ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানান জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু নানা সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নাথুরাম গডসের হাতে মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর থেকে শুরু করে কংগ্রেসি রাজত্বে কখনও ইন্দিরা গান্ধী, কখনও রাজীব গান্ধীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভারতীয় রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ইন্দিরা হত্যা কিংবা রাজীব হত্যার জন্য দায়ী অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি হলেও ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আজও রহস্যের আবরণে ঢাকা। ঠিক একইভাবে এক অমীমাংসিত রহস্যময় মৃত্যু ঘটেছিল ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর দলের বহু সদস্যেরই বক্তব্য ছিল এর পিছনে নিশ্চিতভাবে বিপক্ষীয় কংগ্রেসিদের চক্রান্ত ছিল। কিন্তু এই মন্তব্য আজও প্রমাণিত হয়নি। শুধু তাই নয়, তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ হিসেবে আজ পর্যন্ত কোনও তথ্যকেই সঠিক প্রমাণ করা যায়নি। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মৃত্যু রহস্য তাহলে কোন সত্যকে আড়াল করে রেখেছে? চলুন, তা বিশদে জেনে নেওয়া যাক।

১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হলেও মাত্র ৫২ বছর বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয় কাশ্মীরের শ্রীনগরে। ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র শ্যামাপ্রসাদ শিক্ষাবিদ ও একজন আইনজীবি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে দুবার তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও মনোনীত হয়েছিলেন। রাজনীতির জগতে পা রেখে সাভারকরের প্রভাবে তিনি হিন্দু মহাসভার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন। ১৯৪১ সালে তাঁর নেতৃত্বে বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয় এবং তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।দেশভাগের সময় তাঁর ঐতিহাসিক দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই আজকের পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হয়। সর্বভারতীয় রাজনৈতিক পরিসরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী অত্যন্ত প্রভাবশালী এক নেতৃত্ব ছিলেন সেই সময়। স্বাধীন ভারতের প্রথম ক্যাবিনেটে তিনি জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রীসভার শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু নেহরুর ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাজনৈতিক আদর্শ এবং নেহরু-লিয়াকত চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে ১৯৫০ সালে তিনি মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ১৯৫১ সালে তিনি ‘ভারতীয় জনসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) মূল ভিত্তি।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই প্রথম জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে একীভূত করার দাবি জানান। তৎকালীন নেহরু সরকার জম্মু ও কাশ্মীরকে যে বিশেষ মর্যাদা (৩৭০ ধারা) দিয়েছিল এবং সেখানে ভারতীয়দের প্রবেশের জন্য যে ‘পারমিট প্রথা’ চালু করেছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর বিখ্যাত স্লোগান ছিল — “এক দেশমে দো বিধান, দো প্রধান, অউর দো নিশান — নেহি চলেঙ্গে নেহি চলেঙ্গে।” ১৯৫৩ সালের ১১ মে কোনও পারমিট ছাড়াই কাশ্মীরে প্রবেশ করলে শেখ আবদুল্লাহর সরকারের নির্দেশে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। এর ঠিক এক মাস পরেই, ১৯৫৩ সালের জুন মাসে শ্রীনগরে চিকিৎসাধীন বা বন্দি অবস্থায় তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হয়।
অনেকেই সন্দেহ করেন যে তাঁর এই মৃত্যু রহস্যজনক এবং এর পিছনে নিশ্চিতভাবে কোনও ষড়যন্ত্র কাজ করেছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে ক্ষমতাসীন দল এই রহস্যজনক মৃত্যুর কোনওরকম নিরপেক্ষ তদন্ত করেনি। ১৯৫৩ সালের ৮ মে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এবং তাঁর অনুগামীরা সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে জম্মুর উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে ছিলেন গুরু দত্ত বেদ, অটলবিহারী বাজপেয়ী, টেক চাঁদ, বলরাজ মাধোক প্রমুখরা। তাঁদের অনুসরণ করে কয়েকজন সাংবাদিকও জম্মু-কাশ্মীরে গিয়েছিলেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় নাগরিকদের বসতি নিষিদ্ধ ঘোষণার বিরোধিতা করে অনশন পরিচালনা করা। জওহরলাল নেহরু কাশ্মীরকে যে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলেন তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতিসহ যে কেউ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া কাশ্মীরে প্রবেশ করতে পারবে না। জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল ভারতীয়দের। জম্মু ও কাশ্মীরে বাধ্যতামূলক অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করেন। ‘এক দেশ মে দো বিধান, দো প্রধান অউর দো নিশান নেহি চলেঙ্গে’ এই স্লোগানে আন্দোলনে বসেন শ্যামাপ্রসাদ।
জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করা মাত্রই ১১ মে শেখ আবদুল্লাহর সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে শ্রীনগর শহর থেকে দূরে, ডাল হ্রদের পার্শ্ববর্তী একটি পাহাড়ি অঞ্চলের কটেজে নজরবন্দি করে রাখে। সেই সময় তিনি ফুসফুসের প্রদাহসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। এইসব ব্যাধিকে অগ্রাহ্য করেই জম্মু ও কাশ্মীর সরকার তাঁকে একজন অপরাধীর মত বিবেচনা করে এবং একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রাখে। সেই কুটির-সম কটেজে পৌঁছানোর জন্য বহু সিঁড়ি ভাঙতে হত। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই প্রশ্নের কোনও উত্তর মেলেনি যে পায়ে গুরুতর চোট লাগার পরেও তাঁকে কেন এভাবে বন্দি করে রাখা হল?
ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম প্রধান সদস্য তথাগত রায়ের লেখা ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী : হিজ লাইফ অ্যান্ড টাইমস’ বইতে তিনি লিখছেন যে জুন মাসের শুরুর দিকে শ্যামাপ্রাসাদের শারীরিক অবস্থার যথেষ্ট অবনতি হয়। ২০ জুন তারিখে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ পারিবারিক ডাক্তারদের নিষেধ সত্ত্বেও তাঁকে স্ট্রেপ্টোমাইসিন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয় যাতে তাঁর অ্যালার্জি ছিল। সেই সময় তাঁর পরিচর্যাকারী ডাক্তার মহম্মদ জানিয়েছিলেন যে এই অ্যালার্জি সংক্রান্ত নির্দেশনামা বহু বহু দিন আগে শ্যামাপ্রসাদকে জানানো হয়েছিল, কিন্তু তার পর এই জাতীয় ওষুধের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ধারণাও অনেক পাল্টেছে। এই ওষুধ সম্পূর্ণ নিরাপদ এই আশ্বাস দিয়েই শ্যামাপ্রসাদকে স্ট্রেপ্টোমাইসিন দিয়েছিলেন চিকিৎসক মহম্মদ। এর সঙ্গে তাঁকে বেদনানাশক (Pain Killer) হিসেবে কিছু গুঁড়ো ওষুধও দেওয়া হয়েছিল। যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্যথা কমে, ততদিন ডাক্তার তাঁকে এই গুঁড়ো ওষুধ দিনে দুবার করে খেতে বলেছিলেন। গুরু দত্ত বেদের মতে, জেল সুপারিনটেন্ডেন্টের কাছে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী অনুরোধ করেছিলেন যাতে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার সংবাদ তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সংবাদ পরিবারকে জানানো হয়নি।
পরদিন, ,২১ জুন, জেলের চিকিৎসক তাঁকে দেখতে আসেন কিন্তু তাঁর চিকিৎসা যিনি করেছিলেন তাঁর কোনও দেখা মেলে না। জেলের চিকিৎসক পুনরায় তাঁকে স্ট্রেপ্টোমাইসিন দেন যার ফলে সারাদিন ধরে শ্যামাপ্রাসাদের গায়ের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকেন তিনি। ২২ জুন গুরুদত্ত বেদকে জানানো হয় যে শ্যামাপ্রাসাদ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। বেদ যখন দেখা করতে যান, তখন তিনি লক্ষ করেন যে শ্যামাপ্রসাদের শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। সকাল সাড়ে সাতটার সময় যখন ড. মহম্মদ আলি আসেন, তিনি শ্যামাপ্রাসাদের জটিল অবস্থা দেখে নার্সিং হোমে স্থানান্তরিত করার পরামর্শ দেন। শ্যামাপ্রসাদকে সেই সময় নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়ার বদলে ১০ মাইল দূরের একটি সরকারি হাসপাতালের স্ত্রী-রোগ বিভাগে ভর্তি করানো হয়। ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন ভোরে জেল সুপারিনটেন্ডেন্ট শ্যামাপ্রসাদের সহায়ক গুরু দত্ত ও টেকচাঁদকে জানান যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর অবস্থা মোটেও ভাল নয়। তাঁরা ভোর ৪ টায় হাসপাতালে পৌঁছালে তাঁদের জানানো হয় যে ভোর ৩টে ৪০ মিনিটে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মৃত্যু হয়েছে।
তাঁর এই সন্দেহজনক মৃত্যুর পর ভারত সরকার তাঁর মৃতদেহের কোনও ময়না তদন্ত করেনি। সেই সময় নেহেরু লণ্ডনে ছিলেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী মৌলানা আজাদ দিল্লিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মৃতদেহ নিয়ে আসারও অনুমতি দেননি। তার বদলে তাঁর মৃতদেহ সরাসরি কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন শ্যামাপ্রসাদের এই সন্দেহজনক মৃত্যু সমগ্র দেশ জুড়ে আলোড়ন ফেলে। তাঁর বৃদ্ধা মাতা যোগমায়া দেবী প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লিখে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের আর্জি জানিয়েছিলেন, কিন্তু নেহরু সেই আবেদন খারিজ করে দেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মৃত্যু রহস্যের পূর্ণাঙ্গ বিচারবিভাগীয় তদন্ত আর কখনও হয়নি।
তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী দাবি করেন যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সাধারণ স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে মারা যাননি, বরং তাঁর মৃত্যুর পিছনে নেহেরু এবং কাশ্মীর সরকারের মধ্যে কোনও ষড়যন্ত্র ছিল এবং তিনি প্রকাশ্যে শ্যামাপ্রসাদ হত্যার প্রসঙ্গ তুলে আনেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মৃত্যু রহস্য কী তাহলে এক গুপ্ত হত্যার আখ্যান? ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সমর্থিত সরকারের সঙ্গে কোন গোপন বোঝাপড়ায় শেখ আবদুল্লাহ শাসিত জম্মু ও কাশ্মীর সরকার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মৃত্যুর জন্য দায়ী? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান