সববাংলায়

শচীন দেব বর্মণ

শচীন দেব বর্মণ (Sachin Dev Burman) একজন প্রবাদ প্রতিম ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র সুরকার যিনি বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষার চলচ্চিত্রে সুরের জাদুতে দর্শক-শ্রোতার মন ভরিয়ে তুলেছিলেন। ত্রিপুরার রাজ-পরিবারের বংশধর হয়েও রাজবংশের প্রাচুর্য উপভোগের বদলে সামান্য এক ভাড়াবাড়িতে সঙ্গীত-সাধনায় জীবন কাটানোর মনোবাঞ্ছা নিয়ে কুমিল্লার শচীন দেব ক্রমেই হয়ে উঠেছিলেন চলচ্চিত্র জগতের ‘শচীন কর্তা’। ১৯৩৭ সালে বাংলা ছবিতে গানের সুরকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয় তাঁর। ক্রমেই টলিউড থেকে বলিউড সর্বত্র একটা সময়পর্বে গানের ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন শচীন দেব বর্মণ। বহুমুখী প্রতিভাধর শচীনদেবের সুরে গান গেয়েছেন কিশোরকুমার, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, গীতা দত্ত, মহম্মদ রফি, মান্না দে, তালাত মাহমুদের মতো স্বর্ণযুগের গানের শ্রেষ্ঠ গায়ক-গায়িকারা। ১৪টি হিন্দি ছবি ও ১৩টি বাংলা ছবিতে তিনি নিজেই প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। মাত্র তিরিশ বছরের সঙ্গীতজীবনে বাংলা, হিন্দি মিলিয়ে প্রায় নব্বইটি ছবির গানে সুর দিয়েছেন শচীন দেব বর্মণ। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার লাভ এবং শক্তি সামন্ত পরিচালিত ‘আরাধনা’ ছবিতে গান গাওয়ার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ পুরুষ প্লেব্যাক গায়কের শিরোপা অর্জন করেন তিনি। এছাড়াও সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন শচীন দেব বর্মণ।

১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর অধুনা বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায় শচীন দেব বর্মণের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রাজা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মণ ত্রিপুরার রাজকুমার ছিলেন আর তাঁর মা নির্মলা দেবী ছিলেন মণিপুরের মহারানি। শচীন দেবের বাবা নবদ্বীপচন্দ্র ত্রিপুরার রাজা ঈশানচন্দ্র মানিক্যদেব বর্মণের পুত্র ছিলেন। তাঁদের নয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শচীন দেব মাত্র দুই বছর বয়সেই তাঁর মাকে হারান। শোনা যায় ত্রিপুরার মানিক্য রাজবংশের বীরচন্দ্র মানিক্য কেবলমাত্র রাজা হওয়ার লোভে ও ঈর্ষাবশত নবদ্বীপচন্দ্র মানিক্যকে হত্যার প্রচেষ্টাও করেছিলেন। আর সেই কারণে রাজবংশের প্রবীণ কর্মচারী কৈলাসচন্দ্র সিংহের পরামর্শে কুমিল্লায় পালিয়ে আসেন নবদ্বীপচন্দ্র। রাজসিংহাসনের দাবি ত্যাগ করার কারণে পরে বীরচন্দ্র তাঁকে কুমিল্লায় তিরিশ একর জমি দান করেন যেখানে দালানকোঠা তৈরি করেন নবদ্বীপচন্দ্র আর সেখানেই বাল্য-কৈশোর কাটিয়েছেন শচীন দেব বর্মণ। বাল্যকাল থেকেই এক সাংগীতিক পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠেন তিনি। নবদ্বীপচন্দ্র নিজে একজন উচ্চমানের সেতারবাদক ছিলেন, ধ্রুপদী সঙ্গীতেও তাঁর দক্ষতা ও চর্চা ছিল। বাবার কাছেই প্রথম সঙ্গীতশিক্ষা শুরু হয় শচীন দেবের। পরে ওস্তাদ বাদল খান এবং ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সঙ্গীতের তালিম নেন তিনি।

ত্রিপুরার আগরতলায় কুমার বোর্ডিং স্কুলে শচীন দেবের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তানদের এবং তথাকথিত ধনী ঘরের সন্তানদের পড়াশোনার জন্যেই এই স্কুলটি বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল। পরে তাঁর বাবা নবদ্বীপচন্দ্র তাঁকে কুমিল্লার ইউসুফ স্কুলে ভর্তি করে দেন। এই স্কুলে কিছুদিন কাটিয়ে কুমিল্লা জেলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন শচীন দেব বর্মণ। ১৪ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন তিনি। এই কলেজ থেকে ১৯২২ সালে আই.এ এবং ১৯২৪ সালে বি.এ পাশ করেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়ার জন্য কুমিল্লা থেকে কলকাতায় চলে আসেন শচীন দেব, কিন্তু গানের প্রতি এতই সংলগ্ন হয়ে পড়েন তিনি যে পড়াশোনা আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না তাঁর পক্ষে। ১৯২৫ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে তিনি সঙ্গীতের প্রথাগত তালিম নেওয়া শুরু করেন। তারপর একে একে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, সারেঙ্গীবাদক বাদল খান, সরোদবাদক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কাছে সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন শচীন দেব। কুমিল্লায় থাকাকালীন বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। শচীন দেবের পুত্র রাহুল দেব বর্মণ ও পরবর্তীকালে বাংলা এবং হিন্দি চলচ্চিত্রে সুরারোপের ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছিলেন।

কর্মজীবনের শুরুতে ১৯২০ সালের শেষ দিকে কলকাতা রেডিও স্টেশনে বেতার গায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন শচীন দেব বর্মণ। পরে সুরকার হিসেবে তাঁর খ্যাতি বেড়ে যায়। বাংলা লোকগীতি এবং লঘু হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সঙ্গীতের মিশেলে তিনি তাঁর গানগুলি তৈরি করতে থাকেন। বাংলাদেশে বহুদিন কাটানোর ফলে পল্লীবাংলার লোকগীতির সুর তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। হিন্দুস্তান রেকর্ড থেকে তাঁর প্রথম রেকর্ড মুক্তি পায় ১৯৩২ সালে যেখানে দুটি গান ছিল- এক পিঠে ছিল ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়’ আর অন্য পিঠে ‘ডাকলে কোকিল কোন বিহানে’ নামে একটি লোকগীতি। ১৯৩০–এর দশকে তিনি একজন গায়ক হিসেবে ক্রমেই জনপ্রিয় হতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন সুরকারের সুরে আর সঙ্গীত পরিচালকের পরিচালনায় তিনি এই সময় মোট ১৩১টি বাংলা গান করেন। ১৯৩৪ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে নিখিল ভারত সঙ্গীত সমাবেশে যোগ দিয়ে বাংলা থুমরি গান পরিবেশন করেন শচীন দেব বর্মণ। পরে ঐ বছরের শেষের দিকে নিখিল বঙ্গ সঙ্গীত সমাবেশেও যোগ দেন তিনি এবং এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই অনুষ্ঠানেই ঠুমরি গিতি পরিবেশন করে স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। ১৯৩৪ সালে একটি উর্দু ছবি ‘সেলিমা’ এবং ১৯৩৫ সালে ধীরেন গাঙ্গুলি পরিচালিত ‘বিদ্রোহী’ ছবিতে দুটি গায়ক চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন শচীন দেব বর্মণ। প্রথম ‘রাজ্ঞী’ ছবিতে সুরকার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি এবং ১৯৩৭ সালে তাঁর দ্বিতীয় কাজ ‘রাজকুমারের নির্বাসন’ ছবিতে সুরারোপ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন শচীন দেব। এরপর একে প্রতিশোধ (১৯৪১), অভয়ের বিয়ে (১৯৪২), ছদ্মবেশী (১৯৪৪) ইত্যাদি বাংলা ছবির গানে সুরারোপ করেন তিনি। যদিও ১৯৪৬ সালে স্থায়ীভাবে তিনি বম্বেতে চলে যান বলিউডে সঙ্গিত-পরিচালনা এবং সুর-সংযোজনের কাজের জন্য। প্রথম গায়ক হিসেবে কাজ করেন শচীন দেব ‘সাঁঝের পিদিম’ নামের বাংলা ছবিতে যা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৫ সালে।

১৯৪৭ সালে ফিল্মিস্তান সংস্থার প্রযোজনা ‘দো ভাই’ ছবিতে গানে সুরারোপ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি, সেটাই তাঁর প্রথম খ্যাতকীর্তি। বম্বে ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রিতে তাঁর সুরে গীতা দত্তের গাওয়া ‘মেরা সুন্দর সপ্‌না বিত গ্যয়া’ গানটি খুবই আনুকূল্য পেয়েছিল। ১৯৪৯ সালে ফিল্মিস্তানের আরেকটি হিট ছবি ‘শবনম্‌’-এও কাজ করেছেন শচীন দেব এবং সেই ছবির গানও বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। ১৯৫০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অশোককুমার অভিনীত ‘মশাল’ ছবির কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই কলকাতা ফিরে আসেন শচীন দেব। কারণ বম্বের বস্তুতান্ত্রিক অর্থকেন্দ্রিক পরিবেশ তাঁর মোটেই ভালো লাগছিল না। ঐ বছরই দেব আনন্দের প্রযোজনা সংস্থা ‘নবকেতন ফিল্মস’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরপর বেশ কিছু ছবিতে কাজ করেন তিনি এবং সেই সব ছবিই একেকটি ‘মিউজিক্যাল হিট’-এ পরিণত হয়। তার মধ্যে ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘ন’ দো গ্যারা’ (১৯৫৭), ‘কালা পানি’ (১৯৫৮), ‘মুনিমজি’ (১৯৫৫) এবং ‘পেয়িং গেস্ট’ (১৯৫৭) সবথেকে বিখ্যাত। তাঁর সুরে গান করেছিলেন মহম্মদ রফি, কিশোরকুমার, গীতা দত্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এমনকি লতা মঙ্গেশকরও। লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে তাঁর সুরে ‘নওজওয়ান’ ছবির ‘ঠান্ডি হাওয়াএ’ গানটি চিরকালের সেরা গানগুলির মধ্যে একটি। ‘বাজি’ (১৯৫১) ছবিতে শচীন দেবই প্রথম গীতা দত্তকে দিয়ে একটি জ্যাজ-প্রভাবিত অন্য ধারার গান গাইয়েছিলেন। গুরু দত্তের বেশ কিছু ছবির জন্য গান লিখেছিলেন শচীন দেব বর্মণ। ‘প্যায়াসা’ (১৯৫৭), ‘কাগজ কে ফুল’ (১৯৫৯), ‘হাউস নং ৪৪’ (১৯৫৫), ‘ফান্টুস’ (১৯৫৬), ‘দেবদাস’ (১৯৫৫) ইত্যাদি ছবিতে তাঁর সুরে প্রতিটি গান আজও মানুষের স্মরণে আছে। ১৯৫৭ সাল নাগাদ গায়ক হিসেবে আশা ভোঁসলে, কিশোরকুমার, গীতিকার হিসেবে মজরু সুলতান পুরী এবং শচীন দেব বর্মণের সুরে প্রতিটি গান জনপ্রিয় হয়। কিশোরকুমারের নিজস্ব প্রযোজনায় ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ (১৯৫৮) ছবিতেও গানে সুর দিয়েছেন তিনি। ১৯৫৮ সালেই ‘সুজাতা’ ছবির গানে সুরকার হিসেবে ‘সঙ্গীত নাটক অ্যাকাদেমি’ পুরস্কারে ভূষিত হন শচীন দেব বর্মণ। শক্তি সামন্তের পরিচালনায় ‘আরাধনা’ ছবিতে আনন্দ বক্সীর কথায় আর শচীন দেবের সুরে কিশোরকুমারের কণ্ঠে সব গানই এক কথায় ‘হিট’ হয় এবং এই ছবিতে ‘সফল হোগি তেরি আরাধনা’ গান গেয়ে শ্রেষ্ঠ পুরুষ প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। দেব আনন্দের নবকেতন ফিল্মসের সঙ্গে বহু ছবিতে সুরকার হিসেবে কাজ করেছেন শচীন দেব যার অধিকাংশ গানই বাণিজ্যসফল ও জনপ্রিয়। সত্তরের দশকে ‘পরপর তেরে মেরে সপ্‌নে’ (১৯৭১), ‘ইস্ক পার জোর নেহি’ (১৯৭০), ‘শর্মিলি’ (১৯৭১), ‘অভিমান’ (১৯৭৩), ‘সাগিনা’ (১৯৭৪), ‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫), ‘মিলি’ (১৯৭৫) এই ছবিগুলি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় যার মূল কারণ এর গানের সুরকার ছিলেন শচীন দেব বর্মণ। সুরকার হিসেবে তিনি কিশোরকুমারকে প্রথম আবিষ্কার করেন এবং অধিকাংশ ছবিতে গায়ক হিসেবে শচীনদেবের সুরে তাঁর গান চিরকালের জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে।

১৯৭৪ সালে ‘জিন্দেগি জিন্দেগি’ ছবিতে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত-পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন শচীন দেব। যদিও এর আগে ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে সম্মানিত করে। এছাড়াও ১৯৫৪ সালে ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ ছবিতে এবং ১৯৭৩ সালে ‘অভিমান’ ছবিতে কাজের সুবাদে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ন্যাশনাল ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি। শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত সৃষ্টির জন্য ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭৩ সালে যথাক্রমে ‘তিন দেবীয়ান’, ‘গাইড’, ‘আরাধনা’ এবং ‘অভিমান’ চলচ্চিত্রের কারণে বিএফজেএ পুরস্কার পান শচীন দেব বর্মণ। ২০০৭ সালে ভারত সরকার পনেরো টাকার একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে শচীন দেবের স্মরণে।

১৯৭৫ সালে ৩১ অক্টোবর বম্বেতে শচীন দেব বর্মণ এর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading