সববাংলায়

ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত ৮টি ঘটনা

বিভাগঃ ,

ফুটবল বিশ্বকাপকে অনেকেই ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ বলে থাকেন। বিশ্বের অনেক দেশ এই খেলায় অংশ নেয়, যারা সুযোগ পায় না তারাও সাগ্রহে অপেক্ষায় থাকে ফুটবল মাঠের বিশ্বযুদ্ধ দেখার। এত বড় আয়োজন, এত দেশের লড়াই আর সেই নিয়ে বিতর্ক থাকবে না – এমন কি হয়? এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলো আজও সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের জন্ম দেয়। কখনও রেফারির ভুল সিদ্ধান্ত, কখনও রাজনৈতিক প্রভাব, কখনও আবার খেলোয়াড়ের কৌশলী প্রতারণা—এসব ঘটনা বিশ্বকাপের ইতিহাসকে যেমন নাটকীয় করেছে, তেমনই বিতর্কিতও করেছে। আমরা এখানেফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলির কথা তুলে ধরলাম।

১. ১৯৩৪ বিশ্বকাপ: মুসোলিনির ছায়ায় ইতালির শিরোপা

বিশ্বকাপ ১৯৩৪ ছিল ইউরোপে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ যার আয়োজন করেছিল ইতালি। স্বাগতিক ইতালি শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়, কিন্তু সেই সাফল্যের উপর আজও প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেছে।

তৎকালীন ইতালীয় একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি বিশ্বকাপকে ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে বহু ঐতিহাসিক মনে করেন। কয়েকটি ম্যাচে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয় এবং অভিযোগ ওঠে যে স্বাগতিক ইতালিকে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। যদিও এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি, তবুও এই বিশ্বকাপকে ঘিরে সন্দেহ আজও পুরোপুরি দূর হয়নি।

২. ১৯৬৬ বিশ্বকাপ: ফাইনাল ম্যাচে ‘ঘোস্ট গোল’

এই বিতর্কিত ঘটনাটি বিশ্বকাপ ১৯৬৬ ফাইনালকে ঘিরে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচের ফলাফল ছিল ২-২।

অতিরিক্ত সময়ে ১০১ মিনিটে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের শট ক্রসবারে লেগে গোললাইনে পড়ে বলটি বাউন্স করে। প্রশ্ন ছিল —বলটি কি পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেছিল?

রেফারি ও লাইন্সম্যান আলোচনা করে গোলের সিদ্ধান্ত দেন। সেই গোলের সুবাদে ম্যাচ জিতে প্রথম ও একমাত্রবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ড। আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ‘ঘোস্ট গোল’ হিসেবে পরিচিত এই গোলটি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ছিল ইংল্যান্ড।

৩. ১৯৭৮ বিশ্বকাপ: পেরুর বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার রহস্যময় ৬-০ জয়

বিশ্বকাপ ১৯৭৮ আয়োজন করেছিল আর্জেন্টিনা। সেই বিশ্বকাপে দ্বিতীয় পর্যায়ের বি গ্রুপে ছিল স্বাগতিক আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পোল্যান্ড এবং পেরু। সেকেণ্ড রাউণ্ডের গ্রুপের বিজয়ী দল ফাইনালে খেলবে এমনটাই তখন নিয়ম ছিল। গ্রুপ বি থেকে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দুটি দলই ফাইনালে ওঠার দাবিদার ছিল। ব্রাজিল চেয়েছিল গ্রুপের শেষ ম্যাচ একই সময়ে খেলতে – কারণ দুটি দলের পয়েন্ট সমান হলে গোল পার্থক্য দেখা হবে। ব্রাজিলের সেই ন্যায্য দাবি অগ্রাহ্য করে ব্রাজিলের ম্যাচ আগে দেওয়া হয় ও সেই একই দিনে আর্জেন্টিনা পরে খেলতে নামে। শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার সামনে এমন একটা অঙ্ক দাঁড়ায় যে শুধু তাদের জিতলেই হবে না, ব্রাজিলকে টপকাতে হলে অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে জিততে হবে। সেই ম্যাচ ৬-০ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছায়।

ব্রাজিলের খেলোয়াড়, সাংবাদিক এবং বহু নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন — যে পেরু দল প্রথম পর্যায়ের গ্রুপে প্রথম হয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে উঠেছিল, তারা কীভাবে এত সহজে ৬-০ ব্যবধানে হারল?

সন্দেহ আরও বাড়ে যখন জানা যায় ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার সামরিক শাসক হোর্হে রাফায়েল ভিদেলা (Jorge Rafael Videla) পেরুর ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন সাংবাদিক ও গবেষক অভিযোগ করেন যে দুই দেশের সামরিক সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক সহায়তা কিংবা অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে ম্যাচের ফল প্রভাবিত হতে পারে।

এই সমস্ত অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও মুসোলিনির প্রভাবে ইতালির প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের মতোই আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ও বিতর্কিত হয়েই রয়েছে।

৪. ১৯৮২ বিশ্বকাপ: ‘ডিসগ্রেস অব গিজন’

১৯৮২ বিশ্বকাপের ২৫ জুন স্পেনের গিজনে অনুষ্ঠিত পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ফুটবল ম্যাচটি ‘ডিসগ্রেস অব গিজন’ বা ‘গিজনের কলঙ্ক’ নামে পরিচিত।বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক ম্যাচগুলির মধ্যে এটি একটি।

পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচে জার্মানি শুরুতেই গোল করে এগিয়ে যায়। এরপর ম্যাচের বাকি সময়ে দুই দলই কার্যত আক্রমণ বন্ধ করে দেয়। কারণ এই ফলাফল দুটো দলেরই পরের রাউণ্ডে পৌঁছানোর জন্য সুবিধাজনক ছিল।

এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় আলজেরিয়ার। তারা আগেই নিজেদের ম্যাচ জিতেছিল, কিন্তু এই অঘোষিত সমঝোতার ফলে বিদায় নিতে বাধ্য হয়।

এই ঘটনার পর থেকেই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজন করার নিয়ম চালু করা হয়।

৫. ১৯৮৬ বিশ্বকাপ: ‘হ্যান্ড অব গড’

‘হ্যান্ড অব গড’ (Hand of God) বা ‘ঈশ্বরের হাত’ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত গোল, যা ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ঘটেছিল। ২২ জুন অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হয় গোল শূন্য ভাবে। এরপর, ৫১ মিনিটে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিল্টন একটি উঁচু বল ক্লিয়ার করতে এগিয়ে আসেন, সেই সময় আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা লাফিয়ে শিল্টনকে ফাঁকি দিয়ে একটি গোল করেন। খালি চোখে মনে হয়েছিল তিনি মাথা দিয়ে গোলটি করেছেন, কিন্তু ভিডিও রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা যায় ম্যারাডোনা তাঁর বাম হাত দিয়ে বলটি গোলপোস্টে ঠেলে দিয়েছেন। রেফারি বিষয়টি খেয়াল না করায় গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। ম্যাচ শেষে এই গোলের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ম্যারাডোনা মন্তব্য করেছিলেন, গোলটি হয়েছিল “কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।” তাঁর এই চতুর ও ঐতিহাসিক মন্তব্যের পর থেকেই গোলটি ফুটবল বিশ্বে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়। এই গোলের ঠিক চার মিনিট পরেই ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে গোল করেন যা ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোল (গোল অব দ্য সেঞ্চুরি) হিসেবে পরিচিত। ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়।

ইংল্যান্ডের ঘোস্ট গোলের বিরুদ্ধে ‘ঈশ্বরের হাত’ যেন ফুটবল ঈশ্বরের এক মধুর বিচার।

৬. ১৯৯৪ বিশ্বকাপ: ডোপিং পরীক্ষায় ধরা পড়লেন ম্যারাডোনা

বিশ্বকাপ ১৯৯৪ শুরু হয়েছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার প্রত্যাবর্তনের গল্প দিয়ে। ১৯৯০ সালের ফাইনালের পর অনেকেই মনে করেছিলেন তাঁর সেরা সময় শেষ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে তিনি আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে নামেন।

গ্রিসের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে একটি দুর্দান্ত গোল করার পর ক্যামেরার সামনে তাঁর উন্মত্ত উদ্‌যাপন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। মনে হচ্ছিল, ম্যারাডোনা আবারও বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজের জাদু দেখাতে চলেছেন।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সবকিছু বদলে যায়। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের পর ডোপিং পরীক্ষায় ম্যারাডোনার নমুনায় নিষিদ্ধ উদ্দীপক এফেড্রিন (Ephedrine)-এর উপস্থিতি ধরা পড়ে। ফিফা তাঁকে অবিলম্বে টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করে।

ঘটনাটি ফুটবল বিশ্বে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। কোটি কোটি সমর্থক বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ডোপিং পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।

ম্যারাডোনা দাবি করেছিলেন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও নিষিদ্ধ পদার্থ গ্রহণ করেননি। তাঁর মতে, একটি খাদ্য-পরিপূরক (supplement) গ্রহণের ফলে এই সমস্যা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ফিফা সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি।

ম্যারাডোনার বিদায়ের পর আর্জেন্টিনাও দ্রুত ছন্দ হারায়। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট দলটি শেষ ষোলোতেই রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয়।

আজও অনেকের মতে, ১৯৯৪ সালের সেই ডোপিং কেলেঙ্কারি শুধু একটি খেলোয়াড়ের পতন নয়; বরং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় এবং বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি।

৭. ২০০২ বিশ্বকাপ: রেফারির দাক্ষিণ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার চতুর্থ স্থান

বিশ্বকাপ ২০০২ এশিয়া মহাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপের প্রথম আসর। এর আয়োজক ছিল যৌথভাবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।

স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া রাউন্ড অফ ১৬-এ ইটালিকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করে। কিন্তু ম্যাচের পর শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। ইতালির একটি গোল বাতিল করা হয়, ফ্রান্সেস্কো তত্তিকে লাল কার্ড দেখানো হয় এবং একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ও সমর্থকদের অনেকেই মনে করেন, রেফারিং দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষেই গিয়েছিল।

কিন্তু বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। এর পরের রাউণ্ডে অর্থাৎ কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের দুটি বৈধ গোল বাতিল করা হয়। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া জয়ী হয়। ইতালির পর স্পেনও রেফারিং নিয়ে একই অভিযোগ তোলে।

ফুটবল ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল যেখানে একটি দলের বিরুদ্ধে পরপর দুটি নকআউট ম্যাচে এত বড় রেফারিং বিতর্ক দেখা গেছে।

৮. ২০০৬ বিশ্বকাপ: জিদানের মাথা দিয়ে আঘাত

বিশ্বকাপ ২০০৬ ফাইনাল। কেরিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলছিলেন জিনেদিন জিদান। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জির সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে তিনি প্রতিপক্ষের বুকে মাথা দিয়ে আঘাত করেন। সরাসরি লাল কার্ড দেখেন তিনি। ফ্রান্স পরে সেই ম্যাচ টাইব্রেকারে হেরে যায়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের বিদায় এমন নাটকীয় ও বিতর্কিত হবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কখনও রেফারির ভুল সিদ্ধান্ত, কখনও রাজনৈতিক প্রভাব, কখনও খেলোয়াড়ের বিতর্কিত আচরণ—এসবই বিশ্বকাপকে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এক বিশাল নাট্যমঞ্চে পরিণত করেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের গল্প নয়; এটি বিতর্ক, আবেগ, অন্যায়, বীরত্ব এবং মানবিক দুর্বলতারও ইতিহাস। আমরা এখানে ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনার কয়েকটি তুলে ধরলাম। আপনার মতে এর মধ্যে সব থেকে বিতর্কিত অধ্যায় কোনটি বা এর বাইরে অন্য কোন ঘটনা আপনি তুলে ধরতে চান, কমেন্ট করে জানান।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading