গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষে নির্বাচন প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। নানাবিধ নির্বাচনের মধ্যে বিধানসভা নির্বাচন (Legislative Assembly Election) হল মূলত রাজ্যগুলির নিজস্ব নির্বাচন। বিধানসভা বলতে আসলে বোঝায় ভারতের প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আইনসভা। কোথাও রাজ্য আইনসভা বা বিধানসভা এক কক্ষবিশিষ্ট, কোথাও বা দুই কক্ষবিশিষ্ট। একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে একজন সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে জয়যুক্ত হলে বিধানসভার সদস্য হতে পারেন। বিধানসভার সদস্য বিধায়ক বা এমএলএ (Member of Legislative Assembly) নামে পরিচিত হন। সরাসরি জনগণের দ্বারা বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের মেয়াদ হয় পাঁচ বছর। এই নির্বাচন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতালাভ ও মেয়াদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা হল একটি এক কক্ষবিশিষ্ট বিধানসভা। এটি রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গের এই বিধানসভায় মোট ২৯৪টি আসন রয়েছে। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী বিধানসভার সদস্য ৬০জনের কম এবং ৫০০ জনের বেশি না হওয়া আবশ্যক। অবশ্য এই নিয়ম গোয়া , সিকিম, মিজোরাম এবং কেন্দ্রশাসিত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে একইরকম থাকে না, কারণ কয়েকটি রাজ্য বিধানসভায় দেখা যায় সদস্য সংখ্যা ৬০-এরও কম। বিধানসভা নির্বাচন ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ভোটিং পদ্ধতিতে সমাধা হয়ে থাকে, অর্থাৎ এক্ষেত্রে ভোটদাতা সরাসরি প্রার্থীদেরকে ভোট দেন এবং সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী বিজয়ী হন; প্রার্থীকে সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ভোট পেতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার জন্য প্রার্থীর নাম ভোটার তালিকাভুক্ত হতে হবে এবং অবশ্যই তাঁরা কোন ফৌজদারি মামলায় জড়িত নেই তা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে কোন রাজ্যে কয়টি করে বিধানসভার আসন রয়েছে সেটি দেখে নেওয়া যাক :-
অন্ধ্রপ্রদেশ – ১৭৫, অরুণাচল প্রদেশ – ৬০, আসাম – ১২৬, বিহার – ২৪৩, ছত্তিসগড় – ৯০, দিল্লি – ৭০, গোয়া – ৪০, গুজরাট – ১৮২, হরিয়ানা – ৯০, হিমাচল প্রদেশ – ৬৮, জম্মু ও কাশ্মীর – ৯০, ঝাড়খণ্ড – ৮১, কর্ণাটক – ২২৪, কেরালা – ১৪০, মধ্যপ্রদেশ – ২৩০, মহারাষ্ট্র – ২৮৮, মণিপুর – ৬০, মেঘালয় – ৬০, মিজোরাম – ৪০, নাগাল্যান্ড – ৬০, ওড়িশা – ১৪৭, পুদুচেরি – ৩০, পাঞ্জাব – ১১৭, রাজস্থান – ২০০, সিকিম – ৩২, তামিলনাড়ু – ২৩৪, তেলেঙ্গানা – ১১৯, ত্রিপুরা – ৬০, উত্তরপ্রদেশ – ৪০৩ (সবচেয়ে বেশি), উত্তরাখন্ড – ৭০ এবং পশ্চিমবঙ্গ – ২৯৪।
পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালে সপ্তদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং স্বাধীনতার পর ভারতীয় সংবিধানের অধীনে ১৯৫২ সালে হয়েছিল প্রথম বিধানসভা নির্বাচন। সেই প্রথম বিধানসভা নির্বাচন থেকে ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেকটি বিধানসভা নির্বাচন সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল।
১৯৫২ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৫২ সালের ৩১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৭টি কেন্দ্রের মোট ২৩৮টি আসনের জন্য হয়েছিল এই নির্বাচন। এই সময় বিধানসভার স্পীকার ছিলেন সায়লা কুমার মুখোপাধ্যায়। ড. বিধানচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস ২৩৬টি আসনে লড়ে মোট ১৫০টি আসনে জয়লাভ করেছিল। বিধানচন্দ্র বউবাজার কেন্দ্র থেকে লড়েছিলেন৷ অন্যদিকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই-এর ৮৬জন প্রার্থীর মধ্যে ২৮জন জয়লাভ করেন অর্থাৎ ২৮টি আসন পায় তারা। সিপিআই-এর প্রভাবশালী নেতা জ্যোতি বসু বরানগর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এই নির্বাচনে বামপন্থী রাজনীতিতে যে-দুটি জোটের উত্থান হয়েছিল, সে-দুটি হল, ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট অর্গানাইজেশন অফ ইন্ডিয়া এবং পিপল’স ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট ফ্রন্ট। মোট ২৮৮৯৯৯৪ সংখ্যাক ভোট পেয়ে কংগ্রেস জয়লাভ করে এবং বিধানচন্দ্র রায় পুনরায় মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন।
১৯৫৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৫৭ সালের ৮ মে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গতবারের তুলনায় মোট আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল ২৫২। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ১২৭টি আসন। জাতীয় কংগ্রেস বিধানচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে ২৫১টি আসনে লড়ে ১৫২টি আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল এবং বিধানচন্দ্র রায় পুনরায় পশ্চিবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। এই নির্বাচনের আগে আবার বামপন্থী যে-দুটি জোট হয়, সেগুলি হল, ইউনাইটেড লেফট ইলেকশন কমিটি (সিপিআই, পিএসপি, এআইএফবি, এমএফবি এবং আরএসপির মধ্যে একটি জোট) এবং ইউনাইটেড লেফট ফ্রন্ট (এসইউসিআই(সি), বিপিআই, আরপিআই এবং ডেমোক্রেটিক ভ্যানগার্ড নিয়ে গঠিত)। এছাড়াও তৃতীয় একটি জোট হয় যেটি, ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক পিপলস ফ্রন্ট, বিজেএস, হিন্দু মহাসভা এবং আরসিপিআই নিয়ে গঠিত হয়েছিল। জোটের অন্তর্গত সিপিআই ১০৩টি আসনে লড়ে ৪৬টি আসনে জয়লাভ করেছিল। নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৯৩৫। ৪,৮৩০,৯৯২ সংখ্যাক ভোট পেয়ে কংগ্রেস জয়লাভ করে।
১৯৬২ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৬২ সালের ৮ মে পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মোট ২৫২টি আসনের জন্য এই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ১২৭টি আসন। জাতীয় কংগ্রেস মোট ২৫২টি আসনে লড়ে ১৫৭টি আসন জিতে পুনরায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যু হয় সেই বছর। কংগ্রেসের আরেকজন নেতৃস্থানীয় মুখ প্রফুল্লচন্দ্র সেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। প্রফুল্লচন্দ্র আরামবাগ কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। অন্যদিকে সিপিআই ১৪৫টি আসনে লড়ে ৫০টি আসন জিতেছিল। উল্লেখ্য যে বউবাজারে বিধানচন্দ্র রায়ের আসনটিতে দাঁড়িয়ে জয়লাভ করেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের বিজয় সিং নাহার।
১৯৬৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৬৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মোট ২৮০টি আসনের জন্য হয়েছিল এই নির্বাচন, যার মধ্যে ১৪১টি আসন প্রয়োজন ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য। এই বিধানসভা নির্বাচনের আগে পিপলস ইউনাইটেড লেফট ফ্রন্ট নামে একটি জোট হয় যাতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলা কংগ্রেস, অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক এবং বলশেভিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া ছিল। অন্যদিকে জাতীয় কংগ্রেস ১২৭টি আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখার্জি আরামবাগে প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে পরাজিত করেন। নির্বাচনের পরে অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে পিপলস ইউনাইটেড লেফট ফ্রন্ট এবং প্রজা স্যোশালিস্ট পার্টি, সিপিআই(এম) ইত্যাদি আরও কয়েকটি দল ও ৩১জন নির্দল বিধায়ক নিয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাজ্যে প্রথম অ-কংগ্রেসী সরকার গঠন করে। অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হন এবং জ্যোতি বসু হন উপ-মুখ্যমন্ত্রী।
১৯৬৯ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চম বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৮০টি আসনের জন্য নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই এই নির্বাচন হয়েছিল। নকশাল বিদ্রোহ নিয়ে মতভেদ, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ ইত্যাদি কারণে বাংলা কংগ্রেস এবং সিপিআই(এম)-এর সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ বাংলা কংগ্রেসের ১৬জন এমএলএ-কে সঙ্গে নিয়ে প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট তৈরি করেন এবং কংগ্রেসের সমর্থন পান। রাজ্যপাল বিধানসভায় অনাস্থা ভোট না করে অজয় মুখার্জির সরকার ভেঙে দেন। ১৯৬৭ সালের ২১ নভেম্বর প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তবে সিপিআই(এম) এবং কংগ্রেসের ক্যাডারদের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ৩ মাসের মধ্যে প্রফুল্লচন্দ্রের সরকারকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয় এবং পূর্ববর্তী বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয়, ফলে নতুন বিধানসভা নির্বাচনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। জাতীয় কংগ্রেস নির্বাচনে ৫৫টি আসন জেতে এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারের অন্তর্ভুক্ত সিপিআই(এম) জেতে ৮০টি আসন। যুক্তফ্রন্ট ২১৪টি আসন জিতে দ্বিতীয় দফা সরকার গঠন করে এবং অজয় মুখার্জি পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হন।
১৯৭১ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গের ষষ্ঠ বিধানসভা নির্বাচন আনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২৯৪টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়েছিল এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ১৪৮টি আসন। যুক্তফ্রন্ট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সিপিই(এম)-এর নেতৃত্বে সংযুক্ত বামফ্রন্ট নামে ছয়-দলীয় জোট গঠিত হয় এবং সিপিআই-এর নেতৃত্বে আটদলীয় জোট ইউএলডিএফ গঠন করে। ইউএলডিএফ বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে আসন বণ্টন-সংক্রান্ত চুক্তি করতে ব্যর্থ হলেও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আর)-এর সঙ্গে কয়েকটি আসন বণ্টন করতে সক্ষম হয়েছিল। এই নির্বাচনকে ঘিরে সমগ্র রাজ্য জুড়ে সিপিআই(এম) ও সিপিআই(এম-এল)-এর মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে গিয়েছিল। বাংলা কংগ্রেস প্রার্থী দেবদত্ত মন্ডল নিহত হয়েছিলেন। নিহত হন আরও বেশ কিছু প্রার্থী। সিপিআই(এম) ১১৩টি আসন লাভ করে। অন্যদিকে জাতীয় কংগ্রেস (আর) পায় ১০৫টি আসন ও সিপিআই জেতে ১৩টি আসন। নির্বাচনের পর কংগ্রেস (আর) ও বাংলা কংগ্রেস সরকার গঠন করে এবং ইউএলডিএফ বাইরে থেকে তাদের সমর্থন জানায়। অজয় মুখার্জি পুনরায় মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেন।
১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৭২ সালের ১১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের সপ্তম বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনের জন্য নির্বাচন হয়েছিল এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ১৪৮টি আসন। ১৯৭১ সালের ২৯ জুন ইউএলডিএফ এবং কংগ্রেস (আর)-এর পতনের ফলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। ১৯৭২ সালের নির্বাচনের সময় প্রধান দুটি জোট ছিল, একটি জোট কংগ্রেস (আর) ও সিপিআই-এর জোট, যেটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট নামে পরিচিত এবং অন্য জোটটি সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জোট। সেই সময় বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। সেই যুদ্ধ সোভিয়েত সমর্থন পেলে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইও উল্লেখযোগ্য প্রতিপত্তি অর্জন করেছিল। কংগ্রেস (আর) এবং সিপিআই-এর জোট ২১৬টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। সিপিআই(এম) পেয়েছিল ৩৫টি আসন। এই নির্বাচনে কংগ্রেস (আর)-এর জয়লাভের পর একটি উপনির্বাচনে মালদা থেকে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় নির্বাচিত হন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ বিধানসভা নির্বাচনে কারচুপির অনেক অভিযোগ উঠেছিল।
১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৭৭ সালের ১৪ জুন পশ্চিমবঙ্গের অষ্টম বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে জনতা পার্টি জয়লাভ করার পর দিল্লির নতুন সরকার নয়টি রাজ্যের বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেয়, তারমধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। কংগ্রেস (আর) এর বিরোধিতা করলেও সুপ্রিম কোর্ট তাদের আবেদন প্রত্যাখান করে। অন্যদিকে সে বছরই বামফ্রন্ট নামে বামপন্থী দলগুলির একটি জোট তৈরি হয়, তারা জনতা পার্টির সঙ্গে আসন ভাগাভাগির চুক্তি করতে চাইলেও তা ব্যর্থ হয় এবং তারা আলাদা হয়ে যায়। রাজ্যে কংগ্রেস (আর), বামফ্রন্ট এবং জনতা পার্টির একটি ত্রিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। বামফ্রন্ট ২৯৩টি আসনে লড়ে ২৩১টি আসন জিতেছিল, তারমধ্যে সিপিআই(এম) পেয়েছিল ১৭৮টি আসন। অন্যদিকে জনতা পার্টি পায় ২৯টি এবং কংগ্রেস (আর) পায় ২০টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সিপিআই(এম)-এর প্রধান মুখ জ্যোতি বসু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বামফ্রন্ট সরকার গঠন করেন। সাতগাছিয়া থেকে লড়ে জ্যোতি বসু জয়লাভ করেছিলেন।
১৯৮২ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৮২ সালের ১৯ মে পশ্চিমবঙ্গের নবম বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনের জন্য হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই নির্বাচনের আগে সিপিআই বামফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে কংগ্রেস (আই) এবং কংগ্রেস (এস) জোটবদ্ধ হয়ে এই নির্বাচনে লড়ে। কংগ্রেস (আই) এই নির্বাচনে খুব শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কংগ্রেস (আর)-এর দখলে থাকা আসনগুলি-সহ জনতা পার্টির আসনগুলি জিতেছিল কংগ্রেস (আই)। ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি প্রথমবারের মতো ১৯৮২ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ১৯৮০ সালের গোর্খাল্যান্ডের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ভোট বয়কটের প্রচার চালানো হয়েছিল৷ সিপিআই(এম) একটি পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের বিরোধিতা করে। বামফ্রন্ট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৩৮টিতে জয়লাভ করে, যাতে সিপিআই(এম) একা পেয়েছিল ১৭৪টি আসন। ২৫০টি আসনে লড়ে কংগ্রেস (আই) পায় ৪৯টি আসন। বিজেপি একটিও আসন পায়নি। জ্যোতি বসু পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
১৯৮৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৮৭ সালের ১০ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের দশম বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়েছিল। মূলত জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট এবং রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস (আই)-এর মধ্যে প্রধান লড়াই হয়েছিল। বামফ্রন্ট ৩৫জন ছাত্র নেতাকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। অন্যদিকে কংগ্রেস (আই)-এর হেভিওয়েট প্রার্থী সুব্রত মুখোপাধ্যায় ও সোমেন মিত্র পার্টি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং প্রণব মুখার্জি কংগ্রেস (আই) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তার রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস গঠন করেছিলেন। বামফ্রন্ট ২৯৪টি আসনের মধ্যে পায় ২৫১টি আসন, যাতে সিপিআই(এম) ২১২টি আসনে লড়ে পায় ১৮৭টি আসন। কংগ্রেস (আই) জেতে ৪০টি আসন। জ্যোতি বসু পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন।
১৯৯১ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৯১ সালের ২৪ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের একাদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনের জন্য এই নির্বাচন হয়। বিজেপি রাজ্যজুড়ে ২৯১জন প্রার্থী দেয়। এই প্রথম বিজেপি এত সংখ্যক প্রার্থী দিয়েছিল। অন্যদিকে কংগ্রেস (আই) সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে ফিরিয়ে আনে। কংগ্রেস (আই) আসন ভাগাভাগির ব্যবস্থা করে মোট ২৮৫টি আসনে লড়েছিল। ডায়মন্ড হারবারে রাজীব গান্ধীর একটি বক্তৃতা সভার মাঝখানে প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস দলগুলির মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধেছিল। বামফ্রন্ট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৪৫টি আসন জেতে, যার মধ্যে সিপিআই(এম) ২০৪টি আসনে লড়ে জেতে ১৮২টি আসন। কংগ্রেস ২৮৪টি আসনে লড়ে মাত্র ৪৩টি আসন জিতেছিল। বিজেপি একটিও আসন জিততে পারেনি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন জ্যোতি বসু।
১৯৯৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ১৯৯৬ সালের ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের দ্বাদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। লড়াই হয়েছিল ২৯৪টি আসনের জন্য। এটি ছিল জ্যোতি বসুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা শেষ নির্বাচন, কারণ ২০০০ সালে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন। সিপিআই(এম) ৭০জন নতুন প্রার্থীকে ভোটে দাঁড় করায়। এই নির্বাচনে রাজ্য রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি গুরুত্ব পেয়েছিল। কংগ্রেস দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়, একটি দল প্রণব মুখার্জির নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টদের সমর্থিত এবং অন্যদলটি কমিউনিস্ট বিরোধী দল। এই দ্বিতীয় দলেরই একজন মুখ হিসেবে উঠে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কংগ্রেস এবং ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা জোটবদ্ধ হয়। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বামফ্রন্ট পায় ২০৩টি আসন, যা বামফ্রন্টের পক্ষে একটি বড় ধাক্কাই বটে। জাতীয় কংগ্রেস ২৮৮টি আসনে লড়ে জিতেছিল ৮২টি আসন। জ্যোতি বসু পুনরায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ২০০১ সালের ১০ মে পশ্চিমবঙ্গের ত্রয়োদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। এবছরই প্রথম ভোটের জন্য ইভিএম মেশিন ব্যবহৃত হয়। এই নির্বাচনের আগে ১৯৯৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নামে একটি দল গঠন করেন। এই দল এনডিএ-র সঙ্গে জোট বাঁধে ১৯৯৮ সালে কিন্তু ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। বামফ্রন্ট এই নির্বাচনে ১৯৬টি আসন জেতে, যার মধ্যে সিপিআই(এম) ২১১টি আসনে লড়ে পায় ১৪৩টি আসন। অন্যদিকে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস ২২৬টি আসনে লড়ে জিতেছিল ৬০টি আসন এবং জাতীয় কংগ্রেস ৬০টি আসনে লড়ে পায় ২৬টি আসন। জ্যোতি বসুর অবসর গ্রহণের পর সিপিআই(এম)-এর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন।
২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ২০০৬ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে ৮মে-এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের চতুর্দশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনের জন্য মোট পাঁচ দফায় এই নির্বাচন হয়েছিল। মোট প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ১৬৫৪। বামফ্রন্ট মোট ২৩৫টি আসন জেতে, যার মধ্যে সিপিআই(এম) ২১২টি আসনে লড়ে একাই ১৭৬টি আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়ে জয়লাভ করেছিলেন। অন্যদিকে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস ২৫৭টি আসনে লড়ে মাত্র ৩০টি আসন জিতেছিল। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে পুনরায় বাম সরকার গঠিত হয় রাজ্যে এবং মুখ্যমন্ত্রী হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে ১০ মে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৪টি আসনের জন্য ছয় দফায় নির্বাচনটি হয়েছিল। ২০১১ সালের ঐতিহাসিক এই নির্বাচনে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের মণীশ গুপ্তের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এআইটিসি এবং কংগ্রেস জোট নির্বাচনে মোট ২২৮টি আসন জেতে যার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ২২৬টি আসনে লড়ে ১৮৪টি আসন জিতেছিল। অন্যদিকে সিপিআই(এম) ২১৩টি আসনে লড়ে জিতেছিল মাত্র ৪০টি আসন। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়লাভ করেন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নতুন সরকার গঠন করেন।
২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন:- ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ৫ মে-এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ষোড়শ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২৯৪টি আসনের জন্য মোট ছয় দফায় এই ভোট হয়। এই ভোটের আগে সিপিআই(এম) ও জাতীয় কংগ্রেস-সহ আরও অনেকগুলি দল মিলিত হয়ে একটি মহাজোট গঠন করেছিল। অন্যদিকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সঙ্গে মিলিত হয়ে বিজেপি তৈরি করে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস জোটবদ্ধ ছিল জনআন্দোলন পার্টির সঙ্গে। এই নির্বাচনের আগে সারদা গ্রুপের আর্থিক কেলেঙ্কারি, নারদা কেলেঙ্কারি ইত্যাদি প্রকাশ্যে এসেছিল। ২৯৩টি আসনে লড়ে তৃণমূল কংগ্রেস মোট ২১১টি আসন জিতেছিল। অন্যদিকে মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত সিপিআই(এম) এককভাবে ১৪৮টি আসনে লড়ে জিতেছিল ২৬টি আসন এবং মহাজোট ৩৯.১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কংগ্রেস ৯২টি আসনে লড়ে পেয়েছিল ৪৪টি আসন এবং বিজেপি ২৯১টি আসনে লড়ে জিতেছিল ৩টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন:- ২০২১ সালের ২৭ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনের নির্বাচন হয়েছিল মধ্যে মোট আট দফায়। বাকি দুটি আসনের জন্য নির্বাচন হয়েছিল ৩০ সেপ্টেম্বর। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে কোভিড মহামারীর প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, রাজ্যে আম্ফানের মতো বিধ্বংসী ঝড়ে তছনছ হয়ে গিয়েছিল অনেক এলাকা। সেই সময় দুর্যোগের ত্রাণ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল বিরোধীরা। এই নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপির উল্লেখযোগ্য উত্থান পরিলক্ষিত হয়। ২০১৭ সালের কাঁথি দক্ষিণ আসনের উপনির্বাচনের পর বোঝা গেছিল বিরোধী দল হিসেবে সিপিআই(এম)-কে ছাড়িয়ে গেছে বিজেপি। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে বিজেপি আত্মপ্রকাশ করে। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ২০২১ বিধানসভার আগে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করে। অন্যদিকে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট গঠন করে, যা সংযুক্ত মোর্চা নামে পরিচিত হয়। বামফ্রন্টের তরফে বেশ কিছু নতুন মুখের উত্থান হয়। আবার বিজেপি এবং অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন জোটবদ্ধ হয়েছিল। কোভিড মহামারীর জন্য সাবধানতার কথা মাথায় রেখে এই নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য সর্বাধিক ভোটার সংখ্যা ১৫০০ থেকে ১০০০-এ নামিয়ে আনা হয়েছিল। এমনকি সমস্ত রাজনৈতিক সমাবেশ জনসভা ইত্যাদিও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ভোটের পরে বিজয় মিছিলও নিষিদ্ধ করা হয়।
তৃণমূল কংগ্রেস ২৯০টি আসনে লড়ে জিতেছিল ২১৫টি আসন, বিজেপি ২৯৩টি আসনে লড়ে জেতে ৭৭টি আসন এবং সিপিআই(এম) ও কংগ্রেস যথাক্রমে ১৩৯টি ও ৯২টি আসনে লড়ে একটি আসনও জিততে পারেনি। উল্লেখ্য যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাজে পরাজিত হন। পরে আবার ভবানীপুরে উপনির্বাচনে জিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান