লোকসংস্কৃতির সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিভাগ
লোকসংস্কৃতি হল লোকমানসের প্রতিবিম্ব। লোকায়ত সমাজের রীতি-নীতি, সংস্কার-বিশ্বাস, জীবনাচরণ ইত্যাদি সমস্ত কিছুই লোকসংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত। বাংলার লোকসংস্কৃতি বিষয়ে আলোচনা করার আগে “লোকসংস্কৃতি”-র সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন আছে।
লোকসংস্কৃতিবিদ পবিত্র সরকার বলেছেন, “লোকসংস্কৃতি বলতে আমরা মূলত বুঝেছি অনাগরিক সংস্কৃতিকে। সামন্ততান্ত্রিক বা আদি সাম্যবাদী কৌম সমাজে তার জন্ম ।” লোকসংস্কৃতিবিদ পল্লব সেনগুপ্তর মতে “কোনও একটি জাতি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব আচার ও সংস্কার, দেবকল্পনা ও ধর্ম-বিশ্বাস, রীতি ও নীতিবোধ, খাদ্য ও পরিচ্ছেদের বিশিষ্টতা, শিল্প ও সাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যকলা ইত্যাদি অর্থাৎ জীবনধারার সর্ববিধ প্রকাশ যাতে ব্যাপ্ত হয়ে থাকে, সাধারণভাবে তাকেই ‘লোকায়ত সংস্কৃতি’ বলে গ্রহণ করতে পারি।”
চরিত্র ও গঠন প্রকৃতি অনুসারে লোকসংস্কৃতিকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন লোকসংস্কৃতিবিদ বরুণকুমার চক্রবর্তী ,সেদুটি হল – বস্তু-নির্ভর লোকসংস্কৃতি ও অ-বস্তুনির্ভর লোকসংস্কৃতি। বস্তু-নির্ভর লোকসংস্কৃতির মধ্যে পড়ে পোশাক-পরিচ্ছদ, কুটির শিল্প, লোক-ভাস্কর্য, দেওয়াল চিত্র ইত্যাদি। এবং অ-বস্তুনির্ভর লোকসংস্কৃতির উদাহরণ লোকসাহিত্য যার মধ্যে পড়ে ছড়া, প্রবাদ, ধাঁধা, গান ইত্যাদি।
আবার লোকসংস্কৃতিকে নিম্নলিখিত ভাগেও ভাগ করা চলে – বাক্কেন্দ্রিক (লোকসঙ্গীত, লোককথা, গাথা, ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ ইত্যাদি); অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক (লোকনাট্য, লোকনৃত্য, লোকভঙ্গিমা ইত্যাদি); আচার-ব্যবহারগত (লোকাচার, লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কার ইত্যাদি); খেলাধুলাকেন্দ্রিক (লোকক্রীড়া); বস্তুকেন্দ্রিক (চারুকলা, লোকশিল্প ইত্যাদি)।
বাংলার লোকসংস্কৃতি
বাংলার লোকসংস্কৃতি হল বাংলার মানুষের জীবনের আবহমান ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। এটি বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আচার-অনুষ্ঠান, গান, নৃত্য, শিল্প, সাহিত্য ও লোককথার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। এই সংস্কৃতি বাংলার মাটির সঙ্গে মিশে আছে এবং যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হয়েছে।
বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর সরলতা, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং মৌখিক প্রচার। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে থাকা এই সংস্কৃতি আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, প্রকৃতি, সমাজ ও ধর্মের বিভিন্ন দিককে তুলে ধরে।
লোকগান
বাংলার লোক-সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল লোকগান। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের লোকগান প্রচলিত রয়েছে, যেমন (প্রতিটি নৃত্যের নামে ক্লিক করে বিস্তারিত পড়ে নিতে পারেন) —
- ভাটিয়ালি: নদীবাহিত অঞ্চলের নৌকা বেয়ে যাওয়া মাঝিদের গান।
- ভাওয়াইয়া: উত্তরের চারণ কবিদের গান, যা সাধারণত গরু-মহিষ চরানোর সময় গাওয়া হয়।
- বাউল গান: মরমি ভাবধারায় পরিপূর্ণ এই গান মূলত লালন শাহ, হাছন রাজা ও অন্যান্য বাউল সাধকদের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে।
- জারি গান ও নাচ: ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়বস্তু নিয়ে গাওয়া হয়, বিশেষত মহরমের সময় জারি গান প্রচলিত।
- সারি গান: সারি দিয়ে একদল মানুষ কাজের তালে তালে যে গান করেন তাই সারি গান যা মূলত শ্রমজীবি মানুষের গান।
- গম্ভীরা: এটি মূলত মালদা ও রাজশাহী অঞ্চলের গান, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক সুরে পরিবেশিত হয়।
- কীর্তন গান: ভক্তিমূলক গান যা বাংলায় গৌর-নিতাই এর ভক্তিবাদী আন্দোলনের ফলে জনপ্রিয়তা পায়।
- ঝুমুর গান: বাংলার পশ্চিমাংশে ও বিহার, ওড়িশায় প্রচলিত নাচ ও গান যা এক সময় প্রবল জনপ্রিয় ছিল।
- টুসু গান: টুসু পূজা ও পরবকে কেন্দ্র করে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান ইত্যাদি অংশে এই গান গাওয়া হয়।
- ভাদু গান: রাঢ় বাংলায় ভাদু পূজা উপলক্ষ্যে এই গান গাওয়া হয়।
লোকনৃত্য
লোকগানের পাশাপাশি বাংলার লোকনৃত্যও গুরুত্বপূর্ণ। চটুল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় পরিবেশিত নৃত্যের মধ্যে আছে (প্রতিটি নৃত্যের নামে ক্লিক করে বিস্তারিত পড়ে নিতে পারেন) —
- ছৌ নাচ: পুরুলিয়া অঞ্চলে মুখোশ পরে এই নৃত্যের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
- লাঠিনাচ: মূলত রক্ষী ও সেপাইদের মধ্যে লাঠি খেলার মাধ্যমে এই নাচ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
- রায়বেশে নাচ: বীরত্ব প্রদর্শনের এই নৃত্যের মাধ্যমে মূলত লড়াই ও কশরত প্রদর্শন করা হয়।
- ঢালি নাচ: এটিও এক প্রকার যুদ্ধের নাচ – মূলত ঢাল ও বর্শা এই নাচে ব্যবহৃত হয়।
- খেমটা নাচ: খেমটা তাল থেকে এই নাচের নামকরণ, মূলত বিনোদনের জন্য এই নাচ এক সময় জনপ্রিয় হয়েছিল।
- জারি নাচ: জারি গানের সঙ্গে এই নাচ করা হয়।
লোককাহিনি ও প্রবাদ-প্রবচন
বাংলার গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত বহু লোককাহিনি ও গল্প রয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। যেমন—
- তেতুন্নী মায়ের গল্প
- বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ
- গোপাল ভাঁড়ের কৌতুক
এছাড়া, বিভিন্ন প্রবাদ-প্রবচন যেমন— “যেমন কর্ম, তেমন ফল”, “না থাকলে মা, কেমন করে আসবে দুধ-ভাত”, ইত্যাদি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে উঠেছে।
লোকশিল্প ও কারুশিল্প
বাংলার লোকশিল্প ও কারুশিল্পও লোক-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ। এর মধ্যে রয়েছে—
- নকশিকাঁথা
- পটচিত্র
- শখের হাঁড়ি
- দোকরা শিল্প
- মাটির পুতুল
বাংলার লোক-সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্য, জীবনযাত্রা ও ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্কৃতির অনেক দিক বিলুপ্তির পথে, তবে তা সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাই বাংলার লোক-সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান