৬৮ দফায় এই ভোট হয়েছিল। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ৩৬১,০৮৮,০৯০ জনসংখ্যার মধ্যে মোট ১৭৩,২১২,৩৪৩ জন ভোটার নিবন্ধিত (জম্মু ও কাশ্মীর ব্যতীত) ছিল। ভোটার বয়স ২১ বা তার বেশি হলেই ভোট দেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন৷ সেই নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ৩৬৪টি আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হন। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টি পেয়েছিল ১৬টি আসন, সমাজতান্ত্রিক দলের আয়ত্তে ছিল ১২টি আসন। এছাড়াও হিন্দু মহাসভা, ফরোয়ার্ড ব্লক-সহ আরও অনেকগুলি দল বাকি আসনগুলি পেয়েছিল।

১৯৫৭ সালের লোকসভা নির্বাচন: ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। লোকসভার ৫০৫টি আসনের মধ্যে মোট ৪৯৪টি আসনের জন্য নির্বাচন হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ২৪৮টি আসন। ৩৭১টি আসন জিতে পুনরায় জাতীয় কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। তাদের ভোটের হার ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ৪৮ শতাংশ। নির্দল প্রার্থীরা ৪২টি আসন পায় যা ভারতের যে-কোনো সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। কমিউনিস্ট পার্টি পেয়েছিল ২৭টি আসন। পশ্চিমবঙ্গের মোট ৩৬টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল ২৩টি আসন৷ জয়প্রকাশ নারায়ণদের পিএসপি দল এই নির্বাচনে প্রথম অংশগ্রহণ করে ও ১৯টি আসন জেতে।

১৯৬২ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৯ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তৃতীয় লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। লোকসভার মোট ৫০৮টি আসনের মধ্যে ৪৯৪টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়। ২৪৮ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের সংখ্যা। জাতীয় কংগ্রেস তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসে ৩৬১টি আসন জিতে। কমিউনিস্ট পার্টির আসন ২টি বেড়ে হয়েছিল ২৯। অনেকগুলি নতুন দল যথা, ভারতীয় জনসংঘ, স্যোশালিস্ট পার্টি, শিরোমণি আকালি দল, গোর্খা লীগ, লোক সেবক সংঘ ইত্যাদি এই নির্বাচনে অংশ নেয়। ১৯৬১ সালে গুজরাট নতুন রাজ্যে পরিণত হয় এবং এই নির্বাচনে সেখানকার আসন সংখ্যা ছিল ২২। এই নির্বাচনে বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল ১১৫,১৬৮,৮৯০ এবং অবৈধ ভোটের সংখ্যা ৪,৭৩৫,৩৯৪।

এই নির্বাচনের পর ১৯৬৩ সালে বিলাসপুর লোকসভা আসনের জন্য একটি উপনির্বাচন হয়েছিল, কারণ মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট জানায় বশির আহমেদ কুরেশির মনোনয়নপত্র অন্যায়ভাবে বাতিল করা হয়েছিল। সেই আসনে জাতীয় কংগ্রেস প্রার্থী সি. সিং জয়লাভ করেন।

১৯৬৭ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৭ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চতুর্থ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। লোকসভার ৫২৩টি আসনের মধ্যে ৫২০টির জন্য নির্বাচন হয়েছিল। জাতীয় কংগ্রেস পুনরায় ২৮৩টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। সাতটি রাজ্যে কংগ্রেস ব্যাপকভাবে ধাক্কা খেয়েছিল। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টি জিতেছিল ২৩টি আসন। এবছরই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) নামে কমিউনিস্ট পার্টির শাখা দলটি প্রথম নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ১৯টি আসন জেতে। পশ্চিমবঙ্গের ৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস জেতে ১৪টি আসন এবং নতুন দল সিপিআই(এম) ১৬টি আসনে লড়ে ৫টি আসন জেতে।

১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১ মার্চ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত পঞ্চম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৫১৮টি আসনের লড়াই হয়েছিল। উল্লেখ্য ততদিনে জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আর) এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (ও)-তে বিভক্ত হয়েছে। এই নির্বাচনে ৩৫২টি আসনে জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে জাতীয় কংগ্রেস (আর) এবং ইন্দিরা গান্ধী পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। সিপিআই(এম) জেতে ২৫টি আসন৷ অন্যদিকে ভারতীয় জনসংঘ পায় ২২টি আসন এবং জাতীয় কংগ্রেস (ও)-এর দখলে ছিল ১৬টি আসন। তেলেঙ্গানা প্রজা সমিতি, ভারতীয় ক্রান্তিদলের মতো কয়েকটি নতুন দল অংশ নিয়েছিল। মোট ভোট পড়েছিল ১৫১,৫৩৬,৮০২। পশ্চিমবঙ্গে ৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস জেতে ১৩টি এবং ২০টি আসন জিতে সিপিআই(এম)-এর উত্থান ঘটে।

১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৬ থেকে ২০ মার্চ ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৪২টি আসনের জন্য নির্বাচন হয়েছিল। ১৯৭৫-এ ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থার ঘোষণা করেন। এই জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করে কয়েকটি রাজনৈতিক দল জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় পার্টি তৈরি করে। এই নির্বাচনও জরুরি অবস্থার মধ্যে হয় এবং ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস জেপি জোটের কাছে পরাজিত হয়। কংগ্রেস পায় ১৫৪টি আসন এবং জেপি দল পায় ২৯৫টি আসন। জেপি দলের নেতা মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হন৷ দেশাই ৮১ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সবচেয়ে বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেস (আর)-এর ব্যাপক অবনতি হয়।

১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচন: ৩ এবং ৬ জানুয়ারি সপ্তম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জেপি দল ক্ষমতায় গেলেও এর অবস্থান ছিল দুর্বল। জেপি জোটের অন্তর্গত কয়েকজন দলীয় নেতার সঙ্গে বিরোধ ছিল দেশাইয়ের৷ বিশেষত লোকদল ও সমাজতান্ত্রিক পার্টির কয়েকজন-সহ জোটের সদস্যরা সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে মোরারজি দেশাই পদত্যাগ করেন৷ চরণ সিং জনতা জোটের কিছু অংশীদারকে ধরে রেখে ১৯৭৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। ইন্দিরা কংগ্রেস তাঁকে সমর্থন করবে বলেও যখন পিছিয়ে যায় তখন চরণ সিং পদত্যাগ করেন এবং ১৯৮০ সালে নির্বাচনের আহ্বান করেন। ইন্দিরা কংগ্রেস ৩৫৩ আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। জেপি জেতে ৪১টি আসন। শিবসেনা-সহ আরও কয়েকটি নতুন দল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

১৯৮৪ লোকসভা নির্বাচন: ২৪, ২৭ এবং ২৮ ডিসেম্বর অষ্টম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৪১টি আসনের নির্বাচন ছিল এটি। ততদিনে ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে। ইন্দিরা কংগ্রেস ইন্দিরার পুত্র রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে ৪১৪টি আসন জেতে৷ রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। তেলেগু দেশম পার্টি জিতেছিল ৩০টি আসন। ইন্দিরার হত্যা কংগ্রেস (আই)-এর জন্য হয়েছিল টার্নিং পয়েন্ট। ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির উদ্ভব হয়েছে ততদিনে, তারা এই নির্বাচনে অংশ নেয় ও ২টি আসন জেতে।

১৯৮৫ সালের ২৪ জুলাই রাজীব-লঙ্গোয়াল চুক্তি স্বাক্ষরের পর সেখানে নির্বাচন হয় এবং সেই বছর আগস্টে আসাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ডিসেম্বরে আসামে নির্বাচন হয়।

১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচন: ২২ এবং ২৬ নভেম্বর নবম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫২৯টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়। এই বছর থেকেই কনস্টিটিউশন অ্যাক্ট, ১৯৮৮ অনুসারে ভোটার হওয়ার যোগ্য বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়েছিল। রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস (আই) এই নির্বাচনে ১৯৭টি আসন জেতে, যা তাদের অবস্থা দুর্বল করে৷ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছিল জনতা দল, তাদের আসন সংখ্যা ছিল ১৪৩। বিজেপি এই নির্বাচনে ৮৫টি আসন জেতে। জনতা দলকে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিল বিজেপি ও সিপিআই(এম)। রাষ্ট্রপতি জনতা দলকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান এবং জনতা দলের নেতা ভিপি সিং প্রধানমন্ত্রী হন। যদিও এই সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জনতা দল থেকে ৬৪ জন সাংসদ নিয়ে চন্দ্রশেখর নতুন দল সমাজবাদী পার্টি গঠন করে ও কংগ্রেসের সমর্থনে চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী হন। এই সরকারও শীঘ্রই ভেঙ্গে যায়।

১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৯৯১ সালের ২০ মে, ১২ জুন এবং ১৫ জুন দশম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে পাঞ্জাবের নির্বাচনটি ১৯৯২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে হয়েছিল। পূর্ববর্তী নির্বাচনে কোন দলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকার ভেঙ্গে যায় ও ২ বছরের মধ্যেই নির্বাচন করা হয়। ৫৩৪টি আসনের জন্য ছিল নির্বাচন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ছিল ২৬৮টি আসন। কিন্তু কংগ্রেস (আই) জেতে ২৪৪টি এবং ১২০টি আসন জিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনজয়ী দল হয় বিজেপি। কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জাতীয় কংগ্রেস অন্যান্য দলের সমর্থন নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাও-এর নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে। পরে পাঞ্জাবের নির্বাচনে ইন্দিরা কংগ্রেস ১৩টির মধ্যে ১২টি আসন জিতেছিল এবং ১টি পেয়েছিল বহুজন সমাজ পার্টি।

১৯৯৬ সালের লোকসভা নির্বাচন: ২৭ এপ্রিল, ২ মে এবং ৭ মে একাদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৪৩টি আসনের জন্য হয় নির্বাচন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ছিল ২৭২টি আসন কিন্তু সর্বোচ্চ আসন জয়ী বিজেপি পায় ১৬১টি আসন ও ইন্দিরা কংগ্রেস পায় ১৪০টি আসন। কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া বিজেপি অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে একটি স্বল্পকালীন সরকার গঠন করে। যদিও পরে যুক্তফ্রন্ট জোট সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয় ও জনতা দলের এইচডি দে্বেগৌড়া প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৭ সালে ইন্দ্রকুমার গুজরাল দেবগৌড়ার স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। এই নির্বাচনের সময় জৈন হাওয়ালা কেলেঙ্কারি ভীষণ আলোড়ন তৈরি করে। তবে বৃহত্তম দল হিসেবে বিজেপির উত্থান হয়।

১৯৯৮ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৬, ২২ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি দ্বাদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সমর্থন প্রত্যাহার করলে ইন্দ্রকুমার গুজরালের সরকারের পতন হয়, ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন হয়। ৫৪৩টি আসনের জন্য হয় নির্বাচন। বিজেপি জেতে ১৮২টি আসন ও কংগ্রেস জেতে ১৪১টি। কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, তবে বাজপেয়ী তেলেগু দেশম পার্টির সমর্থনে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের নেতৃত্বে  জোট সরকার গঠন করেন। ২৭২ জন সাংসদের সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন৷ পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে তৃতীয় ফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত সিপিআই(এম) ৩২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৪টি জিতেছিল, এনডিএ জোটের অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস ২৮টি আসনে লড়ে জিতেছিল ৭টি।

১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচন: অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম (AIADMK) বাজপেয়ীর জোট সরকারের থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাজপেয়ী সরকারের পতন হলে ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের কয়েকমাস পর ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবরের মধ্যে ত্রয়োদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৬ অক্টোবর ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ৫৪৩টি আসনের জন্য হয় নির্বাচন। বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট মোট ২৬৯টি আসন জেতে, যাতে বিজেপি একাই জেতে ১৮২টি আসন। পরে তেলেগু দেশম পার্টির সমর্থন পাওয়ায় তাদের ২৯টি আসনও যুক্ত হয়। কংগ্রেস ১১৪টি আসন জিতেছিল। পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে বামফ্রন্ট ৩২টি আসনে লড়ে পায় ২১টি আসন, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস ২৮টি তে লড়ে পায় ৮টি ও বিজেপি ১৩টি লড়ে পায় ২টি আসন।

২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচন: ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে-এর মধ্যে চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম-এ ভোট হয়েছিল এই নির্বাচনে। ৫৪৩টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়। জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট মোট ২১৮টি আসন জেতে, যার মধ্যে কংগ্রেস জিতেছিল ১৪৫টি আসন। পরে আরও কিছু দলের সমর্থনে আসন সংখ্যা বেড়ে ৩৩৫-এরও বেশি হয়। অন্যদিকে এনডিএ জোট মোট ১৮৯টি আসন জেতে যাতে বিজেপি পায় ১৩৮টি আসন। ইউপিএ জেতার পর মনমোহন সিং হন নতুন প্রধানমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ভোট বৃদ্ধি পায়। ৩২টি আসনে লড়ে তারা পায় ২৬টি আসন।

২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৬ এপ্রিল থেকে ১৩ মে-এর মধ্যে পঞ্চদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মোট পাঁচ ধাপে এই নির্বাচন হয়। এটি তখনও পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক নির্বাচন ছিল। ৫৪৩টি আসনের জন্য এই নির্বাচনে ৮০৭০জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ইউপিএ জোট এই নির্বাচনে মোট ২৬২টি আসন জেতে। পরে মোট ৩৩২জন সাংসদের সমর্থনে সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এই জোটে কংগ্রেস একাই পেয়েছিল ২০৬টি আসন। অন্যদিকে এনডিএ জোট ৫২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতে ১৫৮টি আসন, যাতে বিজেপি পায় ১১৬টি আসন। দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। এই নির্বাচনে ৫৪৩টি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ৪৯৯টি ছিল নতুন সীমাবদ্ধ নির্বাচনী এলাকা। এই নির্বাচনে ফটো ভোটার তালিকাও ব্যবহার করা হয়।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন: ৭ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৪৩টি আসনের জন্য নির্বাচন হয়েছিল। ৮২৫১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নয়টি পর্বে গড় নির্বাচনী ভোটার ছিল প্রায় ৬৬.৪০%, যা ভারতীয় সাধারণ নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট মোট ৩৩৬টি আসন জেতে যাতে বিজেপি একাই ২৮২টি আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিজেপির নেতা নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। অন্যদিকে ইউপিএ জোট পেয়েছিল মাত্র ৫৯টি আসন, যার মধ্যে কংগ্রেস ৪৬৪টি আসনে লড়ে পায় ৪৪টি আসন। মোদি বারাণসী এবং ভাদোদরা থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৪টি আসন। পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছিল ৩৪টি, বিজেপি ২টি, কংগ্রেস ৪টি এবং বামফ্রন্ট ২টি আসন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ মে ফলাফল ঘোষিত হয়। এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল। ৫৪৩টি আসনের জন্য হয়েছিল এই নির্বাচন। এনডিএ জোট ৩৫৩টি আসন জিতেছিল যার মধ্যে বিজেপি একাই জেতে ৩০৩টি আসন। অন্যদিকে ইউপিএ-র জেতা ৯১টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস জিতেছিল ৫২টি আসন। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে পুনরায় নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হন এবং সরকার গঠন করেন।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন: ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুন পর্যন্ত অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সাত দফা এই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হয় ৪ জুন। ৫৪৩ টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়েছিল। ৬৪.২ কোটি মোট ভোটার অংশ নেন যার মধ্যে ৩১.২ কোটি মহিলা ভোটার যা এই পর্যন্ত সর্বাধিক। ৪৪ দিন ধরে চলা এই ভোট লম্বা সময় ধরে চলা ভোট প্রক্রিয়ার বিচারে দ্বিতীয়। প্রথম লোকসভা ভোট সময়ের বিচারে সব থেকে বেশি সময় ধরে চলা ভোট প্রক্রিয়া। এনডিএ জোট ২৯২ টি আসনে জয়লাভ করে, বিজেপি ২৪০ টি আসনে জয় লাভ করলেও একক দল হিসেবে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়নি। অপরপক্ষে কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলি নিয়ে গঠিত ইন্ডিয়া ব্লক পায় ২৩৪ টি আসন যার মধ্যে কংগ্রেস পায় ১০১ টি আসন। ২০২৩ সালে নির্মিত নতুন সাংসদ ভবনে এই লোকসভার কার্যপ্রণালী চলবে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading